সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেঁচে থাকলে পহেলা বৈশাখ-ঈদ অনেক পাবেন: ওমর সানী লক্ষ্মীপুরে বেড়িবাঁধ সড়ক সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগ লক্ষ্মীপুরে ব্যবসায়িদের মাঝে মাস্ক বিতরণ করলেন এডভোকেট নয়ন সাকিবকে কলকাতার একাদশে রাখেননি বিশপ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চলবে সপ্তাহে তিনদিন সৌদি আরবে মঙ্গলবার থেকে রোজা শুরু বাংলাদেশি শিক্ষকদের আমেরিকান ফেলোশিপের আবেদন চলছে ঘরের কোন জিনিস কতদিন পরপর পরিষ্কার করা জরুরি কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্মম নির্যাতন, পায়ুপথে মাছ ঢুকানোর চেষ্টা পদ্মায় ভেসে উঠল শিশুর মরদেহ ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল বোনের ৭ দিনের সাধারণ ছুটির ঘোষণা আসতে পারে টার্গেট রমজান মাস তৎপর হয়ে উঠেছে ‘ভিক্ষুক চক্র’ মামুনুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে মিলেছে ৩ ডায়েরি এই ফলগুলো খেয়েই দেখুন!

প্রতারণা এবং সন্ত্রাস

নারায়ণগঞ্জের রিয়েল রিসোর্টে হেফাজতি নেতা মামুনুল হক নিজে যে আদর্শের কথা ওয়াজ মাহফিলে শোনান, সেই আদর্শের বাইরে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন কিছু তরুণের হাতে এবং আল্লাহর কসম খেয়ে ডাহা মিথ্যে কথা বলতে লাগলেন-এই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার পর শত শত মাদরাসার ছেলে তাদের গুরু মামুনুল হককে উদ্ধার করতে গিয়ে রিসোর্টের ভিতর রিসেপশন, রেস্তোরাঁ যা পেয়েছে ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়েছে। দেখে প্রশ্ন জাগছিল মনে, মাদরাসার ছেলেরা এভাবে অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করার কায়দা কোত্থেকে শিখেছে? হাতে ওদের এমন সব শক্ত লাঠি কে দিল? এমন সব অস্ত্র, যেগুলো দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা রিসোর্টের যাবতীয় জিনিসপত্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়! রিসোর্টের মালিক দুঃখ করে বলেছেন, তাঁর কয়েক কোটি টাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। যারা রিসোর্টে ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে, যারা মামুনুল হককে মাথায় তুলে সম্মান দিয়েছে, তারা কি জানে না মামুনুল হক সেই কাজটিই করেছেন যে কাজটিকে তিনি নিজেই অনৈতিক, অবৈধ, অন্যায় বলেন? তারা কি জানে না, আল্লাহর কসম কেটে তাদের গুরু মিথ্যে কথা বলেছেন? তারা সব জানে, কিন্তু এতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারা শিখেছে গুরু যত ভুলই করুন, গুরু যত মিথ্যেই বলুন, যত প্রতারণাই করুন, গুরুকে গুরু বলে মানতে হবে।

গুরুকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে। গুরু ১০০ খুন করে এলেও গুরু নির্দোষ। বলাই বাহুল্য, যুক্তিবুদ্ধিহীন অন্ধ বধির এক জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এই জনগোষ্ঠী তৈরির কারিগর মামুনুল হক এবং তার মৌলবাদী সহিংস সতীর্থরা।

প্রথমে ভেবেছিলাম মামুনুল হক তাঁর প্রেমিকা নিয়ে প্রমোদ বিহারে গেছেন, যেতেই পারেন, প্রেম করা অন্যায় নয়। পরে কিছু ফোনালাপ থেকে বোঝা গেল প্রেম নয়, দুজন মহিলার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করছেন। নিজের স্ত্রীকে দিনের পর দিন ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছেন, আর ওদিকে জান্নাত আরা ঝর্ণাকে, যাকে তিনি আল্লাহর কসম কেটে বলেছেন বিয়ে করেছেন, আসলে যাকে তিনি বিয়ে করেননি, নেহাত যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এত ভয়ংকর নারীবিদ্বেষী লোক নারীর সঙ্গে প্রেম করেন না, নারীকে নিজের নোংরা ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করেন। দুই রমণীই কিন্তু তাঁকে আপনি সম্বোধন করেন। দুজনই তাঁকে প্রভু মানেন। প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক কখনও প্রভু-দাসীর সম্পর্ক নয়। ঝর্ণার সঙ্গে কোনও এক ভাইয়ার ফোনালাপ থেকে আমরা জানতে পারি তিনি এবং মামুনুল হক স্বামী-স্ত্রীর মতো বাস করেন বটে, তবে তাঁদের বিয়ের কোনও কাবিননামা হয়নি, রেজিস্ট্রেশনও হয়নি। ঝর্ণা নিজেই বলেছেন এ কথা। কাবিননামা হয়নি এবং রেজিস্ট্রেশন হয়নি মানে বিয়ে হয়নি। ঝর্ণা কিন্তু বিয়ে হবে বলে বসে আছেন এবং মামুনুল হক তাঁকে ভোগ করে যাচ্ছেন বিয়ে করবেন এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এই কাজটি কারা করে বলে আমরা জানি? তাদের তো প্রতারণার দায়ে জেল খাটতে হয়। সরকারি প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে মামুনুল হককে জেল খাটতে হচ্ছে না।

