Home / ঢাকার সংবাদ / রাজধানী ছাড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত রাজধানীজুড়ে শুধুই ‘টু-লেট’

রাজধানী ছাড়ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত রাজধানীজুড়ে শুধুই ‘টু-লেট’

ঢাকা : রাজধানীজুড়ে এখন শুধু ‘টু-লেট’-এর ছড়াছড়ি। কেন এমন, তা সবারই আঁচ করার কথা। সাড়ে চার মাস হলো করোনা হানা দিয়েছে দেশে। এর মধ্যেই কাজ হারিয়েছেন কিংবা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অগণিত মানুষ। আয় কমেছে বহু লোকের।

যার ফলে খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাসা ভাড়া পরিশোধ করা এদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে অনেকেই ছেড়ে গেছেন ঢাকা। কেউবা অপেক্ষাকৃত ছোট বাসায় উঠেছেন বড় বাসা ছেড়ে। আবার কেউবা শহরের উপকণ্ঠে কম টাকার ভাড়ার বাসায় আশ্রয় গড়েছেন। মার্চের শেষ দিকে সরকারি ছুটির পর, সেই যে ঢাকা থেকে গ্রামে গেছেন, এখনো ফেরেননি এমন সংখ্যাও আছে অনেক।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণসহ সব খাত স্থবির হয়ে পড়ায় গত কয়েক মাসে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ। কাজ হারিয়েছেন গৃহশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, হোটেলশ্রমিক থেকে শুরু করে সব খাতের শ্রমজীবীরা।

সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় কিছু নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যের সংস্থান হলেও দিতে পারছেন না ঘরভাড়া। ফলে গত কয়েক মাসে অসংখ্য পরিবার রাজধানী ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে গ্রামে। কয়েক মাসের ঘরভাড়া বকেয়া পড়ায় অনেকে মালপত্র রেখেই চলে গেছেন।

মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নি মধ্যবিত্তরা অর্থসঙ্কটে পড়েছেন। ভালো চাকরি করলেও কোনো কোনো অফিস বেতন কমিয়ে দিয়েছে কিংবা লোক কমানোর তালিকায় নাম উঠে যাওয়ায় এখন চোখে সরষে ফুল দেখছেন।

এমনই একজন আরিফুল হক। গুলশানে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। গত মাসে তার প্রতিষ্ঠান পাওনা চুকিয়ে দিয়ে ১৫ ভাগ জনবল কমিয়েছে। আরিফুল হক বলেন, ‘পরিবার নিয়ে এখন মহাসঙ্কটে পড়েছি। করোনার এই সময়ে চাকরি পাওয়া কঠিন। কী যে করব বুঝতে পারছি না।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে অর্থাভাবে মানুষ বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভাড়া কমিয়ে হলেও ভাড়াটিয়া রাখার চেষ্টা করছেন অনেক বাড়িওয়ালা। কিন্তু কাজ না থাকায় সেই সামর্থ্যও নেই অনেকের।

শাহজাদপুরে এশিয়ান হোমস সিটি ব্যাংকের ভবনে বাসা ভাড়ার জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন এক বাড়িওয়ালা। তিনি জানান, ভাড়াটিয়া মালামাল রেখেই বাড়ি চলে গেছেন। আর আসবেন না বলে জানিয়েছেন। এখন ৩০ হাজার টাকার বাসা ১৮ হাজার টাকায়ও কেউ নিচ্ছে না।

রাজধানীর ভাটারা থানাধীন ছোলমাইদ এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় তিন বেডরুমের ‘ব্যাচেলর’ ফ্ল্যাটে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে থাকছেন মাত্র একজন। দুই মাস আগেও তাকে ভাড়া দিতে হতো পাঁচ হাজার টাকা। তখন অন্য দুই কক্ষে আরো দু’জন ছিল। কাজ না থাকায় ভাড়া কমিয়েও অপর দু’জনকে রাখতে পারেননি বাড়িওয়ালা।

করোনা পরিস্থিতির আগে ফ্ল্যাটটি থেকে বাড়িওয়ালা পেতেন মাসে ১৫ হাজার টাকা। পুরো ফ্ল্যাটে একজন থাকলেও তাকে সেই ভাড়া পরিশোধ করতে হতো। ওই ভবনেরই তিনতলায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পুরো ফ্ল্যাট নিয়ে থাকছেন আরেকজন।

এ দিকে গত দুই মাসে এই এলাকা থেকেই শতাধিক পরিবার ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। অধিকাংশ বিল্ডিংয়ে ঝুলছে ‘টু-লেট’ লেখা সাইনবোর্ড। অনেকেই ভাড়া বকেয়া পড়ায় মালপত্র রেখে চলে গেছেন। ভাটারার ছোলমাইদ ও বসুমতি এলাকার টিনশেড ঘরগুলোতে বসবাস মূলত গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও নির্মাণশ্রমিকদের।

এর মধ্যে কিছু রিকশাচালক টিকে থাকলেও করোনার কারণে কাজ হারিয়েছেন অধিকাংশ গৃহকর্মী ও নির্মাণশ্রমিক। ওই এলাকার বাড়িওয়ালা হাজী বদরউদ্দিনের আটটি ভাড়াটিয়া পরিবার গত তিন মাসে ঘর ছেড়েছে।

