বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
সিনহার মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা, দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরবে না হাওরে ঘুরতে গিয়ে নৌকাডুবিতে ১৭ জনের মৃত্যু উলিপুরে ইভটিজিং এর শিকার স্কুল ছাত্রীর বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা প্রতিবাদ করায় ছাত্রীর বাড়ি ঘরে হামলা সাপাহারে যৌতুকের দাবীতে স্ত্রীকে কুপিয়ে জখম পলাতক স্বামী গ্রেফতার সন্ধ্যায় বরণ, রাতে নববধূর করোনাভাইরাস শনাক্ত নড়াইলের পল্লীতে  সন্ত্রাসী হামলায় হাত-পা বিচ্ছিন্ন’র ঘটনায় ১৮ জনকে আসামী করে  থানায় মামলা নারী কর্মকর্তার করা অভিযোগে নেত্রকোনার ডিসি প্রত্যাহার মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যা, কী হয়েছিল সেদিন শেখ কামালের জন্মদিনে যতো আয়োজন বৈরুতে বিস্ফোরণে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৯ সদস্য আহত কোভিড -১৯: কুষ্টিয়ায় পৌর মেয়রসহ আরও ৭৭ জন আক্রান্ত  কুষ্টিয়ায় বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন কুমারখালীতে যৌন হয়রানীর অভিযোগে গ্রেফতার ১ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে "কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ" শীর্ষক ভার্চুয়াল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত বন্যার্তদের ঈদ আনন্দ

কুষ্টিয়ায় আখের জমিতে তামাকের দাপট কমছে আখের চাষ

 

কে,এম,তোফাজ্জেল হোসেন জুয়েল জেলা প্রতিনিধি :-

কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে। এক সময় এ এলাকার কৃষকরা ব্যাপক আখ চাষ করত। দাম না পাওয়ায় আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তারা।

কুষ্টিয়ার সুগার মিল সুত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ মাড়াই মৌসুমে মাত্র ৩৯ হাজার ৭৯৭ মেট্রিক টন আখ মাড়াই থেকে ২ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে ৭০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা দিয়ে চিনি উৎপাদন হবে ৪ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।

দৌলতপুর উপজেলার আংদিয়া গ্রামের আখ চাষি রমজান আলী বলেন, তিনি আগে আখ চাষ করতেন। আখ ফলাতে অনেক সময় লাগায় এতে খরচ অন্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি। তারপরও আখের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় তিনি আখ চাষ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।

আইলচারা গ্রামের আখ চাষি ওসমান গনি বলেন, তিনি ১০-১২ বিঘা জমিতে আখ চাষ করতেন। এখন আর আখ চাষ করেন না।

তিনি আরও বলেন, আখ চাষের পর মাড়াই এবং গুড় তৈরি কষ্টসাধ্য এবং তেমন লাভজনক নয়। সরকারিভাবে আখের দাম কম। কর্তৃপক্ষ নগদ অর্থ দিয়ে আখ ক্রয় করে না।

কাতলামারী গ্রামের আখ চাষি জান মোহাম্মদ মণ্ডল বলেন, আখ চাষ করে আগের মতো লাভ হয় না। তাই আখের জমিতে এখন ধান, পাট, পেঁয়াজ, রসুন, মূলা, আলু ইত্যাদি চাষ করেন। এসব চাষে ভালো লাভ হচ্ছে।

মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, এ জেলায় অত্যধিক তামাক চাষ হওয়ায় কৃষকরা আখের পরিবর্তে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছে। অল্প সময়ে কৃষকরা তামাক চাষ করে অধিক অর্থ আয় করছে।

তিনি আরো জানান, কুষ্টিয়ায় আখ চাষ কম হওয়ায় কুষ্টিয়ার জগতি সুগার মিল বন্ধের পথে। আখ চাষের ব্যাপারে যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তবে সুগার মিলের অস্তিত্ব থাকবে না।

কুষ্টিয়া সুগার মিলের এমডি মিজানুর রহমান বলেন, চাষিদের নানান সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। এ বছর আখ উৎপাদন গত কয়েক বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। সার, বীজ, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। আখের দাম বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

খোকসাতে ফসলি জমির আবাদকুষ্টিয়ায় ব্যাপক হারে হচ্ছে বিষবৃক্ষ তামাকের চাষ। এতে কমে আসছে চিনির কাঁচামাল আখের জোগান। ধান, গম, পাট, আখ, ভুট্টার চেয়ে পরিশ্রম বেশি হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ মূল্যের ফসল হওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকছে তামাক চাষে। এতে আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা। পরিশ্রম হলেও দাম ভালো পাওয়ায় তামাক চাষ করছেন কৃষকরা। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় অধিকাংশ জমিতেই চাষ হচ্ছে তামাকের। এর মধ্যে দৌলতপুরে ও মিরপুরে সবচেয়ে বেশি।

