ভোটের আগের দিন সকাল থেকেই রহিম চাচার মনটা ভালো ছিল।বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে। পেশায় তিনি একজন ক্ষুদ্র কৃষক। জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে মাটির সঙ্গে লড়াই করে। কখনো বৃষ্টি তাঁর ফসল বাঁচিয়েছে, কখনো অতিবৃষ্টি সব শেষ করেছে। কখনো ধানের ভালো ফলন হয়েছে, অথচ বাজারে দাম পাননি। কখনো ঋণের কিস্তি দিতে গিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা বন্ধ রাখতে হয়েছে।তবু তিনি স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি।
নির্বাচনের আগের দিন রাতে স্ত্রীকে বলেছিলেন, “এবার যদি এলাকার রাস্তাটা ঠিক হয়, আমাদের আর বর্ষায় কাদা মাড়িয়ে বাজারে যেতে হবে না। ছেলেটার চাকরির একটা ব্যবস্থা হলে সংসারটাও একটু দাঁড়াবে।”
স্ত্রী হেসে বলেছিলেন, “তুমি তো প্রত্যেকবারই এমন আশা করো।রহিম চাচা কিছু বলেননি কারণ আশা করা ছাড়া তার হাতপ আর কী- ই বা আছে?
পরদিন সকালে পরিষ্কার জামা পরে তিনি ভোটকেন্দ্রে গেলেন। লাইনে দাঁড়ালেন। সামনে-পেছনে পরিচিত মানুষ। কারও হাতে ছাতা, কারও কাঁধে গামছা। কেউ প্রার্থীর প্রশংসা করছেন, কেউ আগের সরকারের ব্যর্থতার কথা বলছেন, কেউ আবার চুপচাপ নিজের পালার অপেক্ষা করছেন।রহিম চাচাও অপেক্ষা করলেন।ভোট দেওয়ার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, ছোট্ট একটি সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে হয়তো নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ভোট, কিন্তু সেই ভোটের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অনেকগুলো আশা—রাস্তা, হাসপাতাল, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম, ছেলের কর্মসংস্থান, আর একটু সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিনি চায়ের দোকানে থামলেন।সেখানে একজন বললেন, “এবার দেখবেন, এলাকার চেহারাই বদলে যাবে।”
আরেকজন বললেন, “আগেও তো শুনেছি।”রহিম চাচা চায়ে চুমুক দিলেন। কারও কথার বিরোধিতা করলেন না।তিনি শুধু মনে মনে ভাবলেন, দেখা যাক, এবার কথার সঙ্গে কাজেরও দেখা মেলে কি না।
রহিম চাচার এই গল্পটি কাল্পনিক। কিন্তু ভোটকে ঘিরে আশা, সংশয় এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—এসব অনুভূতি বহু নাগরিকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
একটি ভোটের মূল্য তাই শুধু ব্যালটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নাগরিকের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আস্থা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভোট দেওয়ার পর সেই নাগরিকের ভূমিকা কী?আর তাঁর কাছে নির্বাচিত প্রতিনিধির দায়ই বা কতটুকু?ভোট শেষ, সম্পর্কও কি শেষ?
