মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ১১:০২ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
৩ রাষ্ট্রদূতের চুক্তির মেয়াদ বাড়ালো সরকার পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহার মৃত্যু, মাঠে তদন্ত দল প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষকরা পদোন্নতি পেয়ে হবেন প্রধান শিক্ষক গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্রের পানি এখনও বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার উপরে করোনা ঝুঁকি উপেক্ষিত সাপাহারে ঐতিহ্যবাহী জবই বিল দর্শনার্থীদের পদ চারনায় মুখোরিত বকশীগঞ্জে পুকুরে ডুবে ২ শিশু মৃত্যু, চিকিৎসকের উপর  হামলা আহত ৪ সকল ব্যর্থতাকে সফল বলা সরকারের বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ  .…….…আ স ম রব মানুষ মানুষের জন্য কলেজ শিক্ষার্থী’র জীবন বাচাঁতে এগিয়ে আসার আহবান ধর্ম এলম শিক্ষা করার ফযীলত ফকিরহাটে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু নড়াইল পৌর এলাকার দোকানপাটসহ গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা!! জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে মোঃআজিজুল হুদা চৌধুরী সুমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ই আগস্টের সকল শহীদের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন। আত্রাইয়ে ওসি‘র হস্তক্ষেপে বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পেল স্কুলছাত্রী বিফা গাঁজাক্ষেতের খোঁজ, আটক ৩ কুষ্টিয়ায় সাপের ছোবলে সাপুড়ের মৃত্যু ১

তাহমিনা কোরাইশী’র গল্প ‘আর্যিকা হাউজ’

তাহমিনা কোরাইশী :: বহুদিন পর সেই পুরাতন বাড়িটির সামনে মা ও মেয়ে বড় ছেলে অরিয়ন নাতনি আর্দ্রা। দৌড়ে ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢোকে আর্যিকা বলে এই তো বাবা। জাহাজের ক্যাপটেন আতিউর রহমান। সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট কালো কোট, মাথায় ক্যাপ। ছোট আর্যিকাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে- মা, মা আমার, লক্ষ্মী মা-মণি বলে আদরে ভরিয়ে দেয়। আর্যিকা বাবার গলা জড়িয়ে বলে এতো দিন পরে কোন বাবা? তাড়াতাড়ি আসতে পারো না। আমি তোমার অপেক্ষায় কতদিন বসে আছি। তোমাকে না দেখলে আমার কান্না পায়। বাবা তুমি বোঝ না কেন?

মা রে এই তো আমার চাকরী। সমুদ্রেই মাসের পর মাস। কত বন্দরে বন্দরে জাহাজ ভিড়ে। সমুদ্রের ঢেউ গুণি, আকাশের তারা গুণি, এভাবে দিনগুণি কখন আমার মেয়ে সাথে দেখা হবে। আর্যিকার চোখে জল বাবারও চোখের ছলছল। কোল থেকে নামিয়ে ওর জন্য আনা সব বিদেশী খেলনা, জামা, চকলেট বের করে দেয়। মেয়েকে ভরিয়ে দিয়ে বাবার শান্তি। মেয়ে বাবার দেয়া জিনিসগুলো পেয়ে নাচতে থাকে। আনন্দে-আত্মহারা হয়ে স্মৃতির পাতায় জল জমে পিচ্ছিল হয়ে যায়। মুহুর্তেই পা পিছলে হোঁচট খায়। হাজারও স্মৃতি হুড়মুড় করে দৌড়ে আসে। কাকে ছেড়ে কাকে ধরে। দু’চোখে টলমল এক সমুদ্দুর জল। চোখে সব কিছুই ঝাপসা লাগছে। কারো কথাই আজ ওর কানে ঢুকছে না। মা বললেন আর্যিকা উনাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাও। কে শোনে কার কথা। বাবার আত্মা আজ ভর করে আছে আর্যিকার ঘাড়ে। বাবার সাথে মুহুড় মুহুড় খুনশুটির ব্যাপারগুলো চলছে। বড় ভাই অরিয়ন পাশেই ছিল সে বললো মা ওকে একটু একলা থাকতে দাও। আমরা আছি না। ওর মন-শরীর দুটোই তেমন ভালো ঠেকছে না। আর্যিকা মনে মনে ভাবে ভাইয়ার চোখে ধরা পড়ে গেছে। ভাইয়া ওকে ভীষণ ভালোবাসে। ওকে বোঝে দারুণভাবে।

বাবার নিজের কেনা জায়গা। নিজের তত্ত্বাবধানে করেছেন বাড়িটি তৈরী। দু’তলা সাদা রঙের বাড়ি। গাছ গাছালিতে ভরে রেখেছিলেন। ফুল ফল কোন গাছেরই কমতি ছিল না এই ছয়কাঠা জায়গাটির। আজ বহুদিন পার হয়ে গেছে পুরাতন বাড়িটি। ছেলে মেয়েরাও থাকে না। ভাড়া চলেছে কিছু দিন। প্রথমত চিন্তায় ছিল ডেভেলপারকে দেবার কিন্তু ওদের গড়িমসিতে ওরা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায়। ফাইনাল ডিসিশন হয় বাড়ি জমি বিক্রির। সিদ্ধান্তে যদিও পাঁজরে হাড়গুলো ভেঙ্গে যায় আর্যিকার। তবুও ভাইয়্যা মা এবং স্বামী সৈকতের কথায় সায় দেয়।

