ঢাকা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ — বাংলা ব্যান্ড সংগীতের স্বর্ণালী যুগের কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘প্রমিথিউস’ (Prometheus)-এর সাবেক সদস্যদের এক আবেগঘন ও বর্ণিল পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গতকাল বনানীর আর্টিস্ট ক্লাবে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বা পূর্বনির্ধারিত আয়োজন ছিল না; বরং সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিকভাবে, হঠাৎ করেই জমে ওঠা এক প্রাণবন্ত আড্ডা। ব্যান্ডটির একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে এই দুর্লভ মিলনমেলায় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রমিথিউস বাংলা রক ও পপ সংগীতের ধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। দীর্ঘ চার দশকের সংগীতযাত্রায় ব্যান্ডটি প্রকাশ করেছে প্রায় ২০টি অ্যালবাম। ‘মিলনের রক্ত’, ‘নির্জন শালবনে’, ‘স্বাধীনতা চাই’, ‘মুক্তির প্রত্যাশায়’, ‘প্রজন্মের সংগ্রাম’, ‘যোদ্ধা’ ও ‘স্মৃতির কপাট’-এর মতো হৃদয়ছোঁয়া গানগুলো আজও বাংলাদেশের অডিও সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
মাত্র ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট রেজওয়ান দেশে ফেরায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আয়োজন করা হয় এই বিশেষ পুনর্মিলনী ও মধ্যাহ্নভোজের। ব্যান্ডের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিসের উদ্যোগে আয়োজিত এই আড্ডায় প্রমিথিউসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে ব্যান্ডটির সঙ্গে যুক্ত থাকা সাবেক সদস্যরা একত্রিত হন।
আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট রেজওয়ান, বেজিস্ট বুলবুল, ড্রামার কোয়েল, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার আনিসুজ্জামান আনিস এবং গিটারিস্ট অপু। এ ছাড়া কিবোর্ডিস্ট পল্লবের উপস্থিতি আড্ডার আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। তবে দেশের বাইরে অবস্থান এবং সময়ের ব্যবধানের কারণে অনলাইনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি ব্যান্ডের প্রধান ভোকালিস্ট বিপ্লব ও প্রতিষ্ঠাতা এবং লিড গিটারিস্ট আরিফকে। তাঁদের অনুপস্থিতি উপস্থিত সবার মনেই গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে।
মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে খোলামেলা আলাপচারিতার মূল আকর্ষণ ছিল ১৯৮৬ সালে ব্যান্ডটির শুরুর দিনগুলোর নানা অজানা গল্প, স্টুডিও সেশনের স্মৃতিচারণ এবং প্রমিথিউস গড়ে ওঠার পেছনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। স্মৃতিচারণের ফাঁকে বিপ্লব, আরিফসহ অনুপস্থিত অন্যান্য সহশিল্পীদের অবদানও গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
সময়ের ব্যস্ততা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রমিথিউসের সাবেক সদস্যরা এখন আর নিয়মিত এক ছাদের নিচে মিলিত হতে পারেন না। তবু তাঁদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক বন্ধন এবং সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা আজও অমলিন।
চার দশকের বন্ধুত্ব, স্মৃতিময় মুহূর্ত আর সুরের মায়ায় ঘেরা গতকালের এই পুনর্মিলনী যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল—সময় বদলায়, দূরত্ব বাড়ে, জীবনের ব্যস্ততা বাড়ে; কিন্তু সংগীতের বন্ধন কখনো পুরোনো হয় না। প্রমিথিউসের স্বতন্ত্র সৃষ্টিশীলতা, কালজয়ী গান এবং সংগীতকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্ব বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে চিরসবুজ হয়ে থাকবে।








