তাকে আমি খুব একটা ভালোবেসে উঠতে পারিনি তার বেশি ভালো হবার স্বভাবের কারণে। অতিরিক্ত সাদামাটা স্বভাবের কারণে আমি খুব একটা আকর্ষণ অনুভব করি না তার প্রতি। তার স্বভাবে আলো-আঁধারি ব্যাপারটা নেই।
সে এখন বিছানায় পড়া। ব্রেইন স্ট্রোক। সে নড়াচড়া করতে পারে না, কেউ কিছু বললে কেবল চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে। বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করে ফেলার কারণে ডায়পার ব্যবহার করা হচ্ছে। আর খাওয়াদাওয়া চলছে ফিডিং টিউব দিয়ে।
মেহরীনের এমন শয্যাশায়ী অবস্থা, নীরবতা আমার জন্য নতুন কিছু না। বহুদিন ধরেই আমার সাথে তার খুব একটা বেশি কথা হয় না। বিছানায় সে আমার পাশে চুপচাপ শুয়ে থাকত। এখন সেই নীরবতার সঙ্গে অসাড়তাও যোগ হয়েছে।
ওহ, আমার পরিচয় দেওয়া হয়নি । আমার নাম জহির, একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার বন্ধু সংখ্যা অনেক। অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাংবাদিক, ব্যাংকার, ডাক্তার, পুলিশে থাকা অনেক মানুষই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
মাসে বন্ধুদের সাথে দু- তিনটে ট্যুর, প্রতি সপ্তাহে দুই তিনটে গেট টুগেদার, রিলস দেখে আর গেমিং করে আমার সময় কীভাবে কেটে যায় টেরই পাই না। নিঃসন্তান হওয়ার কারণে তেমন পিছুটানও নেই আমার।
মুক্ত পাখি হবার লোভে আমি ল্যাটিন ফ্রেজ “কার্পে ডিয়েম” -কে জীবনদর্শন হিসেবে নিয়েছি। । আমি খানিকটা পরিমার্জন করে যার বাংলা অর্থ দাঁড় করিয়েছি- ” আজকের দিনটা নিজের জন্য বাঁচো”।
তবে মেহরীনের ব্রেইন স্ট্রোকের পর আমি নিজের মতো বাঁচতে পারছি না সপ্তাহ খানেক ধরে। একজন নার্স সার্বক্ষণিক ওর দেখভালের জন্য রেখেছি। তবুও ওকে ফেলে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুরা বার কয়েক অনুরোধ করলেও বাইরে বের হতে একদমই ইচ্ছে করেনি।
আমার কেমন যেন মায়া হচ্ছে মেহরীনের দিকে তাকালেই। এমন মায়া বহুকাল হয়নি ওর জন্য।
কলিং বেল বাজল । একবার…দুবার৷ উঠে দরজা খুলতেই দেখলাম এক ষাটোর্ধ্ব পুরুষ ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। ট্রের তিনটে বাটিতে কুমড়ো শাক, টাকি মাছের ঝোল আর ঘন মসুর ডাল। আমি খানিকটা অবাক হলাম। ভদ্রলোক আমার অবাক হওয়া দেখে বললেন, মেহরীন বলেছিল তুমি এগুলো পছন্দ করো, তাই আনলাম।
আমি ইশারায় তাকে ভেতরে আসতে বলতেই তিনি ব্যস্ত পায়ে আমার আগেই ট্রে নিয়ে খাবার টেবিলে রেখে মেহরীনের পাশে গিয়ে বসলেন।
তার চোখ দুটো টলমল করছে। মৃদুভাবে উনি মেহরীনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আল্লাহ ভালো করবে মা, আল্লাহ ভালো করবে।
আমি চেয়ারে বসতে বসতে বললাম, আপনাকে ঠিক চিনলাম না।
