শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
প্রথম ধাপে ৩৭১ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট ১১ এপ্রিল পাপুলের আসনে ভোট ১১ এপ্রিল এইচ টি ইমামের বর্ণাঢ্য জীবন শাস্তি পেলেন জামালপুরের সেই বিতর্কিত ডিসি চলে গেলেন এইচ টি ইমাম মূলধন সংকটে পড়েছে ১০ ব্যাংক বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবউল্লাহ জাহিদ (মিঞা) স্বরণে – – – – সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্ তানোরে মেয়রের  গণসংবর্ধনায় গণরোষ  !  রাজারহাটে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংবাদ সম্মেলন চসিক মেয়রের সাথে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনারের সাক্ষাৎ রাজশাহী মতিহার থানার প্রাকাশ্য চাঁদাবাজীর নেপথ্যের কারিগর কে এএসআই ফিরোজ ৭ই মার্চের ভাষন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষন —আফতাব উদ্দিন সরকার এমপি রৌমারীতে সাংবাদিক পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ “ভারত ভাগে বাংলার বিয়োগান্তক ইতিহাস” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত সাঁথিয়ায় মশার কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত পুড়ে গেছে ২ টি ঘর,২টি ষাঁড়,১৩টি ছাগল

আসামে আরেকটি ‘রোহিঙ্গা পরিস্থিতি’

শেষ পর্যন্ত ভারতের আসামে চূড়ান্ত ‘এনআরসি’ (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স) বা নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বহুল আলোচিত এই নাগরিকত্ব তালিকা থেকে বাদ পড়েছে সব মিলিয়ে ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষ। আমরা এখনও জানি না এর মধ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কত। বাদ পড়াদের মধ্যে মুসলিম নাগরিকের সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপি অভিযোগ করে আসছে- আসামে মুসলিম ‘অনুপ্রবেশকারী’ বাড়ছে। তারা বলে আসছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়ন করে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাবে। আবার একই সঙ্গে কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই বলেছে, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের তারা নাগরিকত্ব দেবে। এখন দেখার বিষয়, শনিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে কত ভাগ হিন্দু আর কত ভাগ মুসলমান।

কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে, বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ১০ লাখ মুসলমান আর ৯ লাখ হিন্দু। আমার ধারণা, হিন্দু জনগোষ্ঠী যদি ৯ লাখও হয়, তাদের খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। ভারতের লোকসভায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল’ বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। এটা এখন রাজ্যসভায় পাসের জন্য অপেক্ষমাণ। ওই বিল পাস হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দুরা নাগরিকত্ব পাবে।

আসামের হিন্দু ও মুসলিম সংগঠনগুলো বলছে, এই নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার সময় নানা ‘অনিয়ম’ করা হয়েছে। উপযুক্ত না হয়েও অনেককে যেমন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তেমনি উপযুক্ত হলেও অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমি আশঙ্কা করি, মুসলমানের মধ্যেই বঞ্চিতদের সংখ্যা বেশি। কারণ তাদের অনেকেই খুব বেশি লেখাপড়া করেনি। ফলে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নথিপত্র ঠিকভাবে তৈরি ও সংরক্ষণ করেনি। আবার এই নাগরিকত্ব যাচাইকারী জনবলের ‘সংখ্যাগুরু’ মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত সরকার বলছে, চূড়ান্ত এনআরসি থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের ‘শঙ্কিত’ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই দফায় বাদ পড়ারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে যাবে। সেখানে প্রতিকার না পেলে হাইকোর্টে যাবে। হাইকোর্ট থেকে পর্যায়ক্রমে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার মুসলিমবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, সেখানে আসামের মুসলিম নাগরিকরা এই প্রক্রিয়ায় কতখানি সহযোগিতা পাবে? আর একজন কৃষক নিজে নিজে কীভাবে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাবে?

আমি মনে করি, এনআরসি প্রকাশের মধ্য দিয়ে আসামে আসলে আরেকটি ‘রোহিঙ্গা পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারেও একইভাবে ১৯৮২ সালের সংবিধানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল যে, নাগরিকত্ব সম্পর্কে তাদের কোনো ‘প্রমাণ’ নেই। রোহিঙ্গারাও শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে ছিল, মূলত কৃষিকাজ ও মাছধরায় নিয়োজিত ছিল। বংশ পরম্পরায় তারা যেখানে বাস করে আসছে, সেখানে প্রমাণ রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। আসামেও একই পরিস্থিতি। এখন যারা বাদ পড়ল, তাদের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হবে। এত বছর তাদের বাড়িঘর ও জমিজমার কী হবে? এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী তাদের জমিজমা নামমাত্র মূল্যে কিনে নেবে বা জোর করে দখলে নেবে। তখন এই জনগোষ্ঠী থাকবে কোথায়, খাবে কী, আর নাগরিকত্বের জন্য আদালতে দৌড়াবেই বা কীভাবে?