নির্বাচনের আগে রাজনীতির ভাষা বদলে যায়।দীর্ঘদিন যে জনপ্রতিনিধিকে কাছে পাওয়া যায়নি, তিনি হঠাৎ মানুষের বাড়িতে আসেন। যে রাস্তাটি বছরের পর বছর মেরামতের অপেক্ষায় ছিল, সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যে সমস্যাগুলো নিয়ে মানুষ বারবার অভিযোগ করেছেন, সেগুলো নির্বাচনী বক্তৃতায় জায়গা পায়।
প্রার্থী বলেন, তিনি মানুষের পাশে থাকবেন। এলাকার উন্নয়ন করবেন। দুর্নীতি প্রতিরোধ করবেন। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবেন। জনগণের কথা শুনবেন।এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিজে কোনো অপরাধ নয়। বরং নির্বাচনের সময় নাগরিকদের সামনে পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সঙ্গে তা বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে না; যখন ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করা হয় না; যখন জনগণ জানতে পারেন না, তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি কী করেছেন এবং কী করতে পারেননি।
ধরা যাক, একটি এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি ঘোষণা দিলেন, এক বছরের মধ্যে এলাকার পানিনিষ্কাশন সমস্যার সমাধান করবেন।এক বছর পর নাগরিকেরা যদি জানতে চান, কাজটি কত দূর এগিয়েছে, কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কী কারণে কাজ শেষ হয়নি—তাহলে তাঁরা কি অন্যায় করছেন?না। তাঁরা তাঁদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করছেন।
একজন জনপ্রতিনিধির প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ তাঁকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া নয়। বরং তাঁর দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া নাগরিক দায়িত্বেরই অংশ।
ভোট দেওয়া নাগরিকের অধিকার; ভোটের পর হিসাব চাওয়া তাঁর গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সব সময় একজন প্রতিনিধির একক ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। বাজেট, প্রশাসনিক অনুমোদন, আইনি সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
কিন্তু কোনো কাজ করতে না পারার ব্যাখ্যা দেওয়া এবং পরবর্তী পরিকল্পনা জানানো—এগুলো জবাবদিহির অংশ হতে পারে।
জনগণ সব সময় নিখুঁত ফলাফল দাবি করতে পারেন না, কিন্তু তাঁদের কাছে সত্য গোপন না করার দাবি করার অধিকার রয়েছে।
একটি দেশের নাগরিকের গুরুত্ব কি কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে?যদি তাই হয়, তবে গণতন্ত্রকে আমরা খুব সংকীর্ণ অর্থে বুঝছি।
নাগরিকের জীবন তো নির্বাচনের ক্যালেন্ডার মেনে চলে না। বাজারের দাম নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করে না। অসুস্থতা ভোটের দিন দেখে আসে না। একজন বেকার তরুণের বয়স রাজনৈতিক প্রচারণা শেষ হওয়া পর্যন্ত থেমে থাকে না। কৃষকের ফসল, শ্রমিকের মজুরি, শিক্ষার্থীর পরীক্ষা কিংবা পরিবারের বাড়িভাড়া—কোনোটিই নির্বাচনী মৌসুমের মধ্যে আটকে নেই।
মানুষের সমস্যা প্রতিদিনের। তাই মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বও প্রতিদিনের।
গণতন্ত্রের অর্থ শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করা নয়; এর মধ্যে রয়েছে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের সুযোগ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জবাবদিহি। এসবের কার্যকারিতা নির্ভর করে দেশের আইন, প্রতিষ্ঠান ও বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
নির্বাচিত সরকারকে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়। একই সঙ্গে তার কাজ পর্যালোচনা করার ব্যবস্থাও থাকতে হয়। সমালোচনা ও সহযোগিতা পরস্পরের শত্রু নয়। দায়িত্বশীল সমালোচনা সরকারকে ভুল শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে, আর গঠনমূলক সহযোগিতা জনস্বার্থে ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কোনো সরকার একটি ভালো কাজ করলে সেটিকে স্বীকার করা যেমন ন্যায়সংগত, তেমনি কোনো সিদ্ধান্তে মানুষের ক্ষতি হলে তার ব্যাখ্যা ও সংশোধন চাওয়াও ন্যায়সংগত।রাজনীতিকে যদি শুধু জয়-পরাজয়ের খেলা হিসেবে দেখি, তাহলে নাগরিকের বাস্তব জীবন আড়ালে পড়ে যায়।কিন্তু রাজনীতিকে যদি জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখি, তাহলে প্রশ্ন বদলে যায়।তখন প্রশ্ন হয় না শুধু, কে জিতলেন?প্রশ্ন হয়, জয়ের পর তিনি মানুষের জন্য কী করলেন?
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক