Breaking News
Home / বরিশালের সংবাদ / বরিশাল আওয়ামী লীগে প্রশ্নবিদ্ধ অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা *ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

বরিশাল আওয়ামী লীগে প্রশ্নবিদ্ধ অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা *ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

ছাত্রলীগ নেতার প্রধান হত্যাকারী এখন আওয়ামী লীগ নেতা

মনির হোসেন,বরিশাল ব্যুরো\ শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে সারাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রণয়ন করছে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এরইমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বরিশাল বিভাগে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা। ওই তালিকায় উঠে এসেছে মাত্র ৪৩৩ জনের নাম, ঠিকানা ও পূর্বে অন্যদলের পদ-পদবি। এদের মধ্যে ছয়জন এসেছে জামায়াতে থেকে।
তবে বরিশাল মহানগরসহ দক্ষিণাঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশিত ওই তালিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হয়েছেন অনেকটা বিস্মিত। কারণ তালিকায় মহানগর আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা মাত্র ছয়জন। তাছাড়া দুটি উপজেলা রয়েছে যেখানে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মাত্র দুইজনের নাম রয়েছে। তার মধ্যে একজন অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আবার তালিকায় স্থান পায়নি বরিশাল জেলার সদর উপজেলাসহ পাঁচটি উপজেলার অনুপ্রবেশকারীদের নাম।
এমনকি ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের বহুল আলোচিত সরকারী গৌরনদী কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক সফিকুল ইসলাম বুলেটকে প্রকাশ্যে ইট দিয়ে পিটিয়ে ও পানিতে চুবিয়ে নির্মম হত্যার ঘটনার মূলহোতা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে খোলস পাল্টিয়ে বিএনপি থেকে যোগদান করে এখন আওয়ামী লীগ নেতা হয়েছেন। তার নামও আসেনি অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায়। অথচ নির্বাচনের পূর্বে জামায়াত, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে শুধু গৌরনদী উপজেলায় কয়েক হাজার নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। সেখানে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় নাম এসেছে শুধু মৃত্যু এক ব্যক্তির নাম। এছাড়াও উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির পদ-পদবীতে থাকা সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদান করা অনুপ্রবেশকারীদের নামও তালিকায় আসেনি। ফলে প্রকাশিত ওই তালিকা নিয়ে দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা সঠিকভাবে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করার জন্য দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে জোরদাবী করেছেন।
খোঁজনিয়ে জানা গেছে, উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা কতিপয় নেতার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীরা আসন্ন সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণরায় পদ-পদবী পেতে অত্যন্ত সু-কৌশলে লবিং ও তদ্বির অব্যাহত রেখেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এসব অনুপ্রবেশকারীদের কারণে এখনও কোনঠাসা হয়ে রয়েছেন দলের দুর্দীনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা। এখনই ওইসব অনুপ্রবেশকারীদের রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে তারাই (অনুপ্রবেশকারী) দলের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাঁড়াবে। সূত্রে আরও জানা গেছে, অধিকাংশ অনুপ্রবেশকারীরা দিনের আলোয় নিজেদের আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিলেও রাতের অন্ধকারে তারা পূর্বের (বিএনপি-জামায়াত) কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা বলেন, আমরা অনুপ্রবেশকারীদের তালিকার দায় নিবোনা। কারোর নাম তালিকা থেকে বাদ পরলে তার দায়ভার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাকে নিতে হবে।
প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় অনুপ্রবেশকারীর শীর্ষে রয়েছে বরিশাল ও ভোলা জেলা। এরমধ্যে বরিশালের পাঁচটি উপজেলা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা মাত্র ২৩১ জন এবং ভোলায় ১৩৬ জন। এর বাইরে পটুয়াখালীতে ২৫ জন, ঝালকাঠিতে ১৫ জন, পিরোজপুরে ১০জন, বরগুনায় ১০ জন ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী মাত্র ছয়জন। ওই তালিকায় ঝালকাঠির নলছিটিতে দুইজন, পিরোজপুর ও মঠবাড়িয়ায় দুইজন, ভোলায় একজন বরগুনার তলতলীতে একজন জামায়াত নেতা রয়েছেন।
