Breaking News
Home / মতামত / আলেম ওলামাদের ঐক্যের বিপর্যয়: কারণ ও সমাধান

আলেম ওলামাদের ঐক্যের বিপর্যয়: কারণ ও সমাধান

               মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন
আলেম-ওলামাদের ঐক্যের বিকল্প নেই, ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। আলেম-ওলামারা ঐক্যবদ্ধ হলে মুসলিম সমাজও এক হয়ে যাবে, সমাজে শান্তি আসবে। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু (দ্বীন ইসলাম)কে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভেদ করো না। স্মরণ কর যখন তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে তখন আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের অন্তরসমূহ একে অপরের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছ। তোমরাতো ছিলে অগ্নিকুন্ডের প্রান্তে। আল্লাহ সেখান থেকে তোমাদের মুক্ত করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর বিধানসমূহ  সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা হেদায়তপ্রাপ্ত হও। (সূরা আলে ইমরান- ১০৩)
আলেম ওলামাদের ঐক্য বিপর্যয়ে প্রধান কারণ হচ্ছে একে অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ। তারা একে অন্যের জনপ্রিয়তাকে মানতে নারাজ। নিজেদের বিবাদ, বিশৃঙ্খলা, পরস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সামান্য স্বার্থের কারণে তারা বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, প্রত্যেকেই এক একজন নেতা হয়ে এবং নামে-বেনামে অসংখ্য দল ও উপদল গড়ে তুলে। আলেম ওলামাদের অবস্থা এতই করুণ যে, শুধুমাত্র পার্থিব স্বার্থের উপর ভিত্তি করেই তাদের মধ্যে গড়ে উঠে অসংখ্য দল ও উপদল। আবার তারাও হীন স্বার্থ, পদ-পদবী ও পার্থিব বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। আর অল্প সময়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাদের দল ও ঐক্য। ফলে তাদের অনৈক্য, দলাদলি, গ্রুপিং ইসলাম বিরোধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
কুরআনুল কারীমে এসেছে,  ‘নিশ্চিত এই তোমাদের উম্মাহ, এক উম্মাহ (তাওহীদের উম্মাহ) এবং আমি তোমাদের রব। সুতরাং আমাকে ভয় কর। এরপর তারা নিজেদের দ্বীনের মাঝে বিভেদ করে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেল। প্রত্যেক দল (নিজেদের খেয়ালখুশি মতো) যে পথ গ্রহণ করল তাতেই মত্ত রইলো। সুতরাং (হে পয়গাম্বর!) তাদেরকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত মূর্খতায় ডুবে থাকতে দিন।-(সূরা মুমিনুন  : ৫২-৫৩)
কুরআনুল কারীমে আরো এসেছে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। পরস্পর বিবাদ করো না তাহলে দুর্বল হয়ে পড়বে এবংতোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য্য ধারণ কর। নিশ্চিত জেনো রেখো, আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা আনফাল  ৪৬)।
আলেম ওলামাদের  আরেকটি বড় সমস্যা হল, তারা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। টাওা-পয়সা, পদমর্যাদা ও ক্ষমতার লোভ। তারা সামান্য অর্থের জন্য ও হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করতে জাতীয় স্বার্থ ও ঐতিহ্যকে বিকিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। এক সময় আলেম ওলামাদের অবস্থা এমন ছিল, সারা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দিয়েও তাদের ঈমানকে খরিদ করা যেত না, আর বর্তমানে তাদের ঈমান ঐতিহ্য এতই সস্তা, অতি সামান্য টাকা পয়সা, নগণ্য  কোন রকম একটি পদ বা খেতাব-উপাধি ও নামে মাত্র কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা দেয়ার বিনিময়ে তাদের ঈমান খরিদ করা যায়।
আলেম ওলামাদের মধ্যে মুনাফেকদের একটি বড় অংশ সব সময় বর্তমান থাকে, তারা নিজেদের আলেম  নামে প্রকাশ করে কিন্তু কাজ করে ইসলামের বিরুদ্ধে। এদের কারণেই যুগে যুগে ইসলাম ও আলেম সমাজে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। এ সব সুযোগ সন্ধানী, নামধারী ও তথাকথিত আলেমরা সব সময়  আলেম ওলামাদের ক্ষতি করা ও তাদের মধ্যে বিবাধ, বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখতে আমরণ চেষ্টা চালায়।
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, সৎকাজের আদেশ করবে  এবং মন্দ কাজে বাধা দিবে। আর এরাই তো সফলকাম।
‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং মতভেদ করেছিল তাদের নিকট সুস্পষ্ট বিধানসমূহ পৌঁছার পর। এদের জন্যই রয়েছে ভীষণ শাস্তি”।  (সূরা আলে ইমরান- ১০৪ – ১০৫)
 একজন আলেম যদি সত্য কথা, কুরআন হাদীসের কথা বলেন, তাহলে সেটি সবার মেনে নিতে হবে। তবে ঐক্যের ক্ষেত্রে অবশ্যই অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা এবং অন্যের কথা শোনার মতো মানসিকতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখতে হবে। তাহলেই হতে পারে আলেম সমাজের ঐক্য।
 কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে,‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে উপহাস না করে। সে (অর্থাৎ যাকে উপহাস করা হচ্ছে) তার চেয়ে উত্তম হতে পারে। এবং কোনো নারীও যেন অপর নারীকে উপহাস না করে। সে (অর্থাৎ যে নারীকে উপহাস করা হচ্ছে) তার চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যকে দোষারোপ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। ঈমানের পর ফিসকের নাম যুক্ত হওয়া কতমন্দ! যারা এসব থেকে বিরত হবে না তারাই জালেম।
‘হে মুমিনগণ! অনেক রকম অনুমান থেকে বেঁচে থাক। কোনো কোনো অনুমান গুনাহ। তোমরা কারো গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করবে না এবং একে অন্যের গীবত করবে না। তোমাদের কেউ কি তার মৃতভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? এটা তো তোমরা ঘৃণা করে থাক। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তিনি বড় তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সূরা হুজুরাত ১১-১২)
হাদীস শরীফে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন‘তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কারণ ধারণা হচ্ছে নিকৃষ্টতম মিথ্যা। তোমরা আঁড়ি পেতো না, গোপন দোষ অন্বেষণ করো না, স্বার্থের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ো না, হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্কচ্ছেদ করো না, পরস্পর কথাবার্তা বন্ধ করো না, একে অপর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিও না, দাম-দস্ত্তরে প্রতারণা করো না এবং নিজের ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের মাঝে ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করো না। হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ যেমন আদেশ করেছেন, সবাই তোমরা আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।’-(সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৬৩/২৮, ২৯, ৩০ ও ২৫৬৪/৩২, ৩৩)
হাদীস শরীফে আরো এসেছে, আবু বারযা আল আসলামী রা. থেকে বর্ণিত,  রাসূল (সা) বলেছেন, ‘ওহে যারা মুখে মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু ঈমান তাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি তারা শোন, মুসলমানের গীবত করো না এবং তাদের দোষত্রুটি অন্বেষণ করো না। কারণ যে তাদের দোষ খুঁজবে স্বয়ং আল্লাহ তার দোষ খুঁজবেন। আর আল্লাহ যার দোষ খুঁজবেন তাকে তার নিজের ঘরে লাঞ্ছিত করবেন।'(মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৯৭৭৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪৮৮০)।
রাসূল (সা) অন্য এক হাদীসে  ইরশাদ করেছেন-
মুসলিম সে, যার মুখ ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে।-(সহীহ বুখারী, হাদীস : ১০)
আলেম ওলামা ও পীর মাশায়েখরা রাষ্ট্রের সব স্তরেই দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ থাকবেন জিহাদের ময়দানে, কেউ দাওয়াতের ময়দানে। আলেম ওলামাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য প্রতিষ্ঠা, নিজ আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করে শান্তির সমাজ কায়েমের লক্ষ্যেই দ্বীনি সমাবেশের আয়োজন করা এবং তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া।তাহলেই হতে পারে আলেম ওলামাদের ঐক্য।
লেখক: কলামিস্ট।
Please follow and like us:
error

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিদেশি চ্যানেলের নেতিবাচক প্রভাব

বর্তমান সময়ে ক্যান্সারের মতো কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে চিহ্নিত কয়েকটি বিদেশি চ্যানেল। এসব ...