আরব ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ: ইয়েমেন সংঘাত কি সৌদি আরবের গোত্রীয় রাজতন্ত্রের অন্তিম ঘণ্টা?
বিশ্ব রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত নাজুক ও সংকটময় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি সৌদি আরব কর্তৃক ইয়েমেনে সামরিক হামলা এবং তার জবাবে হুতি বিদ্রোহীদের প্রতিআক্রমণ পুরো আরব উপদ্বীপকে এক অগ্নেয়গিরির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইয়েমেনের একটি বিশেষ বিমানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের যে সূচনা, তা আজ কেবল দুটি প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যে বিমানে করে হুতি শীর্ষ নেতৃত্ব ইরানের ধর্মীয় নেতার জানাজায় অংশগ্রহণ শেষে ফিরছিলেন, সেটির ওপর হামলার ঘটনা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ ছিল না, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অক্ষ এবং ভারসাম্যকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই অনভিপ্রেত ও হঠকারী যুদ্ধ কি সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী গোত্রীয় রাজতান্ত্রিক শাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিচ্ছে?
সংঘাতের পটভূমি ও পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধ:
ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যবর্তী সংঘাতের শেকড় বহু গভীরে প্রোথিত হলেও সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এ সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তথাকথিত এই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে ইন্ধন জোগাচ্ছে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার অজুহাতে সৌদি আরবকে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে, যা কার্যত একটি ভূরাজনৈতিক ফাঁদ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই সত্যকেই আরও শক্তভাবে তুলে ধরে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে—সৌদি আরব ও হুতিদের এই আত্মঘাতী সংঘাত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো মুসলিম দেশের লাভ তো দূরের কথা, বরং একমাত্র ভূরাজনৈতিক ও সামরিক লাভবান হচ্ছে ইসরায়েল। বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল চেয়ে এসেছে আরব ও মুসলিম বিশ্ব যেন নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থেকে নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ক্ষয় করে। আজকের পরিস্থিতি ঠিক সেই ছকটিরই যেন হুবহু প্রতিফলন।
মক্কা চুক্তি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা:
এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো এর সম্ভাব্য ব্যাপ্তি। বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত ‘মক্কা চুক্তি’ বা আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বিন্যাসের সমীকরণে তুর্কি ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে কিংবা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতায় যদি পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার পরিণতি হবে অকল্পনীয়। এটি কেবল ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যকার সংকট থাকবে না; বরং তা এক প্রলয়ঙ্করী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে:
মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর একযোগে অস্থিতিশীল হওয়া: তুরস্ক-যা ন্যাটোর সদস্য ও শক্তিশালী অর্থনীতি,পাকিস্তান- যা একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, ইরান-যা আঞ্চলিক সামরিক শক্তি এবং সৌদি আরব-যা মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং মুসলমানদের ধর্মীয় কেন্দ্র একই সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: তেল সমৃদ্ধ এই অঞ্চল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম ধস নামবে, যা পুরো অঞ্চলের অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
এটিই তেল আবিব তথা ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক ব্লুপ্রিন্ট। মুসলিম বিশ্বের শীর্ষশক্তিগুলোকে একই সূত্রে অস্থিতিশীল ও দুর্বল করে রাখতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ফিলিস্তিন মুক্তিকামী আন্দোলনের চরম ক্ষতি:
ইয়েমেন সংঘাতের ফলে সবচেয়ে ভয়াবহ যে ধাক্কাটি আসবে, তা হলো ফিলিস্তিনের স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলন। গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী যে অমানবিক নিপীড়ন ও ভূমি দখলের শিকার হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিশ্ব মুসলিম জনমত ও আঞ্চলিক শক্তিসমূহের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই ছিল মূল শক্তি।
