Breaking News
Home / ছবি ঘর / উপকুলীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিল দি সল্ট সলিউশন প্রকল্প

উপকুলীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিল দি সল্ট সলিউশন প্রকল্প

মনির হোসেন,বরিশাল :উপকূলীয় জনজীবন সর্বদাই সংগ্রামে পরিপূর্ণ। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-ঘূর্ণিঝড়,জলোচ্ছ্বাস,বন্যা ইত্যাদি উপকূলের মানুষের নিত্যদিনের সাথী। সমুদ্র উপকূলে কৃষি কাজে রয়েছে নানাবিধ বাঁধা যার মধ্যে লবণাক্ততা অন্যতম। শুকনো মৌসুম নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা দেখা দেয়। এ সময়ে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানিও থাকে না, নদী এবং যে সমস্ত খালে পানি থাকে তাও লবণাক্ত হয়ে যায়। পুকুর এবং বিল শুকিয়ে যায় খুব দ্রুত যেগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে থাকত। এমনকি নলকূপের পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে যায়, ফলে মিষ্টি পানি পাওয়া খুব দুষ্কর হয়ে যায়। আর এর ফলশ্রুতিতে কৃষি কাজ তথা সব্জি চাষ হয়ে যায় প্রায় অসম্ভব,ফলে এ অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী থাকে পুরো শুকনো মৌসুম জুড়ে। বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের মোট ১৪ টি জেলা উপকূলের আওতায়। মোট কৃষি জমির ৩০ ভাগ জমি রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলে যার প্রায় অর্ধেকই (৫৩%) লবণাক্ততায় আক্রান্ত এবং লবণাক্ততা প্রতিবছরে বেড়েই চলেছে। ফলে বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের কৃষক তাদের জমি অনাবাদী রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে জাতীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন এবং আয় কমে যাওয়ার কারনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি হীনতায় ভুগছে প্রতিটি কৃষক পরবিবার ।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এ সমস্যা সমাধান করে কৃষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইকো কোঅপারেশন দি সল্ট সলিউশন নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের লবণ সহিষ্ণু ফসলের সাথে পরিচয় ঘটানো, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং গুণগতমান সম্পন্ন ফসল উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা যার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মান উন্নত হবে। প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের খুলনা বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা এই চারটি জেলার ৮টি উপজেলার ৫হাজার চাষী পরিবার নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কোডেক এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে নেদারল্যান্ড ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সল্ট ফার্ম টেক্সেল। প্রকল্পটি গত তিন বছর ধরে এই অঞ্চলে শুকনো অর্থাৎ শীত মৌসুমে লবণাক্ত জমিতে গাজর, রেডবিট (বিটকপি), আলু, ফুলকপি,ওলকপি এবং বাঁধাকপি উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তিসমূহের প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করছে। মোট ২শ প্রদর্শনী প্লট এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা শিখেছে লবণ সহিষ্ণু কৃষির প্রযুক্তিসমূহ, জানতে পেরেছে বিভিন্ন ফসলের লবণ সহ্য ক্ষমতার মাত্রা। প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদেরকে মাঝে বিতরণকৃত নতুন জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বাঁধাকপির রাইমা জাতটি যা ৮ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে, আকারে বড় এবং অত্যন্ত সুস্বাদু হয় । ফুলকপির স্কাইওয়াকার জাতটি যা ১২ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে ফুল বড় ও উজ্জ্বল হয় এবং স্বাদ অনেক ভাল। ওলকপির লেক এবং করিস্ট জাত দুটো যা ৯ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে আকারে অনেক বড় হয় কিন্তু শক্ত অর্থাৎ আঁশ হয় না, তুলনামূলক বেশি নরম এবং স্বাদ অত্যন্ত ভালো, ইচ্ছে করলে কাঁচাই চিবিয়ে খাওয়া যায়। আলুর মেট্রো জাতটি যা ১০ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে আকারে বড় ও অত্যন্ত সুস্বাদু হয় এবং ফলন স্থানীয়ভাবে চাষকৃত ডায়মন্ড এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুন।