মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ডাবের খোসায় গর্ত ভরাট‍! নিয়মিত পর্নো ভিডিও দেখতেন শিশুবক্তা রফিকুল আইপিএল নিয়ে জুয়ার আসর থেকে আটক ১৪ কারাগারে কেমন কাটছে পাপিয়ার দিনকাল এক ঘুমে কেটে গেলো ১৩ দিন! কেউ ‘কাজের মাসি’, কেউবা ‘সেক্সি ননদ-বৌদি’ ৬৪২ শিক্ষক-কর্মচারীর ২৬ কোটি টাকা ছাড় করোনায় আরো ৬৯ জনের মৃত্যু, আক্রন্ত ৬০২৮ বাংলাদেশে করোনা টানা তিনদিন রেকর্ডের পর কমল মৃত্যু, শনাক্তও কম করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি শো-রুম থেকে প্যান্ট চুরি করে ধরা খেলেন ছাত্রলীগ নেতা করোনা নিঃশব্দ ও অদৃশ্য ঘাতক,সতর্কতাই এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ——-ওসি দীপক চন্দ্র সাহা তানোরে প্রণোদনার কৃষি উপকরণ বিতরণ শিবগঞ্জে কৃষি জমিতে শিল্প পার্কের প্রস্তাবনায় এলাকাবাসীর মানববন্ধন সড়কের বেহাল দশায় চরম জনদুর্ভোগ

বঙ্গবন্ধুর এবারের সংগ্রাম…

 

ঢাকা : প্রায় চার হাজার বছর ধরে ইহুদিরা ছিল উদ্বাস্তু, দণ্ডিত এবং উৎপীড়িত। তারা মিসরে ও ব্যাবিলনে দাসত্ব করেছে। মধ্যযুগে তাদের পড়তে হয়েছে কলঙ্কিত পোশাক। জার্মানিতে বছরে মাত্র ২৪ জন ইহুদি বিয়ে করার অনুমতি পেতেন। হলুদ তারকা জার্মান না ইহুদি—এই পরিচিতির জন্য তাদের ব্যাজ পরিধান করতে বাধ্য করা হয়। নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। মাঝে মাঝে গবেষকরা বলেন দেড় থেকে দুই কোটি। এক সময়ের সেই হতভাগ্য ইহুদিরা আজ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইহুদিদের মতো কালো মানুষদের অবস্থা ছিল আরো ভয়াবহ। আমেরিকার পাঁচশ বছরের মধ্যে তিনশ বছরই কালোরা ছিল দাস। তাদেরও রেস্তোরাঁয় ঢোকার অনুমতি এবং ভোটের অধিকার ছিল না। রেস্তোরাঁয় লেখা থাকত ‘নো ডগ নো নিগ্রো।’ ১৯৬৫ সালের ৭ মার্চ এলবামা রাজ্যের সেলমায় কৃষ্ণাঙ্গ জননেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের নেতৃত্বে যে মিছিলটি হয়েছিল সেই মিছিলের ওপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশেরা নির্মম বেত্রাঘাত আর ঘোড়া চাপিয়ে দেওয়ার দৃশ্য এখন কি লজ্জা দেয় না আমেরিকানদের? ১৯৬৫ সালে কংগ্রেস নাগরিক অধিকার আইনে কৃষ্ণাঙ্গদের চাকরি, শিক্ষা, বাসস্থান, বর্ণবৈষম্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শোষণমুক্ত সমাজ, শিশুদের সম-অধিকার (স্কুল, খেলার মাঠে এবং এক টেবিলে বসার) বৈষম্যমূলক আইন প্রত্যাহার করে সরকার তাদের ভোটাধিকার দেন।

প্রকৃতির নিয়ম-কানুন বড়ই জটিল। কে কখন উত্থান পতনের চক্রে পড়বে তা কোনো মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক জাতি এক রাষ্ট্র এই ধারণার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এর ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, দৈহিক গঠনপ্রণালি প্রভৃতি কারণে বাঙালি জাতি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা। স্বাভাবিক কারণে আমাদের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ ঘটে। যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৮০০ বছর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরব জাতি এসে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। কালক্রমে গাঙ্গেয় বঙ্গে বসবাসরত এসব বিভিন্ন উপজাতির সংমিশ্রণকে বাঙালি জাতি নামে অভিহিত করা হয়েছে। বস্তুত এত বিচিত্র বর্ণ, আকৃতি বাঙালিদের মধ্যে রয়েছে যে, বাঙালিদের আদর্শ নৃতাত্ত্বিক গঠন প্রকৃতির বর্ণনা করা কষ্টকর। মোটামুটিভাবে বলা যায়—গায়ের শ্যামলা রং, মাথার কালো চুল, মধ্যম আকৃতি, মুখের ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান ও সর্বজননীতা বাঙালি জাতিকে বর্মী কিংবা বালুচদের থেকে পৃথক করা হয়েছে। প্রাচীন যুগে বাংলা নামে কোনো অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না। বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন বঙ্গ, পুণ্ড্র, হরিকেল, সমতট, বরেন্দ্র এরকম প্রায় ১৬টি জনপদে বিভক্ত ছিল। বাংলার বিভিন্ন অংশে অবস্থিত প্রাচীন জনপদগুলোর সীমা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। কেননা বিভিন্ন সময়ে এসব জনপদের সীমানা হ্রাস অথবা বৃদ্ধি পেয়েছে।