– আমি সি ইউনিটে থাকি। রূপা জুয়েলারী আমারই। মেহরীন মেয়ের চেয়ে কম না আমার কাছে। আমার মায়ের এমন অবস্থা হবে কে জানত! প্রতিদিন বিকেলে আমার সাথে লুডু খেলত, আমাকে চা করে খাওয়াত, মাথায় কলপও দিয়ে দিয়েছিল গত শুক্রবার।
ভদ্রলোক এবার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছেন, অনেকক্ষণ ধরে কান্না আটকে রেখেছিলেন। আমার বুকটা কেমন ধরে এলো উনার কান্না দেখে। মেহরীন চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে উনার কান্না দেখছে, ওর চোখ দুটো ক্লান্ত দেখাচ্ছে এখন।
ভদ্রলোক যাবার পরে ভ্যানগাড়িতে তরকারি বিক্রি করা সবুর এক ব্যাগ তরকারি দিয়ে গেছে বাসায়, টাকা দিলেও নেয়নি।
ময়লার গাড়িওয়ালা আক্কাস প্রতিদিন সকালে নিজে এসে ময়লা নিয়ে যাচ্ছে আর দূর থেকে মেহরীনকে দেখে যাচ্ছে উঁকি দিয়ে।
একটু আগে একটা মেয়ে এসেছে বাসার কাজ করে দিতে। সে কাজ করে ডি ইউনিটে। মেহরীন নাকি তাকে ছোটোবোনের মতো আদর করে, তার যেকোনো সমস্যার সমাধান করে তুড়ির বেগে। মেহরীনের এই অবস্থায় বাসা নোংরা থাকবে এটা নাকি তার ভালো লাগবে না৷
অথচ বাসায় কখনো কাজের লোক রাখেনি ও। আমি অনেকবার বলার পরও রাখেনি। মেহরীনের যুক্তি ছিল-” ছোটো সংসার, কাজ অত নেই। তোমার ঘামে ভেজা শার্ট, তোমার জন্য রাঁধা তরকারি, বিছানার চাদর ধোয়া, তোমার এঁটো প্লেট সবকিছুতে মায়া মায়া লাগে আমার। মায়ার ভাগ অন্য কাউকে দিতে ঈর্ষা হয় আমার”।
জবাবে বলেছিলাম, একটু নিজের মতো করে বাঁচো, জীবনকে উপভোগ করো।
উত্তরে মেহরীন বলেছিল, “নিজের মতো করেই তো বেঁচে আছি, তোমায় নিয়ে “।
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল বিচ্ছিরি একটা গন্ধে। মেহরীন সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর কাছে যেতেই বুঝলাম ডায়পার থেকে গন্ধটা আসছে। নার্সের ডিউটি রাত দশটা পর্যন্ত, আবার সকালে আসবে। কী করব বুঝতে উঠতে পারছি না।
হুট করেই মনে পড়ল এক রাতের কথা। ফুড পয়জনিংয়ের কারণে বমি করেছিলাম। ও মুচকি হেসে ফ্লোর পরিষ্কার করার সময় বলেছিল, বাইরে খেতে কতবার মানা করি, শোনো না তো আমার কথা।
প্রতিদান হোক কিংবা মায়া, যাই বলি না কেন হুট করে আমি খানিকটা দুঃসাহসী হয়ে ওর ডায়পারটা বদলে দিলাম। বমি পাচ্ছিল প্রথমে, তারপর গন্ধটা কেমন করে যেন সয়ে গেল। মেহরীন চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে কী যেন দেখতে চাইছে, আমাকে? হয়তো।
বাইরে হলদে কুমড়োর মতো চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলো পর্দার কারণে বেলকনি দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারছে না। উঠে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দিলাম। চাঁদের আলো মেহরীনের মুখে পড়েছে। ওকে অনেকদিন পর দেখতে ভারী সুন্দর লাগছে। ঠিক বাসর রাতের মতো। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হবার কারণে বাসর রাতেই ওকে প্রথম কাছ থেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এরপরে বহুকাল এমন মুগ্ধ হইনি।
