স্টাফ রিপোর্টারঃ
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পাকড়ি কলেজে চারজন ডেমোনেস্ট্রেটর বা প্রদর্শক নিয়োগে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বাইশ বছর আগের কল্পিত নিয়োগ দেখিয়ে সম্প্রতি তাদের এমপিও দেওয়া হয়েছে। এ কাজ করতে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় বডির সভাপতি। আর জাল নথিপত্রের তথ্য জেনেও এমপিও দিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার (মাউশি) রাজশাহীর পরিচালক অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর। অবশ্য এ জালিয়াতিকে বৈধতা দিতে তিনি নিয়েছেন মোটা অঙ্কের ঘুস এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।
এদিকে গত সোমবার স্থানীয়রা ডাকযোগে মন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়, চেয়ারম্যান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক), রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকড়ি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রদর্শক হিসাবে জুবায়ের হোসেন, ভূগোলের মোজাহারুল ইসলাম, জীব বিজ্ঞানের আব্দুল্লাহ আল মাসউদ এবং প্রকৌশল অংকনের আবুল কালাম আজাদকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে প্রথম মাসের বেতনও পেয়েছেন। এলাকাবাসীসহ কলেজের শিক্ষকরা বলছেন এমপিও প্রাপ্তরা আগস্ট মাস থেকে
কলেজে আসছেন ও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন। অথচ অধ্যক্ষের দাবি তারা ২২ বছর আগেই নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এমপিওভুক্ত হয়নি। এখন হয়েছে বলে কলেজে আসছেন। ব্যানবেইসে (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার) বছর বছর দাখিল করা কলেজের জনকাঠামোতে এদের কোনো তথ্য নেই। জালিয়াতিতে জড়িত অধ্যক্ষ, সভাপতি ও মাউশি পরিচালক বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যারা ২০২২ সালের আগে গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন এবং এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তাদের এমপিও দেওয়া হচ্ছে। পাকড়ি কলেজের এই চারজনকে ২০০৪ সালে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। কলেজ অধ্যক্ষ আবদুল গাফফারের দাবি এই চারজন বিএনপি করেন বলে বিগত সরকারের আমলে এমপিও পাননি।
সম্প্রতি সরেজমিন এলাকায় গিয়ে জানা যায়, গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা কলেজের সব শিক্ষক-কর্মচারীকেই এলাকার সবাই চেনেন ও জানেন। কিন্তু এ চারজনকে তারা আগে কোনোদিন কলেজে দেখতে পাননি-জানান এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা তো এখানেই পড়ে। সবাইকে চিনি। এদের আগে কখনো দেখিনি। অধ্যক্ষের পুরোনো কক্ষে ঝুলানো একটি বোর্ডে শিক্ষক-কর্মচারীদের নাম, পদ ও মোবাইল নম্বর লেখা আছে। সেখানে মোট ৪৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর নামের তালিকা থাকলেও নতুন চারজনের নাম নেই। মাউশির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এরা যদি ২০০৪ সালে নিয়োগ পেয়ে থাকেন তাহলে এমপিওভুক্ত না হলেও ২০১৫ সালে হওয়া অডিট প্রতিবেদনে তাদের তথ্য অবশ্যই উল্লেখ থাকত।
২০০৪ সালে তৎকালীন অধ্যক্ষ, সভাপতি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সপার্টসহ নিয়োগ কমিটির সদস্যদের নাম ও সীল স্বাক্ষর জাল করে এই চারজনকে নিয়োগ দেখিয়ে মাউশিতে এমপিওর জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়। কলেজেরই একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, এমপিওর আবেদন জমা করতে অন্তত ৩৫ ধরনের নথিপত্র লাগে। ২০০৪ সালে যারা নিয়োগ সংক্রান্ত দায়িত্বে ছিলেন তাদের প্রত্যেকের সীল স্বাক্ষর জাল ও স্ক্যান করে ফাইল জমা করা হয় অনলাইনে। হয়তো ওই সময়ের নিয়োগ কমিটির কেউ এখন আর বেঁচেও নেই। তদন্ত হলে সব জালিয়াতি বের হয়ে আসবে। অনেকেই বেঁচে আছেন। তাদের জিজ্ঞাসা করা হলে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি উদ্ঘাটন হবে।