আর্যিকার বাবার এক বন্ধুই নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই চেয়েছে মিসেস রহমান এতো দিন ভালো লোকের, পরিচিত লোকের জন্য অপেক্ষা করেছেন। পেয়েও গেছেন তেমনি একজন আপন মানুষ। দাম দর ঠিক করাই আছে। ওরাও বাড়িটি দেখে গেছেন। এইবার ফাইনাল। আর্যিকাদের শেষ দেখা, নিজের বলে জানা বাড়িটি শেষবারের মত ঘুরে ঘুরে দেখা।

বাবা তুমি আমাকে কত ভালবাসতে। সেই ছোট্টটি যখন আমি তখনই আমার নামে বাড়ি বানিয়েছো। নাবিক তুমি কর্মময় জীবনের পলে পলে রাতের নক্ষত্র তোমার পথ চিনিয়ে দিত। সমুদ্রের ঢেউ এর অফুরন্ত উচ্ছাসে ছুটে চলা জাহাজ। ফেনিল উত্তাল ঢেউ গুণে গুণে আকাশের তারা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে চেয়ে তোমার রাত্রিবাস। আমাদের নামগুলোও রেখেছো ঐ নক্ষত্রদের নামে। আমরা তো তোমাকে পথের দিশা দিতে পারিনি বাবা। এতো অল্প সময় ছিলে আমাদের জীবন ধারাপাতে। আমি তখন মাত্র দশ বছরের অরিয়ন ভাইয়্যা প্রায় বিশ বাইশ। সে তোমার পথে গেছে বাবা। তোমার স্মৃতি ধরে রেখেছে। সেও তোমার মত জাহাজের নাবিক। বর্তমানে ম্যানচেস্টারেই থাকে। ওখান থেকেই সেল করে বাইরের জাহাজগুলোতে। চার মাস কখনও পাঁচ ছয় মাস একনাগাড়ে জাহাজেই তার অবস্থান। তোমার জীবনের গতি ছন্দ ওকে আলোড়িত করেছে। নিজের ভুবনে সে তোমাকেই খুঁজে পেয়েছে। আমি কেবল মাটির ঘটে। এঘর ওঘর আর আকাশের তারায় তারায় তোমাকে খুঁজি বাবা। তোমাকে খুঁজি। তুমি যখন সমুদ্রের লোনা জলে হারিয়ে গেলে আমাদের আশা আকাংক্ষা সুখ শান্তি ইচ্ছেরা আর ডানা মেলতে পারলো না। তবুও ভাইয়্যা এগিয়ে চলেছে। তোমার পদচিহ্ন ধরে ধরে।

আর্যিকারও বিয়ে হয়েছে বাবা মা দেবর ভাসুর নিয়ে ভরা ভরা সংসারে। আদরের কমতি ছিল না। শ^শুর-শ^াশুড়ি বাবা মায়ের অভাব পূরণ করেছেন। তাকে ভীষণ ভালোবাসেন। সেও ভালোবাসা পাবার মতই একজন। যদিও দুধের সাদ ঘোলে মেটে না তবুও মিটিয়ে চলেছে আর্যিকা নিজের গুণে। সেবা যত্মে আদর্শ বউ, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ মা হিসেবে নিজের যোগ্যতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে শ^শুরবাড়ীতে। তাঁদের প্রাণ এখন আর্যিকা। দাদা-দাদীর জানের টুকরা আর্দ্রা। কোথায়ও কোন ব্যত্যয় নেই।

তবুও বাবা এ বাড়িটিতে তোমার গায়ের ঘ্রাণ তোমার ছোঁয়া। তোমার পায়ের ছাপ লেখা আছে প্রতিটি কক্ষে এই তো আমার অতি প্রিয় প্রণাম্য ধাম। মন ভেঙ্গে যায় কাঁচের পাত্রের মত। আর দশটা সন্তানের মত কোন কাজে তোমাকে পাই নি। বাবার অভাব যদিও পূরণ করেছেন মা। লেখা-পড়া, চাকরী, বিয়ে, সংসার। একজনই অভিভাবক। সেই বাবা সেই মা। তোমার স্থান তোমরই। আমার পাঁজরের ভাঁজে ভাঁজে আকুতি-আর্তনাদ করে ডাকতো বাবা বাবা বলে কিন্তু সাড়া পাই নি। সেই ছোট বেলায় তোমার কোলে তোমার আদর ভালোবাসায় খেলনা চকলেট জামা জুতো ভরে থাকা সেই ক্ষণ। বারবার মনের দরজায় কড়া নাড়ে সেই দোতলা সাদা বাড়িটা। বহুদিন এই বাড়িটি থেকে আমরা দূরে। যে যার স্থানে অবস্থান। কিন্তু তবুও তোমার জ্যোৎনা আলো স্মৃতিগন্ধ মাখা বাড়িটি ছিল নিভৃতে দাঁড়িয়ে।

