নবাবগঞ্জে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

১৭ মার্চ ২০২৩
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

‘বহু অখ্যাত ও স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীনতা পদক পদান করা হলেও মাধুরী বণিকের মতো মানুদের রাষ্ট্র এখনও কোনও মর্যাদা দেয়নি’ Ñশাহরিয়ার কবির

আজ ১৭ মার্চ ২০২৩, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার পানালিয়া গ্রামের মাধুরী বণিকের গাছতলার পাঠশালায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষানুরাগী মাধুরী বণিককে সংবর্ধনা প্রদান করে। এর পাশাপাশি স্কুলের শিশুদের বই ও ছবি অঁাকার সরঞ্জাম উপহার দেওয়া হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।
এই অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ভেতর অংশগ্রহণ করেন মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি চারুশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারক আলভী, নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, নির্মূল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক লেখক আলী আকবর টাবী, নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় ও জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের নির্বাহী সভাপতি আবৃত্তিশিল্পী মো. শওকত আলী। এছাড়াও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মুন্নি সাহা, নবাবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মো. মতিউর রহমান এবং কলাকোপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল এবং স্থানীয় সাংবাদিক শওকত আলী রতন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকার নবাবগঞ্জের পানালিয়া গ্রামে মাধুরী বণিকের গাছতলার পাঠশালায় সকাল ১১টায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধমে অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়। বঙ্গবন্ধুর ১০৩তম জন্মদিন উপলক্ষে কেক কাটার পর নির্মূল কমিটির পক্ষে থেকে মাধুরী বণিককে সংবর্ধনা ও মানপত্র প্রদান করে তাঁর হাতে লাইব্রেরির জন্য ছয় শতাধিক বই, নগদ অর্থ (বঙ্গবন্ধুর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক লক্ষ তিন হাজার টাকা) এবং শিশুদের জন্য ছবি অঁাকার সরঞ্জাম উপহার দেয়া হয়। এরপর জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শিশুদের রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। শেষ পর্বে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘নবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে মাধুরী বণিক গত তিন দশক ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মায়েদের জন্য পাঠাগার এবং শিশুদের জন্য গাছতলায় পাঠশালা স্থাপন করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদানের যে মহান উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার জন্য আমরা জাতি হিসেবে গর্বিত। আমরা আশা করব দেশ ও জাতির কল্যাণে বঙ্গবন্ধু আদর্শের সৈনিক মাধুরী বণিকের এই অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননাপ্রদান এবং স্বাধীনতা পদক প্রদান করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এক অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা ও জয় বঙ্গবন্ধ’ু বলার জন্য মাধুরী বণিককে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল, কিন্তু তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। বহু অখ্যাত ও স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হলেও মাধুরী বণিকের মতো মানুদের রাষ্ট্র এখনও কোনও মর্যাদা দেয়নি।’ সভায় শাহরিয়ার কবির মাধুরী বণিকের জন্য স্থায়ী পাঠাগার ও পাঠশালা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘মাধুরী বণিক যেন পাঠাগার ও পাঠশালা ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারেন এ বিষয়ে নিমূর্ল কমিটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবে।’
১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে মৌলবাদ ও সা¤প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘প্রাচীনকাল থেকেই ঢাকার নবাবগঞ্জে বাংলাদেশের অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ জন্ম নিয়েছেন। যাঁদের মাঝে মাধুরী বণিক অনন্য। তাঁর কাজের মাধ্যমে তিনি যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন তা এ সময়ে একেবারেই বিরল। তিনি মাত্র নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও তার জ্ঞানের পরিধি অনেক। সে জ্ঞান শিশুদের মাঝে বিতরণ করছেন। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিশুদের গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন।’ মাধুরী বণিকের মতো এমন একজন মানুষকে খুঁজে বের করার জন্য সাংবাদিক শওকত আলীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে পাঠশালার কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর বলেন, ‘শিশুদের মানস গঠনের জন্য মাধুরী বণিক ঘরে ঘরে গিয়ে মায়েদের কাছে বই পেঁৗছে দেনÑ মায়েরা বই পড়ে বাচ্চাদের জ্ঞান দান করতে পারেন। জাতি গঠনের জন্য এমন দৃষ্টান্ত ইতোপূর্বে কখনো দেখিনি। আশা করি, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাধুরী বণিকের মতো শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো ছড়াবো। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আমরা যদি নিজের অবস্থান থেকে এরকম মহতী কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িত রাখি তাহলে অচিরেই বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধির পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে।’
নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ বলেন, ‘মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা বাঙালি অতঃপর আমাদের ধর্মীয় পরিচয়। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে আমাদের জাতিগত পরিচয় বড়। শিক্ষক ও অভিভাবকরা যেন বাচ্চাদের এই শিক্ষাই দান করেন। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো। মাধুরী বণিক দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের অভিভাবক ও শিশুদের এই শিক্ষায় দিয়ে আসছেন। এজন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। আমরা চাই রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে সম্মান জানানো হোক।’
‘গাছতলার পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষাদাত্রী মাধুরী বণিক অত্যন্ত আপ্লম্নত হয়ে নির্মূল কমিটিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করি। ঘুরে ঘুরে এলাকার মায়েদের কাছে বই বিতরণ করিÑ যেন তারা তাদের বাচ্চাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন। এতদিন নিজ চেষ্টাই এ কাজ করে এসেছি এখন নির্মূল কমিটিরসহ উপস্থিত গুণীজনদের সহযোগিতায় আমার এই শিক্ষাদানকে সুন্দরভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারব এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি।’ তিনি বিশেষভাবে শাহরিয়ার কবিরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে শিক্ষাদাত্রী মাধুরী বণিকের গাছতলার পাঠশালা’র কার্যক্রমের প্রশংসা করে জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের নির্বাহী সভাপতি আবৃত্তিশিল্পী মো. শওকত আলী বলেন, ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব মাধুরী বণিকের পাঠশালাকে বিশেষভাবে সহায়তা প্রদান করা এবং মাধুরী বণিকের কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা।’
মাধুরী বণিককে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করে এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মুন্নি সাহা বলেন, ‘যখন আমরা কারো এরকম মহত কর্মকান্ড দেখি তখন বঙ্গবন্ধুকে অনুভব করি। মাধুরী বণিক যেন বঙ্গবন্ধুর একটি অংশ। তাঁকে দেখে ও জড়িয়ে ধরে যেন বঙ্গবন্ধুকেই অনুভব করছি।’ মুন্নি সাহা বক্তব্য শেষে মাধুরী বণিকের পাঠাগারের জন্য তার সংগৃহীত বই উপহার দেন।
নবাবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘মাধুরী বণিক যেভাবে গ্রামের শিশুদের মাঝে জ্ঞানের আলো বিতরণ করেছেন এজন্য নবাবগঞ্জ উপজেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশ গর্বিত। তিনি আমাদের মাঝে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। আমরা চাই মাধবী বণিকের মতো সকলেই যে যার অবস্থান থেকে এমন মহতী কাজে এগিয়ে এসে আমাদের দেশকে আরো সুন্দর ও সমৃদ্ধ করবো।’
কলাকোপা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘মাধুরী বণিক এতদিন নিজেকে অন্ধকারের মধ্যে রেখে এই অঞ্চলের শিশুদের মাঝে জ্ঞানের আলো বিতরণ করে আসছিলেন কিন্তু আজকে নির্মূল কমিটির মাধ্যমে তিনি আলোকিত হলেন বাংলাদেশকে আলোকিত করলেন। আশা করছি তাঁর কাজের জন্য এবার তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হবেন।’
নির্মূল কমিটির আইটি সেলের সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় নাগরিক সংবর্ধনার মানপত্র পাঠ করেন, ‘দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ভেতর শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারে শিশুদের জন্য পাঠশালা এবং বড়দের জন্য পাঠাগার কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে আপনি যে দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার জন্য আমরা জাতি হিসেবে গর্বিত।
আপনার কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হচ্ছে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্তর্গত। আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। প্রতি বছর এ দিনটি বাংলাদেশে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়। আজ ১৭ মার্চ, ২০২৩ তারিখে আপনার পরিচালিত পাঠশালার শিশু শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আপনাকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করে আমরা গৌরব বোধ করছি।’
অনুষ্ঠানের পর নিমূর্ল কমিটির নেতৃবৃন্দ মাধুরী বণিকের ভিটায় মাধুরী বণিক কতৃর্ক প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার পরিদর্শন করেন।

Exit mobile version