বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২০, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
প্রাচীন কালের এই নিয়মগুলি মেনে চলুন, সেক্স লাইফ উপভোগ করুন ভালোবাসা কতটা প্রকাশ পাবে চুম্বনে গর্ভাবস্থায় যৌনমিলন? এই বিষয়গুলি অবশ্যই মাথায় রাখবেন পর্নোগ্রাফিতে নারীদের আগ্রহ বেশি শ্রমিক থেকে দুলাল ফরাজী ফ্যাক্টরীর মালিক  সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার ৯ জেলে আটক প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ভুমিহীনদের জমি দখলের চেষ্টা বন্ধের দাবিতে গাইবান্ধায় মানববন্ধন গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ১৫৫টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন গাইবান্ধায় করোনা আক্রান্ত -৭৪৬ সুস্থ্য -৪১৬ ,মৃত্যু- ১৩ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট দিনব্যাপী নানা কর্মসূচী পালন বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল কুয়াকাটার দ্বিতীয় ল্যান্ডিং কাটার অপরাধে গ্রেফতার২। প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত “আবুল বারকাতের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য” সস্পর্কে আমার বক্তব্য প্রকাশ প্রসঙ্গে পতœীতলায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব পালিত বকশীগঞ্জে কিন্ডার গার্টেন শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপন চাই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি নির্মূল: টিআইবির আহŸান

টাকা ছড়িয়ে আ.লীগ নেতাদের পকেটে ভরেন পাপুল

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) শহীদ ইসলাম পাপুল। সম্প্রতি মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের একজন আইনপ্রণেতার এ গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর আগে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ পাওয়া এ ব্যবসায়ী কীভাবে দলের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানারে নির্বাচিত হন। আলোচিত এই এমপির স্ত্রী সেলিনা ইসলামও সংরক্ষিত নারী আসন থেকে এমপি হয়েছেন স্বতন্ত্র কোটায়। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত টাকা দিয়েই দুই বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকে পকেটে পুরেছেন পাপুল, স্ত্রীকে বানিয়েছেন আইনপ্রণেতা। এজন্য ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের আর কোনো কথাই শুনতে চান না তিনি। এমনও অভিযোগ আছে, স্থানীয় নেতারা পাপুলের কাছে গেলে তিনি বলতেন, ‘আমি টাকা দিয়ে এমপি হয়েছি। আর কোনো খরচ করতে পারব না।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও লক্ষ্মীপুরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাপুল কুয়েতে যে কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন সে বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে তাকে সহায়তা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যে তৎপরতা শুরু করেছে তা থামাতে তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম  ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। তাই ফোনেই নিচ্ছেন তাদের শলাপরামর্শ। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ওই মহলের পরামর্শমতোই চলছেন পাপুলের স্ত্রী সেলিনা। পাপুল পরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, ‘পাপুলের ব্যাপারে সরকারের নমনীয় অবস্থান রয়েছে। বাড়তি কোনো ব্যবস্থা নিতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেছেন।’

তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্ল্যাহ বলেন, ‘আমি শুনেছি পাপুল টাকা দিয়ে সবাইকে কিনেছে। আমাদের আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকেও পকেটে নিয়েছে টাকা দিয়ে। এ সুবাদেই সে এমপি হতে পেরেছে; স্ত্রীকেও এমপি বানাতে পেরেছে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে কাজ করতে বলার বিষয়টিও আশ্চর্যজনক, দুঃখজনক। আমি বলব, আপনারা মিডিয়ার লোকরাই তদন্ত করে বের করবেন, এর পেছনে কারা, কাদের পকেটে গেছে পাপুলের টাকা।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাপুল আওয়ামী লীগের কেউ নয় এটা যেমন সত্যি; টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের হয়েছে এটাও সত্যি। আসলে শেখ হাসিনার উদারতাকে অনেকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।’

পাপুলপতœী সেলিনা ইসলাম বলছেন, তার স্বামী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হলেও মূলত তিনি আওয়ামী লীগেরই লোক। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালের ৭ জুন পাপুল রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের ‘উন্নয়নের জন্য’ পাপুল অন্তত ২০ কোটি টাকা ব্যয় করেন। জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের মাধ্যমেই ‘সংগঠন শক্তিশালী করতেই’ এত টাকা খরচ করেন তিনি।

সেলিনা ইসলাম বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে পাপুলের পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতারাই কাজ করেছেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও পাপুলের পক্ষে তৃণমূলের সবাইকে কাজ করার জন্য চিঠি দিয়ে নির্দেশনা পাঠায়। যে চিঠিতে স্বাক্ষর করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক বর্তমানে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ। আর ওই কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম। পাপুল আওয়ামী লীগের কেউ না হলে নির্বাচনে তাকে জেতাতে এত আয়োজন কেন ছিল আওয়ামী লীগের এই প্রশ্নও তোলেন তার স্ত্রী সেলিনা।

