সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
লক্ষ্মীপুরে বেড়িবাঁধ সড়ক সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগ লক্ষ্মীপুরে ব্যবসায়িদের মাঝে মাস্ক বিতরণ করলেন এডভোকেট নয়ন সাকিবকে কলকাতার একাদশে রাখেননি বিশপ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চলবে সপ্তাহে তিনদিন সৌদি আরবে মঙ্গলবার থেকে রোজা শুরু বাংলাদেশি শিক্ষকদের আমেরিকান ফেলোশিপের আবেদন চলছে ঘরের কোন জিনিস কতদিন পরপর পরিষ্কার করা জরুরি কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্মম নির্যাতন, পায়ুপথে মাছ ঢুকানোর চেষ্টা পদ্মায় ভেসে উঠল শিশুর মরদেহ ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল বোনের ৭ দিনের সাধারণ ছুটির ঘোষণা আসতে পারে টার্গেট রমজান মাস তৎপর হয়ে উঠেছে ‘ভিক্ষুক চক্র’ মামুনুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে মিলেছে ৩ ডায়েরি এই ফলগুলো খেয়েই দেখুন! বাস নেই-লঞ্চ নেই, বাড়িতে যাওয়াও থেমে নেই

বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ৪ হাজার ৬৮২ দিন

সহজ-সরল, সাদামাঠা অথচ দৃঢ়চেতা একজন মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেহসৌষ্ঠবে এবং বজ্রকণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তির এই মানুষটিকে সহজেই আলাদাভাবে চেনা যেত। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর শাসনের নামে শোষণের প্রতিবাদে সংগ্রাম করতে গিয়ে ৪ হাজার ৬৮২ দিন তিনি কারাভোগ করেছেন।

৫৪ বছর বয়সের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের সিকিভাগ। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে ৭ দিন কারাভোগ করেন, বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তার জেলে কাটে পাকিস্তান আমলে। বঙ্গবন্ধু ১৯৩৮ সালে প্রথম কারাগারে যান। তখন তিনি ছিলেন স্কুলছাত্র। প্রথমবার জেলে যাওয়ার ঘটনাটি বঙ্গবন্ধু নিজে লিখেছেন, তা পরবর্তীতে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর লেখায় তার প্রথম জেল জীবন (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ থেকে) – 

১৯৩৮ সালের ঘটনা। শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তারা গোপালগঞ্জে আসবেন। বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। এগজিবিশন হবে ঠিক হয়েছে। বাংলার এই দুই নেতা একসঙ্গে গোপালগঞ্জে আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি হল। স্কুলের ছাত্র আমরা তখন। আগেই বলেছি আমার বয়স একটু বেশি, তাই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করার ভার পড়ল আমার উপর। আমি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে। পরে দেখা গেল, হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে লাগল। ব্যাপার কি বুঝতে পারছি না। এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেও ছাত্র, সে আমাকে বলল, কংগ্রেস থেকে নিষেধ করেছে আমাদের যোগদান করতে। যাতে বিরূপ সংবর্ধনা হয় তারও চেষ্টা করা হবে। এগজিবিশনে যাতে দোকানপাট না বসে তাও বলে দেয়া হয়েছে। তখনকার দিনে শতকরা আশিটি দোকান হিন্দুদের ছিল। আমি এ খবর শুনে আশ্চর্য হলাম। কারণ আমার কাছে তখন হিন্দু মুসলমান বলে কোনো জিনিস ছিল না। হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। একসঙ্গে গান বাজনা, খেলাধুলা, বেড়ানো- সবই চলতো।

আমাদের নেতারা বললেন, হক সাহেব মুসলিম লীগের সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন বলে হিন্দুরা ক্ষেপে গিয়েছে। এতে আমার মনে বেশ একটা রেখাপাত করল। হক সাহেব ও শহীদ সাহেবকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। তার জন্য যা কিছু প্রয়োজন আমাদের করতে হবে। আমি মুসলমান ছেলেদের নিয়েই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী করলাম, তবে কিছু সংখ্যক নমশূদ্র শ্রেণির হিন্দু যোগদান করল। কারণ মুকুন্দবিহারী মল্লিক তখন মন্ত্রী ছিলেন এবং তিনিও হক সাহেবের সঙ্গে আসবেন। শহরে হিন্দুরা সংখ্যায় খুবই বেশি, গ্রাম থেকে যথেষ্ট লোক এলো, বিশেষ করে নানা রকম অস্ত্র নিয়ে, যদি কেউ বাধা দেয়! যা কিছু হয়, হবে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হতে পারত।

