Home / জাতীয় / যাদের চুলোয় আগুন জ্বলেনা,সেই সরকারদের খোঁজ রাখে না কেউ

যাদের চুলোয় আগুন জ্বলেনা,সেই সরকারদের খোঁজ রাখে না কেউ

গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি: নামই তাদের সরকার। সরকার হলে হবে কি, ঈদের দিনেও তাদের চুলোয় আগুন জ্বলেনি। এক ভাইকে দুপুরে খেতে দেয়া পতিবেশীর সেমাই, অপর ভাইকে রাতে খেতে দেয়া আর এক প্রতিবেশীর ভাত এনে ভাগ করে খাওয়ার মতো চির অটুট ভালবাসায় যেন জীবন-সংসারের আনাহার আর্ধাহারকেই নিত্য সঙ্গী করে বেঁচে আছেন সরকার নামে পরিচিত ২ ভাই। বাস্তভিটা না থাকায় গ্রামীণ পাকা সড়কের পাশে ছোট একটি ডেড়ায় সাইব উদ্দিন ওরফে বড় সরকার (৬৫) ও তার মেঝো ভাই নাইব উদ্দিন ওরফে মেঝো সরকার রাত অতিবাহিত করে। আর তাদের ছোট ভাই আলম মিয়া ওরফে ছোট সরকার খাদ্যাভাবে মারা যান। একই কারণ ছাড়াও চিকিৎসাহীনতায় বয়সের ভারে নূঁইয়ে পড়া সরকারদের মা জহিরন বেওয়া মারা গেছেন ৫ মাস আগে। তাদের দাফন হয়েছে প্রতিবেশী আব্দুল খালেক মন্ডল ও আলহাজ্ব কিশমত উল্ল্যাাহ্র পারিবারিক কবরস্থানে। নিজেদের ভিটা মাটি না থাকায় মৃত্যুর পূর্বে মা জহিরন ও পুত্র আলম মিয়া ঐ ২ ব্যক্তির নিকট নিজ নিজ কবরের জন্য জায়গা চেয়েছিলেন। দিনের পর দিন অনাহার-অর্ধাহারের ফলে মা ও ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর সরকার নামে পরিচিত নাইব উদ্দিন ও সাইব উদ্দিন নিজেদের কবরের জন্য মানুষের দ্বারসস্থ হয়েছেন। একরকম আশ্বাস ও পেয়েছেন তাঁরা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের পরাণ মৌজায় অবস্থিত গণশার হাটের পাশে সুন্দরগঞ্জ ডি ডবিøউ সরকারী কলেজ মোড়-গনশার হাট-শোভাগঞ্জ ভায়া মাঠেরহাট গ্রামীণ পাকা সড়কে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে একটি ছোট্ট কুটিরে বাস করতেন ৩ ছেলেসহ মা জহিরন বেওয়া। নাইব, সাইব ও আলমের পিতা বাতাসু শেখ মারা যাবার পর যাদের জায়গায় আশ্রিত ছিলেন তাদের পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারার কারণে জহিরন ও তার ৩ ছেলেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছেন। এসব জানিয়ে সাইব উদ্দিন ও নাইব উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ ৬ মাস ধরে তাদের চুলোয় আগুন জ্বলেনা। সাইব উদ্দিন বর্গা নেয়া একটি ছাগলকে সারাদিন ঘাস খাওয়ান। আর নাইব উদ্দিন আশপাশের হাট বাজারের কসাইখানা থেকে জবাইকৃত পশুর (গরুর) হাড়-হাড্ডি কুড়িয়ে এনে মাস অন্তর বিক্রি করেন। তাতে মাসিক আয় হয় প্রায় ৪শত টাকা। আর গনশার হাটের ৪টি দোকান পাহাড়া দিয়ে পান দৈনিক ২০ টাকা। দোকান পাহাড়ার ২০ টাকা দিয়ে ২ ভাই মিলে সকালে ও দুপুরে ২টি করে ৪টি পরটা খেয়ে থাকেন। এছাড়া বাজার করতে এসে যদি কেউ দয়া করে চিড়া বা মুড়ি কিনে দেন তাহলে রাতের খাওয়া হয় তাঁদের। অন্যথায় না খেয়েই রাত কাটাতে হয়। আর যদি ২ ভাইয়ের মধ্যে কেউ কোন ভাইকে বাড়ি ডেকে নিয়ে কিছু খেতে দেয় তা সেখোনে না খেয়ে আশ্রিত ঠিকানায় নিয়ে এসে ২ ভাই মিলে ভাগ করে খেয়ে থাকে তাঁরা। কেউ যদি দয়া করে কোন ভাইকে ১ কাপ চা খাওয়াতে চাইলে তা জিয়া রেখে অপর ভাইকে ডেকে