মামুনুল হকেরা বাংলাদেশের আইনে বিশ্বাস না করলেও শরিয়া আইনে বেশ বিশ্বাস করেন। তাঁকে যদি ব্যভিচারের শাস্তি শরিয়া আইনে দেওয়া হয়? তাহলে সেই শাস্তি তিনি সহ্য করতে পারবেন তো? কী করে করবেন, সেটি তো আবার পাথর ছুঁড়ে হত্যা। মামুনুল হকের ভাগ্য ভালো যে তিনি যে দেশে বাস করেন, সে দেশে শরিয়া আইন নেই, যে আইন আনার জন্য তিনি দিনভর চিৎকার করেন এবং ভক্তবৃন্দকে উত্তেজিত করেন। হেফাজতি নেতাদের মধ্যে মামুনুলের কীর্তি নিয়ে ফোনালাপ, স্ত্রীর সঙ্গে শহীদুলের স্ত্রী ঝর্ণার সম্পর্ক এবং লোকের কাছে মিথ্যে বলা শিখিয়ে দেওয়ার জন্য মামুনুলের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে মামুনুলের ফোনালাপ, মামুনুলের স্ত্রীকে মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে মিথ্যে বলতে শিখিয়ে দেওয়ার জন্য মামুনুলের বোনের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে মামুনুলের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ঝর্ণার পুত্রের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে কাবিননামা এবং রেজিস্ট্রেশন না হওয়া বিষয়ে এক ভাইয়ার ফোনালাপ, মামুনুলের সঙ্গে তৃতীয় মহিলার ঘনিষ্ঠ ফোনালাপ, মামুনুলের প্রতারণা সম্পর্কে ঝর্ণার পুত্রের ভিডিও। এগুলো শুনলেই প্রতারক মামুনুলের চরিত্র উন্মোচিত হয়। মাত্র দুটি প্রতারণার কাহিনী বেরোলো। এরকম কত কাহিনী আছে, কে জানে।

নারী নির্যাতন, নারী হেনস্তা, নারীর সঙ্গে প্রতারণা বাংলাদেশের বদ পুরুষলোকেরা অহরহই করে। মামুনুল যেহেতু নেতা, যেহেতু তার আদেশে লক্ষ পঙ্গপাল চারদিক পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, নিজেরা শুধু খুন করতে নেমে পড়ে না, নিজেরা খুন হতেও নেমে পড়ে, …সেহেতু মামুনুলের চরিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ জরুরি। পঙ্গপালগুলোর জানা জরুরি কোন নিকৃষ্ট লোকের, কোন প্রতারকের, মিথ্যুকের, কোন স্বার্থান্ধ বদলোকের আদেশ তারা মেনে চলে। হয়তো যারা অন্ধভক্ত, তাদের কোনও বোধোদয় হবে না। কিন্তু যারা এখনও অন্ধ হয়নি, তাদের তো পরিবর্তন হতে পারে।

মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা তো অপরাধ, মামুনুল তো সেই অপরাধ করছেনই, সবচেয়ে বড় অপরাধ তিনি করছেন, তাঁর ওয়াজে তিনি প্রগতির বিরুদ্ধে, মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে, নারীর বিরুদ্ধে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিষ উগড়ে দিচ্ছেন, সেই বিষের ক্রিয়ায় শত শত শিশু কিশোর যুবক হিংস্র দাঙ্গাবাজ হয়ে উঠছে। যুবসমাজকে তিনি সন্ত্রাসবাদে আর জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করছেন-এটি নিশ্চিতই তাঁর অক্ষমাযোগ্য অপরাধ।