এখানকার উৎপাদিত তামাক উৎকৃষ্ট মানের হওয়ায় বড় বড় তামাক উৎপাদনকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, বিড়ি, সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো এ এলাকায় জেঁকে বসেছে। মাঠের পর মাঠ তামাকের চাষ হলেও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই খোদ কৃষি অফিসে। তবে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুষ্টিয়া জেলায় সর্বমোট আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৭৮ হেক্টর।

তামাক কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, গত বছর তামাকের চাষ হয়েছিল প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এ বছর কুষ্টিয়া অঞ্চলে আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ৯ হাজার হেক্টর, ঢাকা টোব্যাকো ১৫ হাজার হেক্টর, জামিল টোব্যাকো ১২০০ হেক্টর এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে আরো ৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হচ্ছে, যা মোট আবাদি জমির অর্ধেকের বেশি।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তামাক চাষি মধু মিয়া বলেন, তামাক চাষে অল্প সময়ে বেশি টাকা পাওয়া যায়। গত বছর দুই বিঘা জমিতে চামাক চাষ করে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পেয়েছি। খরচ হয়েছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো। পরিশ্রম বেশি হলে কি হবে নগদ টাকা তো বেশি। সময়ও কম লাগে।

তিনি আরো জানান, আখ চাষ করলে জমিতে আর অন্য ফসল করা হয় না। যে জমিতে আখ করব তার চেয়ে সেই জমিতে তামাকসহ অন্য ফসল করব।

আরেক কৃষক করিম আলী জানান, আখ চাষে শ্রমিক খরচ আর পরিবহনেই সব খেয়ে যায়। আখ কাটার সময় হাত-পা ধরেও শ্রমিক পাওয়া যায় না। তা ছাড়া এলাকার সবাই তামাক করে আমি একা আখ করলে শিয়ালেই শেষ করে দেবে। আর আখে তো নগদ টাকা পাওয়া যায় না। কুষ্টিয়া সুগার মিল সূত্রে জানা যায়, এ বছর কুষ্টিয়া জেলায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছে। যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার টন। গত বছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪০ হাজার টন, উৎপাদন হয়েছিল ৩৩ হাজার টন।

আখ চাষি রবিউল ইসলাম জানান, আমি গত বছর ৩৭ শতক জমিতে আখের চাষ করেছিলাম। তাতে আমার বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছিল প্রায় ২৯ হাজার টাকা। আখ পেয়েছি ৮ হাজার ৬০ কেজি। যার বাজার মূল্য ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া লেবার তো পাওয়ায়ই যায় না। হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে এলেও ঠিকমতো কাজ করে না।

তিনি আরো জানান, যারা সেন্টারে আখ ওজন দেয় তারা চাষিদের ওজনে কম বলে ঠকায়। কুষ্টিয়া সুগার মিলের আমলা সাব-জোনের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মচারী আব্দুল বারেক জানান, এ অঞ্চলে আগে মাঠের পর মাঠ আখ চাষ হতো। যেদিন থেকে এ অঞ্চলে তামাকের চাষ শুরু হয়েছে সেদিন থেকে আখ চাষে ধস নেমেছে। এখন মাঠে আখ নয় শুধু তামাক।

তিনি আরো জানান, আমলা আখ সেন্টার থেকে আগে প্রতিদিন গড়ে ৯-১০ গাড়ি আখ যেত। এখন দুদিনে একটুও যায় কিনা সন্দেহ। আখই নেই, যাবে কী?

সরেজমিন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা আখ সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, আখের চেয়ে পাটকাঠি বেশি। অল্প কয়েক মণ আখ পড়ে আছে। আখ সেন্টারে কাঠের ব্যবসা জমজমাট। কুষ্টিয়া সুগার মিলের আমলা আখ সেন্টারের ইনচার্জ মিনহাজ জানান, এ এলাকায় তামাক চাষ বেশি। এখানে মানুষ আখ চাষ করতে চায় না। আমরা চেষ্টা করছি যাতে আখ চাষ বৃদ্ধি করা যায়।

এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, তারা কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, এ অঞ্চলের মানুষ তামাক চাষের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। তবে আমরা বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে চেষ্টা করছি কীভাবে তামাক চাষ কমানো যায়। আমরা কৃষকদের তামাকের বিকল্প অন্য ফসল চাষ করার পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি বলেন, আখ দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় কৃষকরা এটা চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে। কৃষক সেই সময় তিনটি ফসল চাষ করতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 deshersangbad.com/
Design & Developed BY Freelancer Zone