দেখতে দেখতে প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পেরিয়ে গেলো। এর মাঝে মা বাবা হারা মেহরীনের বড় ভাই দুদিনের জন্য ইউকে থেকে এসে মেহরীনকে দেখে গেছে। আমার দুয়েকজন বন্ধুও এসেছিল। নার্সও নানা সমস্যা দেখিয়ে তার খণ্ডকালীন চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছে।
এখন আমি পুরোদস্তুর গৃহ-স্বামী হয়ে উঠেছি। অ্যাপার্টমেন্টের কেউ না কেউ প্রতিদিন মেহরীনকে দেখতে আসে। ছোটো বাচ্চারা আপেল, চকলেট নিয়ে আসে বাবা মাকে না জানিয়ে। মধ্যবয়স্ক, বয়স্ক লোকেরা এসে আমার সাথে গল্প করে যায়।
অবাক করার বিষয় হচ্ছে, আমার ঘরের কোন ইলেকট্রনিক প্রোডাক্টের দাম কত, কবে কেনা, ওয়ারেন্টি কতদিনের, আমার প্রমোশন কবে হয়েছে সবই তারা জানে। যার বেশিরভাগ খবরই আমার অজানা। তাদের চোখে আমি সেরা স্বামী, যে তার স্ত্রীকে প্রচুর ভালোবাসে। যা পুরোপুরি মিথ্যা।
মেহরীনকে আমি কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম, অন্য কারো মাধ্যমে।
অনেকদিন ধরে একা একা সিগারেট খাওয়া হচ্ছে। সিগারেটে সঙ্গ লাগে আমার, নাহলে নিকোটিনকে মনে হয় কাগজের ছোটো টুকরো। অ্যাপার্টমেন্টের গেটম্যান হাসিমকে ফোন দিয়ে সিগারেট খাবার টানার দাওয়াত দিলাম। সে দাওয়াত গ্রহণ করল তবে শর্ত একটাই সে আসবে রাত ১২ টার পর। তার স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলে। অগত্যা মেনে নিতে হলো।
মেহরীনের ডায়পার বদলে বেলকনিতে এসে বসলাম হাসিমকে নিয়ে। ও অন্য দারোয়ানদের মতো কথায় কথায় আমাকে স্যার বলে সম্বোধন করে না। আপনি সম্বোধন করে, খুব অল্প কথায় আমাকে সে সবসময় এড়িয়ে যায়।
সিগারেট ধরিয়ে হাসিমকে বললাম, স্ত্রীকে ভয় পান?
সে হাসল। হেসে বলল, “ভয় পাই না।
তাহলে?
বউয়ের অভ্যাস আমার গায়ে হাত দিয়ে ঘুমানো, কোলবালিশেও ঘুম আসে না তার, তাকে ঘুম পাড়িয়ে এলাম, ঘুম না আসলে তার প্রেশার বেড়ে যাবে “
আপনি বেশ ভালোবাসেন স্ত্রীকে, তাই না হাসিম ভাই?
– ভালোবাসি কি না জানি না তবে আমাকে ঘিরে থাকা তার অভ্যস্ততায় কোনো বাঁধা আসুক তা চাই না।
জিজ্ঞেস করলাম, অভ্যস্ততার যত্ন করাকে ভালোবাসা বলে না তবে?
হাসিম ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ভালোবাসার ভার অনেক। আমার স্ত্রীর সঙ্গে তো প্রায় আমি ঝগড়াঝাটি করি সামান্য বিষয় নিয়ে, দু’ তিনদিন তো কথাও বলি না এমন হয়। তার অপছন্দের কাজগুলো করে ফেলি মাঝেমধ্যে। সে কষ্ট পায় এতে।
তবে আপনার স্ত্রী পারে ভালোবাসতে । ভালোবাসার বড় গুণ হলো ক্লান্ত না হয়ে ভালোবেসে যাওয়া। আমি একটুতেই ক্লান্ত হবার লোক।
আমি অপ্রস্তুত বোধ করলাম। প্রশ্ন করলাম,” আমার স্ত্রী যে ক্লান্তহীনভাবে আমাকে ভালোবাসে সেটি কীভাবে বুঝলেন”?
– বোঝা যায়। আপনি আপনার স্ত্রীকে তেমন একটা ভালোবাসেন না। তবুও আপনার স্ত্রী মানুষকে বলে বেড়ায় আপনি তাকে অসম্ভব ভালোবাসেন ।
আপনার স্ত্রী খুব সুন্দর করে মিথ্যাও বলতে পারে না। তার মিথ্যা একজন বুদ্ধিমান লোক সহজেই ধরে ফেলতে পারে। আমিও কিছুটা বুদ্ধিমান প্রকৃতির। হা হা হা।
খানিকটা অপমানও বোধ হচ্ছে।
তবে প্রকাশ করা যাবে না। একটা সিগারেট ধরালাম।
হাসিম চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, মন খারাপ করবেন না। পৃথিবীতে মেয়েদের মতো প্রবল ভালোবাসার ক্ষমতা খুব কম পুরুষকেই আল্লাহ পাক দিয়েছেন। এ কারণেই মাতৃত্বর মতো বড়ো দায়িত্ব মেয়েদেরকে দিয়ে পাঠিয়েছেন উনি।
বুঝলাম হাসিমের সাথে তর্ক করার আর কিছু নেই আমার। পালাতে চাইলাম। চা বানানোর কথা বলে উঠে আসলাম ওর সামনে থেকে।
বেলকনি থেকে ঘরে পা দিতেই মেহরীনের মুখটার দিকে কী মনে করে তাকাতে ইচ্ছে করল। ক্লান্ত একটা মুখ, যে একলা ভালোবাসতে বাসতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। যে অভ্যস্ততাকে যত্নে আগলে রেখে আমার পাশে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকত। ইদানীং মেহরীনের মুখের দিকে তাকানোর সাহস হয় না আমার।
বেশিক্ষণ দাঁড়ালাম না।। ক্লান্ত পায়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝটপট দু কাপ চা করে ফিরে এলাম বেলকনিতে।
হাসিম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না, একটা প্রশ্ন করি?
-হু।
প্রায় দেখতাম বিভিন্ন বন্ধুরা আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যেত গেটের সামনে। উনাদের কাউকে দেখলাম না এ কয়েকদিন একবারও ।তারা জানেন না আপার এই অবস্থার কথা?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছোট্ট করে বললাম – “হু জানে”।
হাসিম চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে দিলো না। করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তারা আপনাকে ছাড়া বেশ আছে। আপনি তাদের আড্ডার মাঝে সালাদে ধনেপাতার মতো। থাকলে ভালো, না থাকলেও সমস্যা নেই।
কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। কেবল চায়ের কাপে চুমুক দেয়া ছাড়া আমার কিছুই বলার নেই হাসিমের সামনে।
হাসিম চায়ের কাপটা ফ্লোরে রাখল। মুচকি হেসে বলল, আমি আই.এ পাশ করা লোক। সামান্য জ্ঞান থেকে একটা কথা বলি?
-জি, বলেন।
আল্লাহ পাক আদম(আ.)-কে সৃষ্টির পর তার জন্য মাকে পাঠাননি, বাবাকে পাঠাননি, সন্তানকে পাঠাননি। কোনো বন্ধুকে পাঠাননি। পাঠিয়েছিলেন হাওয়া(আ.)-কে । যিনি তার বিবি ছিলেন।
একজন পুরুষের বন্ধু বা সাথী যাই বলেন না কেন, তার বিবির চেয়ে ভালো সাথী আর কেউ হতে পারে না বলেই আল্লাহ পাক জান্নাতেও স্বামীর সঙ্গী হিসেবে স্ত্রীকে দেবেন। যাদের বন্ধুবান্ধব ভেবে ঘর ছেড়ে থাকেন তাদের না কিন্তু। ঐ যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিল না –
“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু”।
হাসিমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে ইচ্ছে করল। মাথা নিচু করে বললাম, আমি কি খুব খারাপ মানুষ হাসিম ভাই?
