Home / Uncategorized / এই ছুটির শেষ কোথায়?

এই ছুটির শেষ কোথায়?

৮ মার্চ প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ২৬ মার্চ থেকে মূলত গৃহবন্দী। নিজেকে বুঝানোর চেষ্টা করি, পুরো পৃথিবীর মানুষের আজ একই অবস্থা। কতক্ষণ খবর পড়ি, কতক্ষণ টেলিভিশনের চ্যানেল ঘুরাই, ইউটিউবের মাস্তি দেখি, গোগলস থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে ফিরি। না কোন কিছুতেই ভালো লাগে না। প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গেই পত্রিকায় চোখ বুলাই , তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরি, কোথাও কোন ভালো সংবাদ আছে নাকি। প্রতিরাতে ঘুমোতে যাবার আগে ভাবি সকালে নিশ্চয়ই কোন সুসংবাদ পাবো। প্রায় প্রতিটি মানুষের এই মুহূর্তে একটাই আর্তি কোভিড-১৯ প্রতিরোধের ওষুধ আবিষ্কার।

ঘরে বসে থেকে টেলিভিশন আর ইউটিউব দেখতে দেখতে মেয়ে আর মা মিলে চার মাসের জন্য কেনা ২০ প্যাকেট চানাচুর ১২ দিনে শেষ করেছি। যদিও জানি চানাচুর স্বাস্থ্যের জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকর। কিন্তু অতিরিক্ত অবসাদ থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে খাওয়া।

আমাদের দেশে প্রথমে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সরকারী ছুটি ঘোষিত হল। এই ছুটি বাড়িয়ে প্রথমে ১২ পরে ১৪ এপ্রিল করা হল। এখন শুনা যাচ্ছে ১৯ এপ্রিল অফিস খোলার সম্ভাবনা আছে। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন সহযোগিতার জন্য সকলের ভালোর জন্য প্রতিটি মানুষকে আগামী ৩০ দিন নিজ গৃহে অবস্থান করা জরুরী। তাঁর মানে আপাতত আগামী এক মাসেও ছুটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না।

দূরদূরান্তে ভীন দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা টেলিফোন করে, কথা হয়। জার্মানিতে থাকা ভাই-ভাবীর সাথে কথা হলো। ভাবী জানালেন তাঁদেরকে প্রথমেই সাবধান করা হয়েছে, দেশের ৭০% মানুষ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অতএব সকলে সাবধান থাকুন।

কানাডায় থাকা ছেলের সাথে কথা হল, ছেলে জানালো ওদের অফিস থেকে বলে দিয়েছে আগামী জুলাই পর্যন্ত বাসায় বসে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি রাখতে। উন্নত দেশ যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইটালি, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা তথ্যই বচ আমরা সবাই জানি। সব কিছু ঠিক ঠাক মত চললেও অন্যান্য দেশের বিবেচনায় ওদের কথা চিন্তা করলে আমাদের দেশে কেবল কোভিড-১৯ কাটিয়ে উঠতে সময় নিবে হয়ত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর।

এর মধ্যে ওষুধ আবিষ্কারের কথা শুনা যাচ্ছে। যদিও সেসব ওষুধ আগেই ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে ব্যকহৃত হতো। অর্থাৎ নতুন কোন ওষুধ এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। মানুষকে আশান্বিত করার জন্য কেবলই বৃথা চেষ্টা।

আমাদের মানসিক প্রস্তুতির জন্য কেউ কিছু বলছেন না বলে আমরা ভাবছি অন্য যে কোন সময়ের মত ছুটি শেষ হলে আমরা দৌড়ে ঘর থেকে বের হবো।

যেখানে জীবনেরই আদৌ কোন নিশ্চয়তা নেই সেখানে সম্ভাব্য আর্থিক মন্দার কথা নাই বা বললাম। এই লক ডাউনের মধ্যে সকলের দৃশ্যমান বাড়ির সাহায্যকারী কাজের বুয়া, ড্রাইভার, দারোয়ানদের চাকরী থেকে ছাঁটাই করা চলছে । আমরা যা জানছি না অলক্ষ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণ/তরুণী চাকরী চ্যুত হচ্ছে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায়।

গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য স্বল্প সুদে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। অথচ বিগত ৪০ বছরে এই সেক্টরের মালিকরাই এক চেটিয়া মুনাফা অর্জন করে দেশে বিদেশে বসতি গড়েছে, দেশের টাকা অবৈধ উপায়ে এলসি খুলে বিদেশ পাচার করেছেন । অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, শ্রমিকের রক্ত শোষণ করে তাঁদের ঠকিয়ে নিজেরা সম্পদশালী হয়েছেন, অথচ দেশের দুঃসময়ে তাঁরাই আবারও শ্রমিকদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন।

শোনা যাচ্ছে লক ডাউনের এই সময়টাতে পৃথিবী ব্যাপী পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে । কারণ দীর্ঘ সময় স্বামী-স্ত্রী পরিবারের সহ অবস্থান। কারণ হিসেবে অনেকে বলতে চাইছেন স্বামী/স্ত্রীর চারিত্রিক দুর্বলতাগুলো গোচরিভূত হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ে বাইরে থাকার কারণে যা হয়তো কোনোদিন চোখেই পড়েনি। কিংবা হতে পারে অনঅভ্যস্ততা। একের জগত অপরের দখল করার মানসিকতা, অতিরিক্ত খবরদারি। আবার বিপরীতটাও দেখা যাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পিকনিক মুডে আছেন, একসাথে রান্না-বান্না, ঘরকন্যা ।

কোভিড-১৯ না এলে মানুষ জানতেই পেতো না জীবনে এতো ধন-দৌলত, প্রাচুর্য, এতো হীরে জহরতের দরকার নেই। নির্মল আলো-বাতাস, রোঁদ-বৃষ্টি,মেঘ, সুনীল আকাশ, পাহাড়-সমুদ্র অর্থাৎ প্রকৃতি আর মানুষের ভালোবাসাই জীবনের অমূল্য সম্পদ যা পাওয়ার জন্য এতো অর্থ সম্পদের প্রয়োজন নেই।

আমরা বাসায় বসে বিরক্ত হচ্ছি, বিষণ্ণ হচ্ছি মূলত প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হচ্ছে বলে। কারণ সমস্ত মানুষ প্রকৃতির অংশ। সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে একা থাকা প্রতিটি মানুষের জন্যই কষ্ট সাধ্য।

এই দুর্যোগে সবচেয়ে শিক্ষণীয় হল, যত বড়ই হোক, যত অর্থ-বিত্ত আর ক্ষমতার অধিকারীই হোক মানুষ মূলত অসহায়। অদৃশ্যমান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অণু-জীবের ভয়ে আমরা সবাই নিজ গৃহে বন্দী।

কবে কাটবে আমাদের বন্দী দশা, কবে জীবন তাঁর স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে, আদৌ কোনোদিন আগের মত স্বাভাবিক হবে কি না জানা নেই কারোই । কোভিড-১৯ কেবল আমাদের শারীরিক অবস্থান নয়, হৃদয়, মন তথা স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনাকেও লক করে রেখেছে। বিষাদে ঘিরে রেখেছে চির চেনা জগতটিকে।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

About jahir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আপনাকে কতোটা ভালোবাসে স্ত্রী খেয়াল করুন লক্ষ্মণগুলো

সুখী দাম্পত্য কে না চায়, আপনিও নিশ্চয়ই চান যে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে ...