সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিশাল বহর ও শত শত কোটি ডলারের সামরিক প্রস্তুতি সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশটির নিরাপত্তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে কেনা প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকার পরও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় প্রাণঘাতী হামলা দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে তুলেছে।
গত শনিবার রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জনের মৃত্যুর পরদিন রোববার টার্মিনাল ৪-এ আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। একে একে দাম্মাম, আভা, জিজান এবং নাজরান বিমানবন্দরও লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় কেবল সামরিক স্থাপনা বা তেলক্ষেত্রই নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। রিয়াদের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দে কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী এবং আর্থিক খাতের কর্মীরা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল ভূখণ্ডের প্রতিটি কোণায় একই সঙ্গে শতভাগ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। হুতিদের কৌশলগত সুবিধা হলো তাদের প্রতিটি হামলা শতভাগ সফল হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং মাঝেমধ্যে একটিমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানতে পারলেই তা দেশটিতে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করতে এবং বিমান চলাচল ও অর্থনীতিতে স্থবিরতা আনতে যথেষ্ট। পাশাপাশি, সানা দখলের পর থেকে হুতিদের অস্ত্রভান্ডারে যুক্ত হওয়া প্যালেস্টাইন-২ ও তুফানের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। প্যাট্রিয়ট বা থাডের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চমূল্য ও সীমিত মজুতের কারণে দীর্ঘমেয়াদে এই সংঘাতের ব্যয় বহন করাও রিয়াদের জন্য বড় আর্থিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তার এই অবনতি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভিশন ২০৩০ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। রিয়াদের সাম্প্রতিক হামলার পর এক্সনমবিল, টোটালএনার্জিস, শেল, শেভরন ও বিপির মতো শীর্ষ তেল কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসের নির্ধারিত কর্মসূচি থেকে বিরত থাকেন। যদিও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ভ্রমণের বিঘ্নতার কথা জানিয়েছে, তবে এই অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে নিরাপত্তা ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়নের বার্তা দিচ্ছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সৌদি আরব ভ্রমণ নিয়ে নতুন সতর্কতা জারি করেছে এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
হুতিদের এসব ধারাবাহিক হামলার জেরে রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের তিন প্রধান বিমানবন্দরে গত দুই দিনে প্রায় দেড় হাজার ফ্লাইট বাতিল এবং এক হাজারের বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ দেশটির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্বপ্ন এখন একদিকে আকাশ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ এবং অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতের ধাক্কা সামলানোর দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।