পাপুল কি আসলেই আওয়ামী লীগের এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্য। ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্রীয় ও লক্ষ্মীপুরের নেতারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পাপুলের সঙ্গে ২০১৫ সালে প্রথম পরিচয় সাবেক রেলমন্ত্রী মজিবুল হকের, যার বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। ২০১৬ সালের শেষদিকে মূলত রাজনীতি করার ইচ্ছে জন্মায় ব্যবসায়ী শহীদ ইসলাম পাপুলের। ওই সময় পেয়েও যান একজনকে। তিনি হলেন আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন এক সাংগঠনিক সম্পাদক। অল্প কয়েক দিনেই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে পাপুলের। মূলত সেই সুবাদে বিতর্কিত এ ব্যবসায়ীর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রবেশ। তারপর একে একে আওয়ামী লীগের অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় পাপুলের। এরপর ২০১৭ সালে পাপুল আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। ওই বছর থেকেই লক্ষ্মীপুর জেলার আওয়ামী লীগের প্রায় সব কর্মকা-ের অর্থের জোগানদাতা হন পাপুল। এর আগে ২০১৬ সালে ৮ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ বিশাল এক জনসভা করে। ওই জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ওই জনসভার মঞ্চে ওঠার মধ্য দিয়েই মূলত লক্ষ্মীপুরের রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন ব্যবসায়ী পাপুল। এরপর একে একে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অন্তত দেড় ডজন নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর সবচেয়ে সিনিয়র নেতা ও গোপালগঞ্জের দুই প্রভাবশালী নেতা অন্যতম, যারা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগেরও প্রভাবশালী নেতা। সম্পাদকম-লীর সবচেয়ে সিনিয়র ওই নেতার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার অবস্থান শক্ত তৈরি হয়। এরই একপর্যায়ে কার্যত আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়েই সহজে এমপি হন পাপুল। এর ফাঁকে এক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজশাহী অঞ্চলের এই আওয়ামী লীগ নেতার ‘অসিলায়’ ব্যবসায়িক সুবিধাও অনেকাংশে পান স্বতন্ত্র এই এমপি। পাপুলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাপরিষদের এক প্রভাবশালী সদস্যের সঙ্গেও।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০১৭ সালে চাঁদপুর জেলায় আওয়ামী লীগের জনসভা হয়। ওই সভায়ও প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই জনসভা সফল করতে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক নারী সদস্যের হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দেন পাপুল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর আরেক সদস্য, যার বাড়িও চাঁদপুরে তার স্থানীয় একটি সংগঠনের জন্য তার হাতে ২৫ লাখ টাকা তুলে দেন। এভাবেই পাপুল একে একে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী অন্তত দেড় ডজন নেতাকে পকেটে নেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  রায়পুর পৌরসভার মেয়র ও রায়পুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকন, যিনি স্থানীয় রাজনীতিতে পাপুলের ডান হাত হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ আছে, পৌরসভা নির্বাচন করার সময় ইসমাইল নিজের নির্বাচনী সব খরচ পাপুলের কাছ থেকে নিয়েছেন। এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসমাইল খোকন বলেন, পাপুল ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা-উপজেলায় রাজনৈতিক কাজে অনেক টাকা ব্যয় করেছেন এটা সত্য; অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেক ওয়ার্ড-ইউনিয়নে নিজের খরচে পাপুল দলীয় কার্যালয় করে দিয়েছেন। কার্যালয়ের খরচ দিতেন নিয়মিত। তবে স্বতন্ত্র এমপি হওয়ার পর তিনি বলতেন, ‘আমি টাকা দিয়ে এমপি হয়েছি। আর কোনো খরচ করতে পারব না।’ তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন ইসমাইল খোকন। তিনি আরও বলেন, পাপুল জেলা থেকে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য হয়েছেন এটাও সত্য। যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ আলী খোকনও লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা। অভিযোগ আছে, এলাকার রাজনৈতিক কোনো কর্মকা- হলেই পাপুলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে খরচ করতেন। এ প্রসঙ্গে খোকন বলেন, ‘জেলা-উপজেলায় রাজনৈতিক কর্মসূচির খরচ পাপুলই ব্যয় করতেন। তবে ব্যক্তিগত কোনো কাজে আমরা তার কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করিনি।’ লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন টিপুও পাপুলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ‘উন্নয়নের জন্য যে ২০ কোটি টাকা পাপুল ব্যয় করেছেন’ বলে বলা হয় তার সবই এসব নেতার হাত দিয়ে গেছে। এসব টাকা লেনদেন করতেন এমপি পাপুলের আরেক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মহররম হিরণ। তিনি পাপুলের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। স্থানীয় এসব নেতার সঙ্গে সখ্য তৈরি করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ‘শক্তিশালী’ হয়ে ওঠেন পাপুল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর আরেক সদস্য, যার বাড়ি লক্ষ্মীপুর তিনিও পাপুলকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেন। এদের সবার রাজনীতিতে পাপুলকে ‘স্পেস দেওয়ার’ অন্যতম কারণ আর্থিক সুবিধা।

রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাপুল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন ২০১৬ সালে। তবে তার কোনো পদ-পদবি ছিল না। তিনি আমাদেরই দলের কারও কারও নেতার সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ান। এলাকার রাজনীতিতে তিনি টাকা-পয়সাও অনেক খরচ করেছেন। তবে পাপুল আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 deshersangbad.com/
Design & Developed BY Freelancer Zone