Breaking News
Home / Uncategorized / বরিশালে ২৬ মার্চ চালু হয় ‘স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়’

বরিশালে ২৬ মার্চ চালু হয় ‘স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়’

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বরিশালে চালু করা হয় ‘স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়’। যা একমাস কার্যকর ছিল। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে বরিশালসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।

যুদ্ধও পরিচালিত হয়েছে সেখান থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সামরিক সরঞ্জাম, খাদ্য-অর্থ সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হতো ওই সচিবালয়ের মাধ্যমে।

বরিশালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন লেখায়, বইয়ে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক ও তৎকালীন এমএনএ নুরুল ইসলাম মনজুরের আত্মজীবনীমূলক বইয়ে এ তথ্য তুলে ধরে উল্লেখ করা হয় স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়ের কথা। এটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে পরে স্থাপন করা হয় ‘স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়’এর একটি স্মারক।

এমএনএ ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মনজুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। তার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে দক্ষিণাঞ্চল’ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ৭ মার্চের ভাষণের শেষদিকে যা বলেছেন, এর নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট করেই বোঝা যাবে, ওইদিনই (৭ মার্চ) তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

নুরুল ইসলাম মনজুর জানান, ৭ মার্চের পরই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ প্রস্তুতি। বরিশালে স্থায়ী মঞ্চ করে প্রতিদিন চলতে থাকে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গণসংগীত। একদিন উজিরপুর থেকে এসে এক লোক জানান, তার নাম এমএ জলিল। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে মেজর ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জানতে পেরে তিনি চাকরি ছেড়ে পালিয়ে বাড়িতে চলে এসেছেন। প্রয়োজনে তাকে কোনো কাজে লাগাতে চাইলে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। আলাপ-আলোচনার পর তার নাম, ঠিকানা রেখে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। প্রয়োজনে তাকে ডাকা হবে বলেও জানানো হয়।

মনজুর তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে মেজর জলিলের দেয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিমূলক কিছু তথ্য জানিয়ে ওইদিনই আবার বরিশালের উদ্দেশে রওয়ানা হই। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ওই সময় কর্নেল ওসমানী ও ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হকের সঙ্গেও মনজুরের দেখা হয়। বরিশাল ফিরে ২৫ মার্চ দিনভর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিয়ে নানা কাজ করেছিলাম।

২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে আকস্মিকভাবে ট্রাঙ্কলযোগে ছাত্রলীগ নেতা খালেদ মোহাম্মদ আলী জানান, রাজধানী ঢাকায় হানাদার বাহিনী হিংস্র হায়েনার মতো রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, পিলখানা ইপিআরের হেড কোয়ার্টারসহ নিরস্ত্র বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করেছে। তাৎক্ষণিক আমার বাসভবনে আওয়ামী লীগ নেতা ও নির্বাচিত জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের মধ্যে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত (শহীদ), মহিউদ্দিন আহম্মেদ, আমির হোসেন আমু এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মালেক খানসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে জরুরি সভা করি।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাৎক্ষণিক অ্যাডভোকেট সরদার জালাল উদ্দিনকে (শহীদ) নির্দেশ দিলাম রাজধানীতে পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিক ঘটনা শহরে প্রচারের জন্য। পাশাপাশি বরিশাল শহরবাসীকে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ এবং যাদের লাইসেন্সভুক্ত অস্ত্র আছে তাদের অস্ত্র আমার বাড়িতে অবস্থিত কন্ট্রোল রুমে জমা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। ওইদিনই (২৫ মার্চ) ভোররাতে বরিশালের একদল সাহসী মুক্তিকামী তরুণকে নিয়ে ছুটে যাই বরিশাল পুলিশ লাইনে।

