নীলফামারী প্রতিনিধি: সরকারি খাসজমি দখল, দোকানের ‘পজিশন’ বিক্রি এবং মসজিদ স্থানান্তর করে জমি বিক্রির অভিযোগের প্রশাসনিক তদন্ত শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগে। এরপরও মামলা সৃজন ও সরকারি জমি উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি নিয়ে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় হাজীগঞ্জ বাজারের বিষয়টি আবারও উত্থাপিত হয়। সভায় সরকারি খাসজমি দখল, দোকানের ‘পজিশন’ বিক্রি, মসজিদ স্থানান্তর এবং তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নীলফামারী জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য সচিব আব্দুল মোমিন। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহকে বিষয়টি সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে মামলা সৃজন করা হবে। কিন্তু ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই আশ্বাসের ১৬ দিন পার হলেও মামলা সৃজন হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেও কেন মামলা সৃজন হলো না এবং প্রক্রিয়াটি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে?
মামলা সৃজনের অগ্রগতি জানতে ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নথি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় নথি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানোর হয়নি। নথি প্রেরণের বিষয়েই যখন দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখন মামলা সৃজনের প্রক্রিয়া কোথায় আটকে আছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর। অভিযোগ অনুযায়ী, জয়ন্ত কুমার হাজীগঞ্জ বাজারে মসজিদের উত্তরে ও নিজের দোকানের পূর্বদিকে সরকারি খাসজমিতে স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নির্মাণকাজ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ৩০ ডিসেম্বর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে চুড়ান্ত ভাবে দখলমুক্ত হয়নি। একই এলাকায় মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি খাসজমিতে দোকানঘর নির্মাণ, ‘পজিশন’ বিক্রি এবং মসজিদ স্থানান্তর করে জমি বিক্রির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি হয় এবং জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
গোড়গ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিস ১৫ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদনসহ সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠায়। পরে নীলফামারী সদর উপজেলা ভূমি অফিস তদন্ত শেষে ৬ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠায়। এপ্রিলের প্রকাশিত প্রতিবেদনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা এবং রাজস্ব সভায় উপস্থাপনের পর মামলা ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের কথা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। সরকারি নথি অনুযায়ী, কীর্তনীয়াপাড়া মৌজার জেএল নং-১৩-এর বিএস ১ নম্বর খাস খতিয়ানের আরএস দাগ নং-৮২৮ এবং সাবেক দাগ নং-১১৮১ এলাকায় প্রায় ০.১৫০০ একর জমিতে ১১টি আধাপাকা দোকান থাকার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্ত-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে ‘পজিশন’ বিক্রির ডিডের কপিও সংযুক্ত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে এসব লেনদেনের আইনগত বৈধতা, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং সরকারি খাসজমিতে ব্যক্তিগতভাবে ‘পজিশন’ কেনাবেচার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—এসব প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ২৫ জুন ২০২৬ তারিখের কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি), নীলফামারী সদরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে প্রশাসনিক নির্দেশনার পর মামলা ও উচ্ছেদ কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
এর আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোছা. মলি আক্তার জানিয়েছিলেন, বিষয়টি রাজস্ব সভায় উপস্থাপন করে পরবর্তী সময়ে মামলা সৃজন ও উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সাইদুল ইসলামও রাজস্ব সভায় বিষয়টি উপস্থাপনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিন দিনের মধ্যে মামলা সৃজনের আশ্বাস দেওয়া হলেও ১৬ দিনেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এখন সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—তদন্ত শেষ, নথি প্রস্তুত এবং প্রশাসনিক সভায় বিষয়টি একাধিকবার আলোচিত হওয়ার পরও মামলা সৃজনের প্রক্রিয়া কেন দীর্ঘায়িত হচ্ছে? নথি প্রেরণের বিষয়ে ভিন্ন তথ্যের কারণই বা কী? আর সরকারি খাসজমি দখল ও ‘পজিশন’ বিক্রির অভিযোগের ক্ষেত্রে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ কবে দৃশ্যমান হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন প্রত্যাশিত।
Post Views: 1
Related