কিন্তু যখন মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি ও রসদ ফিলিস্তিন থেকে সরিয়ে ইয়েমেন, রিয়াদ, তেহরান বা আঙ্কারার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে, তখন ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতির পিছনের সারিতে চলে যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আরব রাজতন্ত্রগুলো যখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত থাকবে, তখন ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন আরও বেপরোয়া রূপ নেবে। ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন হয়তো চিরতরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, অথবা এতটাই শক্তিহীন হয়ে পড়বে যে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
গোত্রীয় রাজতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট ও পতন-সংকেত।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরবসহ গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলোর শাসনের মূল ভিত্তি ছিল—গোত্রীয় আনুগত্য, তেল থেকে অর্জিত বিপুল সম্পদ এবং পশ্চিমা সামরিক সুরক্ষা।
কিন্তু ইয়েমেন যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, আধুনিক যুগের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অপ্রথাগত যুদ্ধের সামনে ঐতিহ্যবাহী রাজতান্ত্রিক সামরিক সক্ষমতা কতটা ভঙ্গুর। হুতিদের মতো একটি অনিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়েও বিজয় লাভ করতে না পারা এবং উল্টো নিজেদের ভূখণ্ড ও তেল স্থাপনাকেন্দ্রকে ঝুঁকিতে ফেলা—রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকেই সামনে আনে।
১. জনগণের অসন্তোষ ও সামাজিক বিন্যাস: যুদ্ধ পরিচালনার বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে রাজতন্ত্রগুলোকে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপাতে হচ্ছে, যা গোত্রীয় রাজতন্ত্রগুলোর “তেল-ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র” এর মৌলিক প্রতিশ্রুতিকে ক্ষুণ্ণ করছে। সাধারণ মানুষের সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ হলে রাজপরিবারগুলোর প্রতি ঐতিহ্যবাহী আনুগত্য দ্রুত ক্ষয়ে যাবে।
২. যুব সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন: মধ্যপ্রাচ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ সমাজ আজ আর কেবল গোত্রপতি বা রাজপরিবারের নির্দেশে পরিচালিত হতে রাজি নয়। অর্থনৈতিক মন্দা ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের ভয়াবহতা তাদেরকে রাজতন্ত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে।
৩. নিরাপত্তা ব্যবস্থার পতন: যে রাজতন্ত্র এতদিন নিজেকে পুরো আরব বিশ্বের স্থিতিশীলতার প্রতীক বলে দাবি করত, তারাই আজ নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় অক্ষম প্রমাণিত হচ্ছে।উপসংহার: ইতিহাসের শিক্ষা ও রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, বাহ্যিক সামরিক শক্তি বা রাজকীয় জাঁকজমক দিয়ে কোনো শাসন ব্যবস্থা চিরস্থায়ী করা যায় না, যদি তার ভিত্তি হয় অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং হঠকারী বৈদেশিক নীতি।
সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ইয়েমেন আক্রমণ এবং এর আনুষঙ্গিক ভূরাজনৈতিক পরিণতি আরব ভূখণ্ডের শতাব্দী প্রাচীন গোত্রীয় রাজতান্ত্রিক শাসনের জন্য এক চূড়ান্ত বিপদসংকেত। আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সাথে সংঘাত এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পরিণতি রাজতন্ত্রগুলোর টিকে থাকাকে নিশ্চিত করার বদলে তাদের পতনকেই ত্বরান্বিত করবে।
যদি এখনই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম নেতৃত্ব প্রজ্ঞা, আত্মসংযম এবং দূরদর্শিতার পরিচয় না দেয়, যদি ইয়েমেন সংঘাতের মতো আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা না হয়, তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে—ইয়েমেনের এই সংঘাতই ছিল আরব ভূখণ্ডের জীর্ণ গোত্রীয় রাজতন্ত্রগুলোর সমাধি রচনার প্রথম ও প্রধান অনুঘটক। আর এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জয়ের হাসি হাসবে কেবলই মধ্যপ্রাচ্যের একক আধিপত্যকামী শক্তি—ইসরায়েল।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
মধ্যপ্রাচ্য ও শিক্ষা বিষয়ক কলাম লেখক।