হক সাহেব ও শহীদ সাহেব এলেন, সভা হল। এগজিবিশন উদ্বোধন করলেন। শান্তিপূর্ণভাবে সব কিছু হয়ে গেল। হক সাহেব পাবলিক হল দেখতে গেলেন। আর শহীদ সাহেব গেলেন মিশন স্কুল দেখতে। আমি মিশন স্কুলের ছাত্র। তাই তাকে সংবর্ধনা দিলাম। তিনি স্কুল পরিদর্শন করে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের দিকে চললেন, আমিও সঙ্গে সঙ্গে চললাম। তিনি ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছিলেন, আর আমি উত্তর দিচ্ছিলাম। আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার নাম এবং বাড়ি কোথায়। একজন সরকারি কর্মচারী আমার বংশের কথা বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে ডেকে নিলেন খুব কাছে, আদর করলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ বললাম, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নাই। মুসলিম ছাত্রলীগও নাই।’ তিনি আর কিছুই বললেন না, শুধু নোটবুক বের করে আমার নাম ও ঠিকানা লিখে নিলেন। কিছুদিন পরে আমি একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং লিখেছেন কলকাতা গেলে যেন তার সঙ্গে দেখা করি। আমিও তার চিঠির উত্তর দিলাম। এইভাবে মাঝে মাঝে চিঠিও দিতাম।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

এই সময় একটা ঘটনা হয়ে গেল। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে একটু আড়াআড়ি চলছিল। গোপালগঞ্জ শহরের আশপাশেও হিন্দু গ্রাম ছিল। দু’একজন মুসলমানের উপর অত্যাচারও হল। আবদুল মালেক নামে আমার এক সহপাঠী ছিল। সে খন্দকার শামসুদ্দীন সাহেবের আত্মীয় হত। একদিন সন্ধ্যায়, আমার মনে হয় মার্চ বা এপ্রিল মাস হবে, আমি ফুটবল মাঠ থেকে খেলে বাড়িতে এসেছি; আমাকে খন্দকার শামসুল হক ওরফে বাসু মিয়া মোক্তার সাহেব (পরে মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন) ডেকে বললেন, ‘মালেককে হিন্দু মহাসভা সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে মারপিট করছে। যদি পার একবার যাও। তোমার সঙ্গে ওদের বন্ধুত্ব আছে বলে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আস।’ আমি আর দেরি না করে কয়েকজন ছাত্র ডেকে নিয়ে ওদের ওখানে যাই এবং অনুরোধ করি ওকে ছেড়ে দিতে। রমাপদ দত্ত নামে এক ভদ্রলোক আমাকে দেখেই গাল দিয়ে বসল। আমিও তার কথার প্রতিবাদ করলাম এবং আমার দলের ছেলেদের খবর দিতে বললাম।

এর মধ্যে রমাপদরা থানায় খবর দিয়েছে। তিনজন পুলিশ এসে হাজির হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, ‘ওকে ছেড়ে দিতে হবে, নাহলে কেড়ে নেব।’ আমার মামা শেখ সিরাজুল হক (একই বংশের) তখন হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতেন। তিনি আমার মা ও বাবার চাচাতো ভাই। নারায়ণগঞ্জে আমার এক মামা ব্যবসা করেন, তার নাম শেখ জাফর সাদেক। তার বড় ভাই ম্যাট্রিক পাস করেই মারা যান। আমি খবর দিয়েছি শুনে দলবল নিয়ে ছুটে এসেছেন। এর মধ্যেই আমাদের সাথে মারপিট শুরু হয়ে গেছে। দুই পক্ষে ভীষণ মারপিট হয়। আমরা দরজা ভেঙে মালেককে কেড়ে নিয়ে চলে আসি।