অপরদিকে বরিশাল জেলার যে তালিকাটি ঘোষণা করা হয়েছে তাতে মাত্র পাঁচটি উপজেলার নাম রয়েছে। জেলায় আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী তালিকার মধ্যে ২২৫ জনই মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার। অপর চারটি উপজেলার মধ্যে হিজলা উপজেলায় ২১ জন, উজিরপুরে সাতজন। গৌরনদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলায় মাত্র একজন করে নাম এসেছে। তারা হলেন-বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল হোসেন বাবুল এবং গৌরনদীর মাহিলাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ লোকমান হোসেন খান বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি (লোকমান খান) অনেকদিন পূর্বে মারা গেছেন। এদিকে ঘোষিত তালিকায় নেই বরিশাল সদর উপজেলা, আগৈলঝাড়া, বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলার নাম।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে প্রতিটি উপজেলায় কয়েক হাজার নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে। এরমধ্যে পেট্রোল বোমা হামলার আসামিও রয়েছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বে থাকা কতিপয় নেতা ওইসব অনুপ্রবেশকারীদের মাধ্যমে দলের দুর্দীনের নেতাকর্মীদের কোনঠাসা করে রেখেছেন। এখনই ওইসব অনুপ্রবেশকারী ও দলের সুদিনের কতিপয় সুবিধাভোগী নেতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দলের ওপর পরবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলেন, আসন্ন উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আমরা নতুন নেতৃত্ব চাই। কারণ হিসেবে তারা বলেন, দীর্ঘদিন পদ পজিশনে থাকায় দলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের অবমুল্যায়ন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দলের তৃণমূলপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনকে সামনে রেখে নদী বেষ্টিত মুলাদী উপজেলা সরগরম হয়ে উঠেছে। এখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল বারীসহ সভাপতি হিসেবে প্রার্থী হবেন-মুলাদী পৌরসভার দুইবারের ও বর্তমান জনপ্রিয় মেয়র শফিকুজ্জামান রুবেল এবং বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান তারিকুল হাসান মিঠু খান। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনার অগ্রভাগে রয়েছেন মুলাদী প্রেসক্লাবের সভাপতি আলমগীর হোসেন সুমন রাড়ী, কাজী মঈনুল আহসান সবুজ ও সালেহ হাওলাদার।
মুলাদীর তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলেন, বর্তমান কমিটির কতিপয় সিনিয়র নেতার নিকট আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুড়, ভায়রা বিরোধী পক্ষের প্রভাবশালী নেতা। তাদের হাত ধরেই বির্তকিত অসংখ্য লোক আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। তারাই দলের প্রকৃত নেতাকর্মীদের কোনঠাসা করে রেখেছেন। তাই আসন্ন সম্মেলনে আমার নতুন নেতৃত্ব পেতে দলের হাইকমান্ডের কাছে জোর দাবি করছি।
বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগে অনেক নেতাই রয়েছেন যারা ইতিপূর্বে বিএনপির দায়িত্বশীল পদে ছিলেন বা তাদের স্বজনরা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এখনও রাজনীতি করছেন। অথচ বরিশাল মহানগরীতে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী এসব নেতার নাম নেই। ফলে চলমান শুদ্ধি অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, আমরা আগে থেকেই অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক রয়েছি। মহানগরীর ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগের চলমান সম্মেলনে অনুপ্রবেশকারী, মাদকাসক্ত, মামলার আসামিসহ কোন বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হচ্ছেনা। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্র থেকে অনুপ্রবেশকারীদের যে তালিকা প্রকাশ পেয়েছে তা এখনও আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। তাছাড়া তালিকা প্রনয়ণের বিষয়ে আমাদের কোন হাতও নেই। বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কেন্দ্র থেকেই এ তালিকা করা হয়েছে।

Please follow and like us:
error

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মৃত্যুর পর দাফন করার স্থানও রইলোনা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার

মনির হোসেন, বরিশাল ব্যুরো \ মৃত্যুর পর দাফন করার স্থানও রইলোনা রণাঙ্গন ...