হাজার বছরের বাঙালি জাতির ইতিহাসের শুরু থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই বাংলার মাটিতে কোনো বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন কোনো ব্যক্তিত্ব স্বাধীন বাঙালি জাতির শাসক বা পরিচালক ছিলেন না। শক, হুন, পাল, সেন, মোগল, পাঠান, ফরাসি, ব্রিটিশ, পাঞ্জাবি সকল শাসকই ছিলেন বহিরাগত। জন্মভাষা কৃষ্টি ইত্যাকার সকল দিক থেকেই তারা ছিলেন অবাঙালি। কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মহানায়ক যিনি বাংলার মাটিতে, বাঙালি পরিবারে বাংলা ভাষার উত্তরাধিকার নিয়ে ভূমিষ্ঠ এবং স্থান-কাল পরিবেশসহ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালি চিন্তা-চেতনার ধারক-বাহক ছিলেন। শেখ মুজিব তার স্কুল জীবনের শুরু থেকেই বাংলা ও বাঙালির কথা ভাবতে শুরু করেন। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার লাল-সবুজ বিজয় পতাকা এনে দেওয়ার আগে সামরিক শাসকের অধীনে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সেই নির্বাচনে জাতির কাছে বঙ্গবন্ধুর আবেদনের একাংশ হলো—‘প্রিয় ভাইবোনরা, বাংলার যে জননী শিশুকে দুধ দিতে দিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় মারা গেল, বাংলার যে শিক্ষক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবন দিল, বাংলার যে ছাত্র স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামে রাজপথে রাইফেলের সামনে বুক পেতে দিল, বাংলার যে শ্রমিক কুর্মিটোলার বন্দি শিবিরে অসহায় অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো, বাংলার যে কৃষক ধানক্ষেতের আলের পাশে প্রাণ হারাল—তাদের বিদেহী অমর আত্মা বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, ঘরে ঘরে ঘুরে ফিরছে এবং অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার দাবি করছে। রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে যে আন্দোলন তারা গড়ে তুলেছিলেন, সে আন্দোলন ৬ দফা ও ১১ দফার। আমি তাদেরই ভাই। আমি জানি, ৬ দফা ও ১১-দফা বাস্তবায়নের পরই তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। কাজেই আপনারা আওয়ামী লীগের প্রতিটি প্রার্থীকে ‘নৌকা’ মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে জয়যুক্ত করে আনুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জালেমদের ক্ষুরধার নখদন্ত জননী বঙ্গভূমির বক্ষ বিদীর্ণ করে হাজারো সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা জয়যুক্ত হব। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমাদের সহায় হবেন।’

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে প্রতিমুহূর্ত ছিল টানটান উত্তেজনা। বিজয়ী পার্টির জননেতা হিসেবে স্বাধীনতার মহানায়ক ৭ মার্চ দুপুর তিনটার খানিক পরে রমনা রেসকোর্স ময়দানের মঞ্চে ওঠেন। সভায় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। বঙ্গবন্ধু কালো ভারী ফ্রেমের চশমাটি খুলে রাখলেন ঢালু টেবিলের ওপর। তারপর সামনে তাকিয়ে শান্ত গভীর কণ্ঠে বললেন, ‘ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।’ সারা মাঠ হঠাৎ শান্ত। শুধু আছড়ে পড়ছে চারদিকে বঙ্গবন্ধুর ভরাট কণ্ঠস্বর। ২৩ বছরের ইতিহাস, এসেম্বলিতে যাওয়ার চার শর্ত উল্লেখ করে বললেন, শর্তগুলো মানলে তিনি বিবেচনা করে দেখবেন এসেম্বলিতে যোগদান করবেন কি না। তখন সারা রেসকোর্স হাততালি দিয়ে তার দাবিকে সমর্থন জানাল। কিন্তু মানুষের মনে শঙ্কা, যদি পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করে, হত্যা করে, তাহলে কী হবে? এটি বুঝেই বোধ হয় বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ বক্তৃতা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধু জাতিকে নিরাশ করলেন না। সবশেষে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ উনিশ মিনিটের অলিখিত ভাষণে তাকে একবারও থমকে দাঁড়াতে হয়নি। উপস্থিত-অনুপস্থিত জনতা কোন পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তিনি গ্রেপ্তার হলে কী করতে হবে, এ ভাষণে তারও নির্দেশনা ছিল। কঠিন সংকটে এত ভারসাম্যপূর্ণ অথচ আবেগময় বক্তৃতার সংখ্যা পৃথিবীতে বিরল। তিনি পেরেছিলেন বলেই তো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা, স্বাধীনতার মহান স্থপতি এবং বাংলাদেশের মহানায়ক। আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গের ভাষণের সময় তিনি ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি চেয়েছিলেন দাস প্রথা তুলে দিয়ে রাজ্যগুলোর গৃহযুদ্ধ থামিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করতে। বাঙালির মহামুক্তি এই সনদপত্র বা ভাষণ স্বাধীনতার আহ্বান—কীভাবে লড়াই করতে হবে তার পরিপূর্ণ সঠিক নির্দেশনা। মহান সৃষ্টিকর্তা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের সারা বিশ্বে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি ও দেশ হিসেবে পরিচিত করবেন বলেই হয়তো তিনি মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভরসা করে সেদিন বলেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইন্শাআল্লাহ।’

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান যেমন এই বাঙালির গর্ব, তেমনি স্বাধিকার আন্দোলনের পথে তার ৭ মার্চের প্রদত্ত ভাষণটি আজ বিশ্বের সম্পদ। তাই আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু ও তার ৭ মার্চের ভাষণ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ধরা দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
kaisardinajpur@yahoo.com সোনালীনিউজ

Please Share This Post in Your Social Media

দেশের সংবাদ নিউজ পোটালের সেকেনটের ভিজিটর

38444289
Users Today : 1244
Users Yesterday : 1256
Views Today : 15866
Who's Online : 35
© All rights reserved © 2011 deshersangbad.com/
Design And Developed By Freelancer Zone