মূল কথা, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইনে যেভাবে থেকেছে, আসামের মুসলমানদেরও সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমানে আসামে অন্তত পাঁচটি জেলা রয়েছে, সেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগুরু। আমার আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই জেলাগুলো মুসলিম সংখ্যাগুরু থাকবে না বা হিন্দু-মুসলিম সমান সমান হবে।

আরও কয়েক বছর পর, নাগরিকত্ব ও সম্পদ- সবই হারানোর পর, আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিজেপির ঘোষণামতো ভারত থেকে বের করে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হবে। মিয়ানমারে যেভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী অত্যাচার চালিয়ে তাদের বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করেছে, ঠিক তেমনিভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার শুরু হতে পারে।

ধরা যাক, এনআরসি থেকে বাদ পড়া দশ লাখ মুসলিমের মধ্যে বড়জোর এক লাখই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে টিকে গেল। বাকিদের কী হবে? এর মধ্যে কয়েক লাখকেও যদি বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের মতো, তাহলে আমরা বড় সংকটে পড়ব। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা সংকটে পড়েছি। আগেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখানে ছিল। ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের মিলিয়ে এখন এগারো লাখের ওপরে। সর্বশেষ ঢলের পর ইতিমধ্যে দুই বছর কেটে গেছে। যদি সংকটের সমাধান হয়ও, সবমিলিয়ে পাঁচ বছরের আগে সবাইকে ফেরত পাঠানো যাবে বলে মনে হয় না। আমার মনে হয়, এখন আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমরা আরেকটি সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কি আসামের মুসলিমদের সীমান্তের এপাশে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইবে? এখন ভূ-রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি, তাতে বাংলাদেশকেই বেশি দরকার ভারতের। ভারতের ওপর আমাদের নির্ভরতা কেবল পানি বণ্টন ইস্যুতে। এছাড়া আর সব দিক থেকে বাংলাদেশকে প্রয়োজন ভারতের। প্রতিবেশীগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশই ভারতকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সহযোগিতা ভারতকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছে। যে কারণে তারা সেখানে শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও বাংলাদেশকে দরকার। সড়ক, নৌ, রেল যোগাযোগ বাড়াতে হলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়েই যেতে হবে।

আমাদের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বিরাট। কিন্তু তাদের বৈদেশিক আয়ের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে যায়। সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল, ভারত বাংলাদেশ থেকে বছরে দশ বিলিয়ন ডলার আয় করে। বাংলাদেশে নিযুক্ত এর আগের ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছিলেন, সংখ্যাটা সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার। এটা মোটেও কম নয়। এছাড়া এটা ভারতেরই হিসাব যে, সে দেশে যাওয়া পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তারা চিকিৎসার জন্য, বেড়ানোর জন্য ভারতে গিয়ে বিপুল অর্থ খরচ করে আসে।

মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ক্রমেই বাড়ছে। ভারতের প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ যে ভারতের চেয়ে এগিয়ে, সেটা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বারবার এই দিকটা তুলে ধরছেন। আমার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করছে, যখন সামাজিক সূচকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে; তখন বাংলাদেশ থেকে মানুষ আসামে যাবে কেন? এটা ঠিক, দেশবিভাগের আগে জীবিকার কারণে ভারতে এক অঞ্চলের মানুষ আরেক অঞ্চলে যেত। তারপরও ধর্মীয় কারণে হিন্দুদের একটি অংশ যেমন ভারতে গেছে, তেমনি মুসলমানদের একটি অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পর এর কোনো কারণ থাকতে পারে না। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারণে যেখানে বাংলাদেশকে ভারতের প্রয়োজন, সেখানে কেবল সাম্প্রদায়িক কারণে আসামের মুসলিমদের সীমান্তের এপাশে ঠেলে দেওয়ার বোকামি ভারত করবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, সেটাকে নষ্ট করার ঝুঁকি ভারতের জন্য অনেক।

তারপরও বাংলাদেশকে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য কূটনৈতিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। যদি ভারত আসামের মুসলমানদের ঠেলে দিতে চায়, তাহলে কূটনৈতিকভাবে ঠেকাতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে ‘কূটনৈতিক বিপর্যয়’ ঘটেছে, আসামের নাগরিকত্ব ইস্যুতে তার পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। প্রয়োজনে এখন থেকেই ভারতের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বলতে হবে, বাংলাদেশ একজন মানুষকেও গ্রহণ করবে না। ভারতকে বোঝাতে হবে, আসামে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ও বঞ্চনা আমাদের এখানেও হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্য বিনষ্ট করবে। তার ফল গোটা উপমহাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ডেকে আনবে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার  samakal.com

Please Share This Post in Your Social Media

দেশের সংবাদ নিউজ পোটালের সেকেনটের ভিজিটর

38353981
Users Today : 624
Users Yesterday : 6146
Views Today : 1522
Who's Online : 24

© All rights reserved © 2011 deshersangbad.com/