এনে ভাগ করে খান (পান করেন)। সরকারদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে কেউই কোন কাজের জন্য তাদের ডাকে না। অলসতা নেই তাঁদের। কিন্তু কাজ নেই। নাইব ও সাইব উদ্দিন জানান, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি কেন যে কোন সময়ই তাদের ভাগ্যে ত্রাণ বা সাহায্য সহযোগিতা মেলে না। তাদের মা জহিরন বেওয়ার নামে একটি বয়স্ক ভাতা কার্ড ছিল। মা মারা যাবার পর শান্তিরাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সামিউল ইসলাম কার্ডটি নিয়ে গেছেন নাম বদলিয়ে সাইব উদ্দিনের নামে দেয়ার জন্য। এ ধরণের সহযোগিতা করার মত কেউ কোন দিন কোন প্রকার খোঁজ-খবর নেয়নি। তাঁদের আবাস কুটিরে কোন বিছানাপত্র, চৌকি বা খাট নেই। রাতে বাজারের ঐ ৪ দোকানের বারান্দায় থাকেন তারা। তবুও তাঁরা তাদের নিয়ে কোন দুঃখ প্রকাশ করেন না। কারও বিরুদ্ধে তাঁদের নেই কোন অভিযোগ। সদা-সর্বদাই হসোজ্জল মুখে কথা বলতে অভ্যস্থ। প্রতিবেশী আবু সোলায়মান, সোহরাব হোসেন, ইউনুস আলী, ওমর আলীসহ অনেকেই বলেন, খাওয়ার অভাবে অকালে আলম ও বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু হয়েছে। দুঃখ-দুর্দশার কথা বলে শেষ করা যাবে না। শান্তিরাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজিৎ কুমার প্রামানিক জানান, সাইব উদ্দিন ও নাইব উদ্দিনের নিজস্ব জায়গা-জমি না থাকায় রাস্তায় ঘর উঠানোর সময় আমরা টিন, বাঁশ ও মিস্ত্রী খরচ বহন করেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সামিউল ইসলাম বলেন,‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পের আওতায় ঐ পরিবারকে একটি ঘর দেয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। তাদের জায়গা-জমি না থাকায় শান্তিরাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদসহ অনেক প্রচেষ্টা চালিয়ে ৪ শতক জায়গা নির্ধারণ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁদেরকে এ ঘর দেয়া সম্ভব হয়নি। প্রতি বছর ঈদের আগে জহিরন বেওয়াকে ১টি শাড়ি ও ৫শত টাকা করে ব্যক্তিগতভাবে দান করেছি। মা জহিরনের বয়স্ক ভাতা কার্ডটির নাম পরিবর্তন করে বড় ছেলে সাইব উদ্দিনের নাম অন্তর্ভূক্ত করার প্রক্রিয়াধীন। তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জেনে খোঁজ-খবর রাখি। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ত্রাণ শাখা সূত্রে জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে ৩ শত ৫ মেট্রিকটন চাল ও ১৮ লক্ষ ৫ হাজার টাকাসহ শিশু খাদ্যের জন্য ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে। এছাড়া, করোনা ভাইরাস জনিত দূর্যোগে মানবিক সহযোগিতা কার্যক্রমে ১০ হাজার ৫শত জনের নামের তালিকায় সাইব উদ্দিন ও নাইব উদ্দিনের নাম অন্তর্ভ‚ক্ত হয়নি বলে জানা যায়।

নিউজটি লাইক দিন ও আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বড়াইগ্রামে ফেসবুকে স্টেটাস দিয়ে খৃস্টান নারীর আত্মহত্যা

নাটোর  প্রতিনিধি:                     নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাহিমালী গ্রামের জেনি বেবী কস্তা (৪০) নামে ...