শহরে খুব উত্তেজনা। আমাকে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। সেদিন রবিবার। আব্বা বাড়ি গিয়েছিলেন। পরদিন ভোরবেলায় আব্বা আসবেন। বাড়ি গোপালগঞ্জ থেকে চৌদ্দ মাইল দূরে। আব্বা শনিবার বাড়ি যেতেন আর সোমবার ফিরে আসতেন, নিজেরই নৌকা ছিল। হিন্দু নেতারা রাতে বসে হিন্দু অফিসারদের সাথে পরামর্শ করে একটা মামলা দায়ের করল। হিন্দু নেতারা থানায় বসে এজাহার ঠিক করে দিলেন। তাতে খন্দকার শামসুল হক মোক্তার সাহেব হুকুমের আসামি। আমি খুন করার চেষ্টা করেছি, লুটপাট দাঙ্গাহাঙ্গামা লাগিয়ে দিয়েছি। ভোরবেলায় আমার মামা, মোক্তার সাহেব, খন্দকার শামসুদ্দীন আহমেদ এমএলএ সাহেবের মুহুরি জহুর শেখ, আমার বাড়ির কাছের বিশেষ বন্ধু শেখ নুরুল হক ওরফে মানিক মিয়া, সৈয়দ আলী খন্দকার, আমার সহপাঠী আবদুল মালেক এবং অনেক ছাত্রের নাম এজাহারে দেয়া হয়েছিল। কোনো গণ্যমান্য লোকের ছেলেদের বাকি রাখে নাই। সকাল ন’টায় খবর পেলাম আমার মামা ও আরো অনেককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। আমাদের বাড়িতে কি করে আসবে- থানার দারোগা সাহেবদের একটু লজ্জা করছিল! প্রায় দশটার সময় টাউন হল মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে দারোগা আলাপ করছে, তার উদ্দেশ্য হল আমি যেন সরে যাই। টাউন হলের মাঠের পাশেই আমার বাড়ি। আমার ফুফাতো ভাই, মাদারীপুর বাড়ি। আব্বার কাছে থেকেই লেখাপড়া করত, সে আমাকে বলে, ‘মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাও না।’ বললাম, ‘যাব না, আমি পালাব না। লোকে বলবে, আমি ভয় পেয়েছি।’

এই সময় আব্বা বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। দারোগা সাহেবও তার পিছে পিছে বাড়িতে ঢুকে পড়েছেন। আব্বার কাছে বসে আস্তে আস্তে সব কথা বললেন। আমার গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখালেন। আব্বা বললেন, ‘নিয়ে যান।’ দারোগা বাবু বললেন, ‘ও খেয়ে দেয়ে আসুক, আমি একজন সিপাহি রেখে যাচ্ছি, এগারটার মধ্যে যেন থানায় পৌঁছে যায়। কারণ, দেরি হলে জামিন পেতে অসুবিধা হবে।’ আব্বা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মারামারি করেছ?’ আমি চুপ করে থাকলাম, যার অর্থ ‘করেছি’।

আমি খাওয়া-দাওয়া করে থানায় চলে এলাম। দেখি আমার বাবা, মানিক, সৈয়দ আরো সাত-আটজন হবে, তাদেরকে পূর্বেই গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে এসেছে। আমার পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে পাঠিয়ে দিল। হাতকড়া দেয় নাই, তবে সামনেও পুলিশ পিছনেও পুলিশ। কোর্ট দারোগা হিন্দু ছিলেন, কোর্টে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কোর্ট হাজতের ছোট কামরার মধ্যে বন্ধ করে রাখলেন। কোর্ট দারোগার রুমের পাশেই কোর্ট হাজত। আমাকে দেখে বলেন, ‘মুজিবর খুব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিল রমাপদকে। কিছুতেই জামিন দেয়া যেতে পারে না।’ আমি বললাম, ‘বাজে কথা বলবেন না, ভালো হবে না।’ যারা দারোগা সাহেবের সামনে বসেছিলেন, তাদের বললেন, ‘দেখ ছেলের সাহস!’ আমাকে অন্য সবাই কথা বলতে নিষেধ করল। পরে শুনলাম, আমার নামে এজাহার দিয়েছে এই কথা বলে যে, আমি ছোরা দিয়ে রমাপদকে হত্যা করার জন্য আঘাত করেছি। তার অবস্থা ভয়ানক খারাপ, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে রমাপদের সঙ্গে আমার মারামারি হয় একটা লাঠি দিয়ে, ও আমাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করলে আমিও লাঠি দিয়ে প্রত্যাঘাত করি। যার জন্য ওর মাথা ফেটে যায়। ‍মুসলমান উকিল মোক্তার সাহেবরা কোর্টে আমাদের জামিনের আবেদন পেশ করল।