এছাড়াও এ প্রকল্প থেকে চাষীদের মাঝে রেড বিট নামে এক নতুন ফসলের বোরো নামক জাতটির উৎপাদন ও সম্প্রসারণের কাজ করছে যা উচ্চ মাত্রার লবণ সহিষ্ণু (প্রায় ২১ ডিএস/মি ) যার পাতা এবং মূল (টিউবার) দুটোই খাওয়া যায়। এটি অনেক উন্নত পুষ্টিগুন স¤পন্ন ফসল। এটি কাঁচা অবস্থায় সালাদ হিসেবে অথবা রান্না করেও খাওয়া যায়।
উল্লেখ্য উক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে উল্লেখিত জেলাসমূহের মোট ৮ টি উপজেলার প্রায় ১শ একর অনাবাদী জমিতে উপরোক্ত সবজি ফসলের লবণ সহিষ্ণু জাতসমূহের আবাদ করা হয়েছে,যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ণ সৃষ্টি করছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৩০ জন প্রশিক্ষিত নার্সারার (সবজি বীজ উৎপাদনকারী) এর মাধ্যমে গুনগত মানসম্পন্ন সবজি চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যাতে অন্যান্য কৃষক এ সকল উন্নত মানের সবজি ফসলের চারা সহজেই পেতে পারে,এছাড়াও দেশের স্বনামধন্য বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লালতীর সিড কোম্পানীর মাধ্যমেও এসকল বিদেশী জাতসমূহের সহজ প্রাপ্যতার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের সহায়তায় বাগেরহাটের রামপালে তৈরি করা হয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র যেখান থেকে খুব সহজেই যে কোনো জাতের লবণ সহিষ্ণুতার মাত্রা নিরুপন করা যাবে।এ সকল প্রদর্শনী প্লটে পর্যাপ্ত জৈব সার প্রয়োগ করে বেড নালা পদ্ধতিতে জমি তৈরি করা হয়। এরপর এতে নেদারল্যান্ডস থেকে আনা লবণ সহিষ্ণু জাতের বীজ/চারা রোপন করা হয়, সাথে থাকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে মালচিং এর প্রয়োগ। প্রকল্পের কর্মীরা নিয়মিত জমির লবণের মাত্রা, পিএইচ এবং ময়েশ্চার কন্টেন্ট পরিক্ষা করেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে লবণাক্ততার ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব হয়। প্রকল্প থকে বিতরণকৃত লবন সহিষ্ণু জাতের বীজ, উপযুক্ত মাটি ব্যাবস্থাপনা, উপযুক্ত সেচ এবং সার প্রয়োগ লবন সমস্যা সমাধানে অত্র অঞ্চলের কৃষকদের সফলতা এনে দিয়েছে।
বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মতিয়ুর রহমান বলেন- “উপকূলীয় অঞ্চলে শুকনো মৌসুমে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদী থাকে লবনাক্ততার কারনে। ফলে এই সময়ে কৃষকরা অবর্নণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইকো কো অপারেশনের অর্থায়নে কোডেক কর্তৃক বাস্তবায়িত দি সল্ট সলিউশন প্রকল্পটি কৃষকদের এই সমস্যা সমাধানে সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে গত ৩ বছর ধরে। এ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী এবং আরো বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অত্র এলাকার চাষীরা লবণ সহিষ্ণু কৃষিতে দক্ষ হচ্ছে। তারা এখন খুব সহজেই তাদের জমির লবণের মাত্রা নির্ণয় করতে পারে এবং সে অনুযায়ী ফসল ও জাত নির্বাচন করে চাষাবাদ করতে পারছে। প্রকল্পের প্রযুক্তিসমূহ সমগ্র উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ করা গেলে তা লবণাক্ততার সমস্যা সমাধান করে বিপুল পরিমান অনাবাদি জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে সক্ষম হবে। ফলে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন সহজ হবে”।

Please follow and like us:
error

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আজ পিলখানা হত্যা দিবস

আবার ফিরে এলো শোকাবহ সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি। পূর্ণ হলো পিলখানা বিদ্রোহ আর ...