হাসিম উত্তর দিল না।
মুখ তুলে আবার একই প্রশ্ন করলাম।
খেয়াল করে দেখলাম হাসিম ভাইয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। উনি উনার রাগটা দেখাতে চাইলেন না। চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কেমন সেই উত্তরে আমি যাব না। একটা বিষয়ে কেবল অনুরোধ করি,
“আমার ছোটো মেয়েটা পিৎজা-বার্গার খায় মাঝেমধ্যে, তবে সেটা প্রতিদিন না, প্রতিদিন খেলে সেটা তার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হবে না সেটা সে বোঝে। সম্পর্কেরও একটা স্বাস্থ্য আছে”।
হাসিম উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আজ আমি আসি। অনেক রাত হলো। ধন্যবাদ চায়ের জন্য।
আমি বিদায় জানাতে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম, সে মেহরীনের কাছে এসে দাঁড়িয়ে গেল। মেহরীনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, আপা অসুস্থ হওয়াতে আমি দুঃসাহসী হয়ে অনেক কথা বলে ফেলেছি, ক্ষমা করবেন স্যার।
হাসিমের মুখে স্যার সম্বোধনটা শুনতে চেয়েছি আগে বহুবার। হাসিম সেটা করেনি। একটু আগে তার করা স্যার সম্বোধন আমার ঠিক হজম হবে না অনেকদিন সেটা হাসিম কি জানে? হয়তো জানে।
হাসিম কয়েক পা বাড়িয়ে থেমে দাঁড়াল।
অনুনয়ের সুরে বলল, স্যার আর একটা কথা বলে যাই আপনাকে?
-জ্বি, বলুন।
আল্লাহ শয়তানকেও তওবা করার সুযোগ দিয়েছিল, সে তওবা করেনি। মানুষ আর শয়তানের মাঝে ফারাক তওবা করা আর না করার মাঝে।
এটুকু বলেই হাসিম হাঁটা শুরু করল।
হাসিম আর দাঁড়াল না। আমার পা চলল না তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেবার।
ফিডিং টিউব দিয়ে মেহরীনকে খাইয়ে, ডায়পার চেঞ্জ করে টুকিটাকি কাজ সেরে এসে দেখলাম মেহরীন ঘুমাচ্ছে।
ওর পাশে এসে শুয়েছি। খুব ইচ্ছে করছে ওর গায়ে হাত রেখে ঘুমাতে। কিন্তু হাত রাখলে বা নড়াচড়া করলে ওর ঘুম ভেঙে যেতে পারে, তাই সোজা হয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলাম। ঠিক যেমনটা মেহরীন করত।
চোখ গেল দেয়ালে টানিয়ে রাখা বিশাল ছবিটার দিকে। মেহরীনের আঁকা।
ছবিতে প্রথম চাঁদে পা দেয়া নীল আর্মস্ট্রং, এভারেস্টে পা রাখা এডমন্ড হিলারী আর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া ম্যাথিউ ওয়েবের ছবি। তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভি সাইন দেখাচ্ছে৷
এই ছবি আগেও দেখেছি আমি। তবে আজ নতুন করে চোখে পড়ল একটা জিনিস।
তাদের তিনজনের পায়ের নিচে থাকা বুনো ফুলগুলো মৃত ও শুকনো । তাদের পেছনের গাছে পাতা নেই, গাছগুলো সব মৃ’ত।
এক মুহুর্তেই ঘুম চলে গেল, মনটা কেমন ভারী হয়ে এলো। বিছানা থেকে নেমে এসে পর্দাটা সরিয়ে দিতেই চাঁদের আলো মেহরীনের মুখের উপর এসে পড়েছে, তাকে আজও অসম্ভব সুন্দর লাগছে চাঁদের আলোয়।
চেয়ারটা টেনে ওর পাশে এসে বসলাম।
মেহরীনের ঘুম ভেঙে গেছে। চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে সে কিছু একটা দেখছে। চাঁদের আলো? নাকি আমাকে?
মুগ্ধতা নিয়ে মেহরীনকে দেখছি। সাদামাটা চেহারা, আলো-আঁধারির কারুকাজ নেই, তবুও কত রোমাঞ্চ, বৈচিত্র্য আর রহস্য ঘন কালো ভ্রুতে, চোখের পাতায়!
চেয়ারটা টেনে মেহরীনের পাশে বসলাম। আমার কোথাও যাবার নেই বলেই নিশ্চুপ ও অসাড়ের মতো বসে রইলাম, নড়াচড়া করলেই হয়তো ঘুম ভাঙবে ওর।
না জেগে না ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় একটা স্বপ্ন দেখলাম – মেহরীন একটা ছবি এঁকেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো সতেজ বুনো ফুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ইংলিশ চ্যানেল, তার পাশেই হিমালয়, আর হিমালয়ের মাথায় ঝুলে আছে হলদে কুমড়োর মতো চাঁদ।
Collected