এই তো সেদিন তিনি মাদাসার ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়েছেন সারাদেশজুড়ে সন্ত্রাস করার জন্য। সন্ত্রাস করেছে তারা, দেশের অমূল্য সব সম্পদ পুড়িয়ে দিয়েছে, শুধু তাই নয়, নিজেরাও মরেছে। জেনেবুঝে দেশ ও মানুষের সর্বনাশ করা খুব বড় অপরাধ। এই অপরাধের কারণে মামুনুল হকের শাস্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর কারণে মৃত্যু হলো ভক্তকুলের, কোথায় তিনি নিজেকে তাঁদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে গ্লানিবোধ করবেন, কোথায় তিনি কাঁদবেন, হাহাকার করবেন, তিনি চলে গেলেন আনন্দ করতে। তারপরও কি ভক্তকুল তাঁর আচরণে ক্ষুব্ধ হবে না? গুরুর চরণামৃত খেয়ে গুণগান গাওয়া ছাড়া আর কিছু ভক্তকুলের মগজে ঢোকানো হয়নি।

তবে মামুনুলকে নিয়ে হেফাজতি অন্য নেতাদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁরা যদি কখনও মামুনুলকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তাহলে কি এই সংগঠনকে কোনও সভ্য সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হবে? আমার তো মনে হয় না। মামুনুলের মতো প্রতারক যদি নাও হন, হেফাজতি নেতারা সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করেন, এ কথা সত্য। এ পর্যন্ত হেফাজতের নেতারা মাদরাসার শিশু-কিশোরদের দিয়ে দেশজুড়ে সন্ত্রাস ঘটানোর জন্য ক্ষমা চাননি, দুঃখ প্রকাশও করেননি। তবে কী কারণে মামুনুল হককেই একা মন্দ বলে মনে করছি? ভারতের দেওবন্দিরা কোনও দাঙ্গা ফ্যাসাদ ভায়োলেন্সে যায় না। কিন্তু দেওবন্দি আদর্শ মেনে চলা বাংলাদেশের হেফাজতে ইসলাম, আফগানিস্তানের তালিবান, পাকিস্তানের লস্করে ঝাংভি, সিপাহে সাহাবা, তেহরিকে তালিবান দিব্যি সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানে সিপাহে সাহাবা সংগঠনটি নিষিদ্ধ হয়েছে। বাকি সব সন্ত্রাসী সংগঠনই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক ইসলাম খুব বিপজ্জনক। রাজনৈতিক ইসলামের নেতারা দেশে শরিয়া আইন চালু করতে চান, যে আইনে মেয়েদের কোনও অধিকার থাকবে না। যারা আল্লাহর কসম কেটে মিথ্যে কথা বলেন, তারা, কোনও ভুল নয় যে, আল্লাহ বিশ্বাস করেন না। আল্লাহ রসুলকে তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেন মাত্র। শরিয়া আইন চালু করতে চান তাঁদের নারীবিদ্বেষ আর অমুসলিমবিদ্বেষের জন্য। কোনও নারী যেন অধিকার বা স্বাধীনতা বলতে কিছু না পায়, কোনও অমুসলিমেরও যেন এ অঞ্চলে বাস করার কোনও অধিকার না থাকে।

যারা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নষ্ট করেছে, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সংগীত একাডেমি পুড়িয়ে দিয়েছে, যারা লাইব্রেরি পুড়িয়েছে, যারা জনগণের সম্পদ বাস ট্রাক জ্বালিয়ে দিয়েছে, যারা মন্দির ভেঙেছে তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? নাকি এই সন্ত্রাসবাদীদের সকল সন্ত্রাস ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে? জানি সরকারি দলের অনেকে মনে করেন, সত্যিকার রাজনৈতিক দল থাকার চেয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসলামী মৌলবাদী সন্ত্রাসীরাই থাকা ভালো। এতে বিপদ দেখলে এদের দান দক্ষিণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, বাইরের বিশ্বের কাছ থেকে সহানুভূতিও জুটবে, মৌলবাদের মোকাবিলা করার জন্য।

আধুনিকতাও চাই, মৌলবাদও চাই, এ হয় না। সংস্কৃতিও চাই, অপসংস্কৃতিও চাই, এ হয় না। শান্তি চাই, সন্ত্রাসও চাই, এ হয় না। দুই নৌকোয় পা দিয়ে চললে ডুবে মরতে হয়, এই সত্য কি ডুবে না মরা পর্যন্ত বিশ্বাস হবে না?

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

Please Share This Post in Your Social Media

দেশের সংবাদ নিউজ পোটালের সেকেনটের ভিজিটর

38442392
Users Today : 603
Users Yesterday : 1265
Views Today : 7996
Who's Online : 34
© All rights reserved © 2011 deshersangbad.com/
Design And Developed By Freelancer Zone