তৎকালীন ডিসি আইয়ুবুর রহমান, এসপি ফখরুদ্দিন আহম্মেদ, এডিসি কাজী আজিজুল ইসলাম ও অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সাহায্যে আমরা পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রাগার থেকে ডিএসবির এসআই বাদশা মিয়া, হাবিলদার আকবরসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যের সহযোগিতায় অস্ত্রাগারে রক্ষিত সব অস্ত্র বের করে নিয়ে শহরের বগুড়া রোডের পেশকার বাড়ি এলাকার আমার বাড়িতে আসি। ওই বাড়িতেই গড়ে তুলি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগার। পেশকার বাড়ির পুকুরে অযু করে আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের আমি শপথবাক্য পাঠ করাই। এরপর ২৬ মার্চ সকালেই মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করি।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, দ্রুত বরিশাল শহরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু করতে মেজর জলিলের কাছে খবর পাঠাই। একইদিন বাড়ির সামনে সদর গার্লস স্কুলে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়। গঠন করা হয় একটি শক্তিশালী বিপ্লবী পরিচালনা পরিষদ। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ওই পরিষদের মাধ্যমেই দক্ষিণাঞ্চলের সবকিছু পরিচালিত হয়। ১৭ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী প্রথম বরিশালে আক্রমণ করে এবং ২৬ এপ্রিল বরিশাল শহরের দখল নেয়। ফলে সদর গার্লস স্কুলে স্থাপিত স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে পরিচালনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্র স্থাপন করে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং দখলমুক্ত হয় ৯ নম্বর সেক্টর।
বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক সাবেক এমএনএ ও বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মনজুর নিজের প্রকাশিত বইয়ের মাধ্যমে জানিয়েছেন এসব অজানা তথ্য। স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়ের বেসামরিক প্রধান মনোনীত হয়েছিলেন নুরুল ইসলাম মনজু। সামরিক বিভাগের প্রধান করা হয় মেজর এমএ জলিলকে।

নুরুল ইসলাম মনজুর তার বইয়ে আরো উল্লেখ করেছেন, সর্ব সম্মতিক্রমে বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, খুলনা জেলাসহ দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। ওই পরিষদের বিভাগীয় প্রধানরা ছিলেন নুরুল ইসলাম মনজুর (বেসামরিক বিভাগ), মেজর এমএ জলিল (প্রতিরক্ষা বিভাগ), আব্দুল মালেক খান (অর্থ বিভাগ), মহিউদ্দিন আহম্মেদ (খাদ্য বিভাগ), অ্যাডভোকেট আমিরুল হক চৌধুরী (বিচার বিভাগ), আমির হোসেন আমু (ত্রাণ বিভাগ), শামসুল হক (জ্বালানি বিভাগ), অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন (তথ্য বিভাগ), অ্যাডভোকেট হাসান ইমাম চৌধুরী (সিভিল ডিফেন্স বিভাগ), সরদার জালাল উদ্দিন (যোগাযোগ বিভাগ), ডা. রহমত আলী (স্বাস্থ্য বিভাগ)।

এ পরিষদের প্রধান সমম্বয়কারী ছিলেন অ্যাডভোকেট হেমায়েত উদ্দিন আহম্মেদ। বরিশাল পুলিশ লাইন্সের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে উপরোক্ত জেলাগুলোর ডিসি ও এসপিকে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানসহ স্বাধীন বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রথম সচিবালয়কে সার্বিক সহযোগিতা এবং সর্বত্র ছাত্র-তরুণ-যুবক-কৃষক-শ্রমিক ভাইদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে আহ্বান জানানো হয়।

‘স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রথম সচিবালয়’ নিবন্ধে মরহুম অ্যাডভোকেট হেমায়েত উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে (মুজিবনগরে) আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণার পূর্ব সময় পর্যন্ত বরিশালের সংগ্রাম পরিষদই স্বাধীন বাংলার পক্ষে প্রথম অঘোষিত সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তৎকালীন সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আমাদের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন।

কালেক্টরেটের (জেলা প্রশাসন) কর্মচারীদের একাংশ সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন। সংগ্রাম পরিষদের প্রথম সভায় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সম্মুখ যুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতিরক্ষাপ্রধান মেজর এমএ জলিল বরিশাল বেলর্স পার্কে (বঙ্গবন্ধু উদ্যান) প্রধান প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেন।

Please follow and like us:
error

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বড় আপু

কলেজ থেকে বাসায় এসে ঢুকতেই মা হাতের ইশারায় বুঝালো যেন কোন শব্দ ...