একমাত্র মোক্তার সাহেবকে টাউন জামিন দেয়া হল। আমাদের জেল হাজতে পাঠানোর  হুকুম হল। এসডিও হিন্দু ছিল, জামিন দিল না। কোর্ট দারোগা আমাদের হাতকড়া পরাতে হুকুম দিল। আমি রুখে দাঁড়ালাম, সবাই আমাকে বাধা দিল, জেলে এলাম। সাব-জেল, একটা মাত্র ঘর। একপাশে মেয়েদের থাকার জায়গা, কোনো মেয়ে আসামি না থাকার জন্য মেয়েদের ওয়ার্ডে রাখলো। বাড়ি থেকে বিছানা, কাপড় এবং খাবার দেবার অনুমতি দেয়া হল। শেষ পর্যন্ত সাতদিন পরে আমি প্রথম জামিন পেলাম। দশ দিনের মধ্যে আর সবাই জামিন পেয়ে গেল। হক সাহেব ও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে টেলিগ্রাম করা হল। লোকও চলে গেল কলকাতায়। গোপালগঞ্জে ভীষণ উত্তেজনা চলছিল। হিন্দু উকিলদের সঙ্গে আব্বার বন্ধুত্ব ছিল। সবাই আমার আব্বাকে সম্মান করতেন। দুই পক্ষের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়ে ঠিক হল মামলা তারা চালাবে না। আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে পনের শত টাকা। সবাই মিলে সেই টাকা দিয়ে দেয়া হল। আমার আব্বাকেই বেশি দিতে হয়েছিল। এই আমার জীবনের প্রথম জেল।

পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর কারাবাস

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ— এদিন জীবনের দ্বিতীয়বার ও পাকিস্তান আমলে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বানকালে গ্রেফতার হয়ে তিনি পাঁচদিন কারাবরণ করেন। এরপর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমগ্র দেশ সফর শুরু করে। এই সফরে থাকা অবস্থায় ফরিদপুরে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আবার গ্রেফতার হন তিনি। ১৩২ দিন কারাভোগের পর মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১টা ৩০ মিনিটে গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে নেওয়া হয়। পাকিস্তানে নেওয়ার পর বিভিন্ন পত্রিকায় এ ছবি প্রকাশিত হয়

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১টা ৩০ মিনিটে গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে নেওয়া হয়। পাকিস্তানে নেওয়ার পর বিভিন্ন পত্রিকায় এ ছবি প্রকাশিত হয়

১৯৪৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ধর্মঘটের ডাক দেয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু তাদের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৯ এপ্রিলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। মুক্তি পান জুলাই মাসে। এরপর একইভাবে কয়েক দফায় গ্রেফতার হন এবং মুক্তি লাভ করেন।

ওই বছর ১৪ অক্টোবর আর্মানিটোলা ময়দানে আয়োজিত জনসভা থেকে দরিদ্র মানুষের খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করা হয়। মিছিল থেকে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। এবারে বঙ্গবন্ধু প্রায় দুই বছর পাঁচ মাস কারাগারে থাকতে হয়। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চলে। এতে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে। জেল থেকে বঙ্গবন্ধু এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন এবং অনশনে যান। টানা অনশনে অসুস্থ বঙ্গবন্ধুকে স্বাস্থ্যগত কারণে ২৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ৩০ মে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু করাচী থেকে ঢাকায় ফেরার পর গ্রেফতার হন। ২০৬ দিন কারা ভোগ করে ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর উপর আক্রমণ এবং তার মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি করে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেও জেল গেটেই আবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬০ সালে ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেফতার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেয়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনা, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন শহরে আটবার গ্রেফতার হন এবং মুক্তি পান। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে সভা শেষ করে ঢাকা ফেরার পর ৮ মে তিনি আবার গ্রেফতার হন।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও জেলগেট থেকে আবার গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। সেবার তাকে রাখা হয় সেনানিবাসে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ সকল আসামিকে মুক্তি দেয়া হয়। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন।

সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। শেষ দফায় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে থাকতে হয় ২৮৮ দিন।

Please Share This Post in Your Social Media

দেশের সংবাদ নিউজ পোটালের সেকেনটের ভিজিটর

38442308
Users Today : 519
Users Yesterday : 1265
Views Today : 6737
Who's Online : 41
© All rights reserved © 2011 deshersangbad.com/
Design And Developed By Freelancer Zone