বদরউদ্দিন জানান, বটগাইছ্যাবাড়ি এলাকায় তার টিনশেড ভাড়া ঘর থেকে করোনা পরিস্থিতির শুরুতেই তিনটি পরিবার ভাড়া না দিয়ে চলে গেছে। তাদের ঘরগুলোতে তেমন কোনো মালামালও ছিল না।

এ ছাড়া বালুর মাঠ এলাকায় তার টিনশেড ভাড়াঘর থেকে আরো চার ভাড়াটিয়া ঘরে তালা দিয়ে চলে গিয়েছিল। গত মাসে তাদের দু’জন এসে অনুনয়-বিনয় করায় ৩-৪ হাজার টাকা মওকুফ করে ছেড়ে দেন।

এ ছাড়া দুই মাস আগে তার আরেকটি ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নেন এক নারী। দু-একদিনের মধ্যে অগ্রিম টাকা দেবেন জানিয়ে ঘরে কিছু মালপত্র রেখে তালা দিয়ে চলে যান। এখন পর্যন্ত ফেরেননি। ফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

কুড়িলের কুড়াতলি এলাকায় একটি কক্ষ সাড়ে তিন হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে থাকতেন চারজন। একজন ফুটপাথে কাপড় বিক্রি করেন। দু’জন রাজমিস্ত্রির সহকারী (নির্মাণশ্রমিক)। মাসুম নামের অপরজন একটি সুপারশপের কর্মচারী। কাজ না থাকায় এপ্রিলের শুরুতে জামালপুরে গ্রামের বাড়ি চলে যান নির্মাণশ্রমিক দু’জন। তাদের দুই মাসের ভাড়া বকেয়া পড়ায় বাড়িওয়ালা অপর দু’জনকে চাপ দেন। ফোন করলে নির্মাণশ্রমিক দুজনই টাকা পাঠাতে অপারগতা জানান। সেই সাথে বাসা ছেড়ে দেয়ার কথা বলে দেন। বাধ্য হয়ে অপর দু’জন কিছু টাকা জোগাড় করে বাড়িওয়ালাকে শান্ত করেন।

গত মে মাসের মাঝামাঝি আকস্মিক সুপারশপের চাকরিটি হারান মাসুম। এরপর থেকে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কাজের আশায়। আজ পর্যন্ত কোনো কাজ মেলেনি। মাসুম বলেন, এখন যে ঘরভাড়া পরিশোধ করে বাড়ি চলে যাবো সেই টাকাই নেই। কী খাব, কী করব?

এ দিকে পশ্চিম রাজাবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় অধিকাংশ ছাত্র মেসগুলোয় ‘সিট/রুম ভাড়া হবে’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। বাড়িগুলোর কেয়ারটেকারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্কুল-কলেজ বন্ধের পরই শিক্ষার্থীরা চলে গেছেন। দেড়-দুই মাস পরে অনেকে ফোন করে বাসা ছেড়ে দেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বকেয়া ভাড়াও পাঠাচ্ছেন না। অনেক মেস পুরোপুরি খালি হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক ভবনের কেয়ারটেকারের বেতনও আটকে আছে। এমনকি চাকরি না থাকার শঙ্কাও কাজ করছে তাদের মধ্যে।

এ দিকে সন্তানের স্কুলসহ নানা বিষয়ে রাজধানীর সাথে জড়িয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণী শেষ সম্বল খরচ করে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন। অনেকেই ভাড়া কমাতে ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে উঠছেন শহর থেকে দূরে টিনশেড ঘরে। বড় ফ্ল্যাট ছেড়ে উঠছেন ছোট ফ্ল্যাটে। করোনা সঙ্কটের কালো মেঘ কবে কাটবে, সেই আশায় এখন দিন গুনছেন তারা।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অনেকেরই আয় কমেছে। এই অবস্থায় বাসা ভাড়া পরিশোধ করা অনেকেরই জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছি নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা হলেও বাড়ি ভাড়া মওকুফ করার জন্য, কিন্তু আমাদের কথা কেউ শুনছেন না। অনেক মানুষ বেকার এবং আয় কমে যাওয়ার কারণে তাদের পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর আয়ের আশায় তিনি নিজে কোনো একটি মেসে বা কম টাকা ভাড়ার বাসায় উঠেছেন।

তিনি আরও বলেন, আসলে সত্যি কথা বলতে মানুষকে খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে কারণে অনেকেই বাসা ছেড়ে দিয়েছে-দিচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতিতেও অনেক বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে ভাড়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। যে কারণে অনেকেই বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ভাড়াটিয়াদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে বাড়ির মালিকদের উচিত কিছুটা ছাড় দেয়া, কিছুটা ভাড়া মওকুফ করা।

এদিকে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ এই সময়ে নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ।

অন্য এক জরিপে দেখা যায়, ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় ৫০ শতাংশ, ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাসার ভাড়ায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর বাড়ি ভাড়া যে বেপরোয়াভাবে বেড়েছে, তাতে আয়-ব্যয়ে প্রকট অসামঞ্জস্যতা নিয়ে থাকতে হয়েছে লোকজনকে। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ায় নিরুপায় হয়ে মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন, তাতে তৈরি হচ্ছে ভাড়াটিয়া সংকট। এই সংকট সামনের দিনগুলোতে আরও প্রকট হতে পারে।

নিউজটি লাইক দিন ও আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ঘটনাস্থলে আসেনি উদ্ধারকারী জাহাজ, আটকে গেছে পোস্তগোলা ব্রিজে

রাজধানীর শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৯টায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ...