শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
দেশের প্রথম ‘ছেলে সতীন’ হিসেবে গিনিস বুকে নাম লেখাতে চান নাসির হোসাইন! এবার প্রবাসীদের ব্যাগেজ রুলে আসছে পরিবর্তন, শুল্কছাড়ে যত ভরি স্বর্ণ আনতে পারবে প্রবাসীরা যে চার ধরনের শা’রীরিক মিলন ইসলামে নি’ষিদ্ধ !!বিজ্ঞানী বু-আলী ইবনে সীনা নারীদের যে ৮টি কথা বললে তারা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে… নওগাঁর মহাদেবপুরে বিএনপি’র উদ্যোগে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বিভাগীয় সমাবেশ সফল করার লক্ষে প্রস্তুতি সভা মাদ্রাসার এক ছাত্রকে (১২) বলৎকার মাওলানা আটক নরপশুটা আমাকে কোলে তুলে মোনাজাত করতো! গাইবান্ধায় মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার গাইবান্ধায় অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১০ হানিফ বাংলাদেশীর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি গাইবান্ধায় জনসভায় পরিনত হয়েছে দিনাজপুর বিরামপুরে ‘বিট পুলিশিং সমাবেশ নবনির্বাচিত উলিপুর পৌর মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ  ভাষা দিবস উপলক্ষে নারী অধিকার আন্দোলনের আলোচনা সভা স্থগিত পরীক্ষা চালুর দাবি রাবি শিক্ষার্থীদের ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটাম তানোরে বিএনপির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকা ও অবদান।

১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ১৫০ নম্বর মােঘলটুলিতে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে সেটা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না প্রশ্নে দীর্ঘ বিতর্ক চলে ।
উল্লেখযােগ্যদের মধ্যে অলি আহাদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, যে সরকার গণআন্দোলনকে বানচাল করার জন্য অন্যায়ভাবে আইন প্রয়ােগ করে সে সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করে মেনে নেয়ার অর্থ স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মওলানা ভাসানীর এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘােষিত হয়।পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।
তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ সে পরিস্থিতিতে ঢাকার ৯৪ নবাবপুরে অবস্থিত আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের জরুরি সভা। এতে দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে বেশি ভোট পড়লেও পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছিল। সে মিছিলের ওপরই গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আগের কর্মসূচি অনুযায়ী মওলানা ভাসানী এ সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রদেশের বিভিন্নস্থানে আন্দোলন গড়ে
তােলার জন্য সাংগঠনিক সফরে ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার খবর জেনেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশ নেন। মােহাম্মদ সুলতানের মতে তিনিই জানাজার নামাজে ইমামতি করেছিলেন। অন্যদিকে গাজীউল হক বলেছেন, তিনি মােনাজাত পরিচালনা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের প্রধান সমর্থক সাপ্তাহিক সৈনিক লিখেছে, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (অর্থাৎ মওলানা ভাসানী) লক্ষ লােকের একটি গায়েবানা জানাজায় নেতৃত্ব করেন। (বশীর আল হেলাল, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, পৃ- ৩৭৪-৩৭৭) ২২ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন,ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নাই। কোন সভ্য সরকার এরূপ বর্বরােচিত কান্ড করিতে পারে দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না।আমি মোেমনশাহী, পাবনা, কুমিলা সফর করিয়া গতরাত্রে ঢাকায় ফিরিয়া যাহা দেখিলাম তাতে আমার কলিজা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। নূরুল আমীন সরকার অবশেষে জাতির ভবিষ্যৎ ছাত্রসমাজকে দমাইবার জন্য চরম পন্থা অবলম্বনে মাতিয়াছে।
আমি দাবী করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হউক, পুলিশী গুলীর তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জন
প্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হউক।আমি অপরাধীদের প্রকাশ্য বিচার দাবী করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরােয়ানা জারী করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হউক। সর্বোপরি শহীদদের
পরিবারপরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হউক।…’ (সাপ্তাহিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)
ভাষা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকার অসংখ্য ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করেছিল। মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে জারি করেছিল গ্রেফতারি পরােয়ানা। মওলানা ভাসানী
আদালতে হাজির হয়ে গ্রেফতার বরণ করেছিলেন ১০ এপ্রিল (১৯৫২)। কারাগারেও তার সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রভাষা ও স্বায়ত্তশাসনসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং আন্দোলনকালে গ্রেফতার করা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি
আদায়ের জন্য মওলানা ভাসানী এ সময় নতুন ধরনের অনশন শুরু করেন।সারাদিন তিনি রােজা রাখতেন অর্থাৎ পানাহার করতেন না। অনশন ভাঙতেন সন্ধ্যার পর। তার অনুপ্রেরণায় অন্য বন্দিদের অনেকেও একইভাবে অনশন শুরু করেন। রাজবন্দি অলি আহাদ ও ধনঞ্জয় দাশ লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর পরামর্শে তারা ৩৫ দিন রােজা রেখেছিলেন এবং এর ফলে কারাগারের ভেতরে-বন্দিদের মুক্তির জন্য আন্দোলন জোরদার হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে অনেকে মুক্তিও পেয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল। রােজা রাখার ধারাবাহিকতায় ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি আমরণ অনশন শুরু
করেছিলেন। এতে তার শরীর খারাপ হতে থাকে, সে খবর প্রকাশিত হলে জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের চাপে সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মওলানা ভাসানী একদিনের অনশন করেছিলেন।
এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। সেকালের আরাে অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন সত্য কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যেমন ভাষা
আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক জানিয়েছেন, মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ জন নেতা এই আন্দোলনের সপক্ষে ছিলেন তাদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।
(ধানসিঁড়ি সংকলন, চতুর্থ প্রকাশনা, ১৯৮০, পৃ- ৫৮) এখানে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীর ভূমিকা সম্পর্কেও জানানাে দরকার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার পর সমগ্র প্রদেশে যখন সরকারের বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন যখন আরাে দুর্বার হচ্ছিল তেমন এক
পরিস্থিতির মধ্যেও ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দরাবাদ থেকে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, ‘… ঘটনা বর্তমানে ঘটিলেও
বহু পূর্বেই পূর্ব বংগে ভাষা সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিয়াছে । আমি সেই সময় একটি জনসভায়ও এক বিবৃতিতে বলিয়াছিলাম, যে-আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত
হইয়াছে তদনুসারে উর্দুই হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ।… বাংলার বুকে অবশ্য উর্দুকে জোর করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইবে না, তবে বিদ্যালয়ে আবশ্যিক দ্বিতীয় ভাষারূপে ইহা পড়ান হইবে এবং যথাসময়ে এই প্রদেশবাসীগণ এই ভাষার সহিত পরিচিত হইয়া উঠিলে প্রদেশের শিক্ষিত সমাজ ও সরকারী কর্মচারীগণ আপনা হইতেই ইহা পড়িতে ও লিখিতে শুরু করিবে। তখন উর্দু তাহাদের নিকট গৌরবজনক মর্যাদাই লাভ করিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানীরাও দুই ভাষাভাষী
হইবে ।…’ (দৈনিক আজাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)
উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীর এই বক্তব্যের কঠোর বিরােধিতা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এক বিবৃতিতে বলেছিলেন,সংবাদপত্রে জনাব সােহরাওয়ার্দীর এক বিবৃতি দেখিয়া আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হইলাম। উহাতে তিনি পরােক্ষভাবে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের
জন্য ওকালতী করিয়াছেন।… উহাতে তাহার ব্যক্তিগত অভিমতই প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া বুঝিতে হইবে এবং আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘােষণা করিতেছি যে,পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মােছলেম লীগ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম
রাষ্ট্রভাষারূপে গৃহিত না হওয়া পর্যন্ত এবং সরকার কর্তৃক কার্যকরী না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাইবে। আওয়ামী লীগের ঘােষণাপত্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার দাবী করা হইয়াছে এবং এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার
পর হইতেই আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করিবার জন্য আন্দোলন করিয়া আসিতেছি।’ (দৈনিক আজাদ, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)দলের পাশাপাশি মওলানা ভাসানী নিজেও প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেই ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি
হিসেবে তার অব্যাহত দাবি ও চাপের কারণেই ১৯৫৬ সালে রচিত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মোঃআজিজুল হুদা চৌধুরী সুমন
নির্বাহী সদস্য,জাতীয় পার্টি
কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টি
সভাপতি,জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ

Please Share This Post in Your Social Media

দেশের সংবাদ নিউজ পোটালের সেকেনটের ভিজিটর

38324084
Users Today : 681
Users Yesterday : 3953
Views Today : 1615
Who's Online : 17
© All rights reserved © 2011 deshersangbad.com/