ঘটনাটি ২০২০ সালের। তখন আমি প্রতিদিন হরিয়ানার একটি শহর থেকে উত্তর প্রদেশের একটি শহরে চাকরির জন্য যাতায়াত করতাম। প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ প্যাসেঞ্জার ট্রেনে পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু শীতকালে ঘন কুয়াশার কারণে ট্রেন প্রায়ই দেরি করত। তখন বাধ্য হয়ে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে পড়তাম, যেখানে একই পথ মাত্র আধা ঘণ্টায় শেষ হয়ে যেত।
আমার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। তাঁর ফার্স্ট ক্লাসের পাসটি সবসময় আমার পার্সে থাকত। তাই টিকিট পরীক্ষকও আমাকে কিছু বলতেন না।
একদিন এমনই একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের স্লিপার কোচে উঠেছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই সব সিট সংরক্ষিত ছিল, তাই বসার জায়গা পাওয়ার আশা ছিল না। তবুও এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলাম। তখন প্রায় ৭০–৭৫ বছর বয়সী এক ভদ্রলোক বললেন,
— “মা, এখানে এসে বসো।”
তাঁর ডান পাশে একটি মেয়ে বসে ছিল, আর আমি বাম পাশে বসলাম। সামনের সিটে মধ্যবয়সী এক দম্পতি বসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে এক তরুণও ছিল—সম্ভবত তাঁদের ছেলে, যদিও নিশ্চিত ছিলাম না।
ট্রেন কিছু দূর যাওয়ার পর ভদ্রলোকের ঘুম পেতে শুরু করল। একটু পরপরই তিনি কখনো আমার দিকে, কখনো পাশের মেয়েটির দিকে হেলে পড়ছিলেন। প্রথমে ভাবলাম, বয়সের কারণে হয়তো এমন হচ্ছে। তাই বিশেষ কিছু মনে করিনি।
কিন্তু যখন একই ঘটনা বারবার ঘটতে লাগল, তখন বুঝতে আমার আর বাকি রইল না—এটি ইচ্ছাকৃত। বলা হয়, ঈশ্বর প্রতিটি নারীকে স্পর্শের ভাষা বোঝার এক বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন।
আমি সেখান থেকে উঠে যাওয়ার কথা ভাবছি, এমন সময় সামনের সিটে বসে থাকা সেই তরুণ উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আমি তার সিটে বসতে চাইলেও দ্বিধায় ছিলাম—যদি সে রাগ করে বলে, “এটা তো আমার সিট!”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করার জন্য তাকাতেই, আমার কিছু বলার আগেই সে মাথা নেড়ে ইশারায় জানিয়ে দিল—“আপনি আমার সিটে বসে যান।”
সত্যি বলতে, সেই মুহূর্তে আমার মন, মস্তিষ্ক আর হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়েছিল। মনে মনে ঠিক করেছিলাম, স্টেশনে নামার সময় অবশ্যই তাকে ধন্যবাদ জানাব।
ওদিকে অন্য মেয়েটিও একটু সরে গিয়ে বসেছিল। মাঝখানে নিজের ব্যাগটি রেখে আমার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে দিল।
এবার সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের আর কোনো ঘুম এল না। তিনি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
আমার স্টেশন এসে গেল। নামার সময় সেই তরুণকে খুঁজছিলাম, শুধু একবার “ধন্যবাদ” বলার জন্য। কিন্তু তাকে আর দেখতে পেলাম না।
হয়তো সত্যিই কিছু মানুষ অন্যের কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশা না করেই সাহায্য করে চলে। আজও অন্তর থেকে সেই তরুণের জন্য দোয়া বেরিয়ে আসে। ভাবি, কী অসাধারণ মূল্যবোধ আর শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁর বাবা-মা!
সত্যিই, বয়স তো শুধু একটি সংখ্যা—কেউ সেই বয়সকে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার অজুহাত বানায়, আবার কেউ সেই বয়সেই অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
🙏”হরিয়ানার মেয়ে”- গল্প,,,,,,,,