আজ সব কিছু ধুয়ে মুছে যাবে। সম্পর্কের আগড় ভেঙ্গে যাবে। বাবার পায়ের চিহ্ন মুছে যাবে। ভাবেতেই বুকের রক্ত সব সাদা হয়ে ঠান্ডা শীতল হয়ে যায়। এঘর ওঘর আর্যিকা খোঁজে আজ বাবাকে চোখের জলে স্মৃতিরা ঝাপসা হয় না। আরো উজ্জল জ¦লজ¦ল আকাশের লক্ষ কোটি তারা হয়ে ওঠে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ কেটে কেটে বাবার জাহাজ চলেছে ফেনিল জলরাশির চড়াই উৎরাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে। কি দুর্দান্ত দাপটে এর চলা। নিষ্ঠাবান নাবিক তার যোগ্য উত্তরসূরীর মন মননে সেই ডোর বেঁধে দিয়ে গেছেন সন্তান অরিয়নকে। বাবার মত উত্তাল সমুদ্রের বুকে ঢেউ গুণে তারাদের সাথে করে মিতালী। সেই ছোটবেলায় বাবার গায়ের ঘ্রাণে ওর ঘুম আসতো। ছোট ছোট আদর ভালোবাসা, চুমু, গায়ের সাথে শাপটে থাকা। বাবার পিঠে ঝুলে থাকা। ঐ একটু একটু ধূসর স্মৃতি আজ ওকে কাঁদিয়ে ফেরে। বলে- মা দেখ ঐ ঘরে বাবা তোমাকে ডাকছেন। ঐযে সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, কালো কোর্ট, মাথায় ক্যাপ।

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে বোবা দৃষ্টিতে জল ছলছল হয়ে ওঠে। কাছে এগিয়ে আসে স্বামী সৈকত। কাছে টেনে নেয় বলে- তোমার কষ্ট কারো সাথেই তুলনা যোগ্য নয়। তা বুঝি কিন্তু মা এবং বড় ভাইয়্যা সবারই তো কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে না? লক্ষ্মীটি চোখ মুছে ফেল, দেখ তোমার আর্দ্রা কেমন করে মুখ ভার করে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে কাছে নিয়ে আদর করো। সে তো কিছু বুঝতে পারছে না। সৈকতের কথায় সম্বিত ফিরে পায় আর্যিকা। আর্দ্রাকে কাছে টেনে আদর করে।

যারা ওদের বাড়িটি কিনছে তাদেরও কষ্ট হয় আর্যিকাকে দেখে। আলীমউদ্দীন সাহেব ওর বাবার বন্ধু। তিনি আর্যিকার দিকে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে আদর করে বলে- মা এটা তো তোমারই বাড়ি। তোমার নামটি তো আমরা মুছে ফেলবো না। তোমার যখন মন টানবে তখনই চলে আসবে এ বাড়িতেই থাকবে। সেই আগের মত। আমরা তো তোমার পর নই মা। তোমার বাবার সান্নিধ্যে থাকা মানুষ। তুমিও আমার মেয়ের মতই। এই জন্য তোমার মা আমাদের বেছে নিয়েছেন এতো লোকের মধ্যে। আমাদের হাতেই যত্মে থাকবে এই আশায়। আর্যিকা হাউজ নাম ফলকটা থাকবে। তুমি চিন্তা করো না মা।

আর্যিকা কথা বলে। বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বাবার বন্ধুর সাথে। তাই আঙ্কেল? মনটার মধ্যে একটু একটু অস্থিরতা কমতে থাকে। নিশ্চিতবোধ মাথা নাড়া দিয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে লোক দিয়ে বাবার তৈরী করা সেই সাদা মার্বেল পাথরের ওপরে কালো খোদাই করা নামের ফলকটা “আর্যিকা হাউজ” বুকের আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে আর্যিকা। আর্যিকা শান্ত মনে ঘরের বাইরে এসে আকাশ দেখে। তখন প্রায় বেশ রাত হয়ে গেছে। খোঁজে তারা সপ্তর্ষিমন্ডল নক্ষত্রপুঞ্জি ছায়াপথ। তারা ভরা স্বচ্ছ রাতের আকাশ জ¦লজ¦ল করছে। বাবার অবয়বে একটি তারা ওর দিকে এক নজরে চেয়ে আছে। আলোকিত করে আছে ওর মুখ। মুগ্ধ দৃষ্টিতে বাবার ছায়ার বিম্ব প্রতিবিম্বে ওর অবয়ব।unitednews24.com

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 deshersangbad.com/
Design & Developed BY Freelancer Zone