এদিকে নতুন এমপিও পাওয়া প্রদর্শক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ দাবি করেন, তিনি ২০০৪ সালে নিয়োগ পান। ওই সময়ে কলেজের কোনো শিক্ষককে চেনেন কি না-জানতে চাইলে মাসউদ বলেন জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক শেখ রাশেদ আল মামুনকে চিনি। আমরা একসঙ্গেই চাকরিতে ঢুকেছি। তবে সহকারী অধ্যাপক রাশেদ মামুন বলেন, তিনি ২০০৪ সালে প্রদর্শক মাসউদকে কলেজে দেখেননি। আগে চিনতেনও না। এক মাস ধরে দেখছেন।
এমপিওভুক্ত হওয়া চার প্রদর্শক সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা এতদিন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এর মধ্যে জীববিজ্ঞানের প্রদর্শক মাসউদ চাকরি করতেন ফারইস্ট ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে। পদার্থবিজ্ঞানের প্রদর্শক জুবায়ের চাকরি করতেন বাংলালিংকের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। প্রকৌশল অংকনের আবুল কালাম আজাদ ছিলেন ব্র্যাকে এবং ভূগোলের মোজাহারুল ইসলাম ছিলেন বায়োফার্মাতে ম্যানেজার পদে। আগস্টে চাকরি ছেড়ে তারা কলেজে আসেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর পাকড়ি কলেজ থেকে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন। ২০০৪ সালে নিয়োগ পাওয়ার দাবি করলেও প্রকৌশল অংকনের প্রদর্শক আবুল কালাম আজাদ স্বীকার করেন ওই সময় যোগদান করলেও কলেজে আসেননি আগে। ওই সময়ের অধ্যক্ষের নামও তিনি জানেন না। ২২ বছর একদিনও কলেজে না এসে এমপিওভুক্তির বিষয়ে আজাদ বলেন, বেতন হয়নি। এ কারণে আসি নাই। এখন বেতন হওয়ায় আসছি। বাকিরাও স্বীকার করেন বেতন না হওয়ায় তারা কলেজে আসতেন না। আর জীবিকার প্রয়োজনে তারা ২২ বছর অন্যত্র চাকরি করেছেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, কয়েকমাস আগে এই চারজনের এমপিওভুক্তির আবেদন অনলাইনে জমা হয় মাউশির পরিচালক হুমায়ূন কবীরের কাছে। নিয়ম অনুযায়ী, তিনি সেটি ভেটিংয়ের জন্য সহকারী পরিচালক সাদিকুল ইসলামের কাছে পাঠান। সহকারী পরিচালক মতামতে লিখেছিলেন জনবল কাঠামোবহির্ভূত। এমপিওর প্রাপ্যতা নেই। এ মতামত দিয়ে ফাইলটি তিনি পরিচালককে পাঠিয়ে দেন। সাদিকুল আরও বলেন, তারা এমপিও পাবেন না বলে আমি মতামত দিয়েছিলাম। কিন্তু পরিচালক দিয়েছেন। তার সেই ক্ষমতা আছে। আমার মতামত মাউশির অনলাইন প্যানেলে রক্ষিত আছে। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, পাকড়ি কলেজের মতো গায়েবি এমপিও ইতোমধ্যে দিয়েছেন পরিচালক হুমায়ুন কবীর। আরও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন নজিরবিহীন এমপিওর ফাইল ইতোমধ্যে মাউশির রাজশাহীর আঞ্চলিক কার্যালয়ে জমা পড়েছে। দরদাম মিটলেই এমপিও দেবেন পরিচালক হুমায়ূন কবীর বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই চার প্রদর্শককে এমপিও দিতে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন পরিচালক হুমায়ূন কবীর বলে শোনা যাচ্ছে। কথা বলার জন্য গত বুধবার দুপুরে দপ্তরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে কয়েকদফা ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার মতামত পাওয়া সম্ভব হয়নি।#
Views: 20
Related