প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ মানসিক, বৌদ্ধিক ও সামাজিক বিকাশের মূল ভিত্তি। অথচ সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৃশ্যমান শিখন ঘাটতি শিক্ষা খাতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিখন ঘাটতির এই ব্যাপ্তি কিন্তু সব অঞ্চলে বা সব ধরনের বিদ্যালয়ে একরকম নয়—ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামোগত সুবিধা, সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং তদারকির ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে এর চিত্র বদলে যায়। গত ২-৪ আগস্ট ২০২৬-এ ‘রুম টু রিড’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)-এর যৌথ আয়োজনে ৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলা লেখা ও পড়ার উপর শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ের মধ্যমেয়াদী সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সেই সমীক্ষায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রতিনিধি হিসেবে সহকর্মী নাজমুন নাহার ( বিশেষজ্ঞ, এনসিটিবি)-কে সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা সদরের তিনটি ভিন্ন সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল প্রতিটি দলের। নেপ এবং রুম টু রিড -এর কর্মীগণও সমীক্ষা পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার শহরের বিদ্যালয় , শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম এবং দুর্গম চর অঞ্চলের—এই তিন ধারার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের আলোকেই মূলত এই সম্পাদকীয় মতামত লেখার প্রয়াস। পরিদর্শনে আমাদেরর সহযোগিতা করেছিলেন রুম টু রিড এর হাফিজুর রহমান, প্রদীপ দাস, নেপের মাহবুবুর রহমান, হাবিবুর রহমানসহ বড় একটি টিম।
পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বাস্তব শিখন পরিস্থিতি ও শিখন ঘাটতির কারণ অনুধাবন করা। পরিদর্শনে আমরা লক্ষ্য করি, আমার পরিদর্শন করা তিনটি বিদ্যালয়েই একটি সাধারণ ইতিবাচক দিক ছিল—সব স্কুলেই এমন কিছু শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে যারা বাংলা বর্ণমালা পরিচিতি এবং সাবলীলভাবে বাংলা বাক্য পড়তে এবং লিখতে পারে। কিন্তু গুণগত মান ও শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতার শতকরা হারে এলাকাভেদে ছিল বিশাল ও চোখ-ধাঁধানো ব্যবধান। আমার নিজের দল যে তিনটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে তার বিস্তারিত তথ্য নিম্নে তুলে ধরা হলো :
ক). বিদ্যাগঞ্জ ক্লাস্টারে কাউনিয়া যাদব্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (শহরের পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়): দৃশ্যমান ঘাটতি ও সম্ভাবনার অপমৃত্যু
পরিদর্শনের প্রথম ধাপে আমরা শহরের অদূরেই অবস্থিত একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে যাই। যার নাম কাউনিয়া যাদব্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ধারণাগতভাবে শহরের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে শিক্ষার মান তুলনামূলক ভালো হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব চিত্র ছিল ঠিক উল্টো। এখানে শিখন ঘাটতির হার ছিল সবচেয়ে বেশি এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান ছিল হতাশাজনক। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম ছিল এখানে। গভীর অনুসন্ধানে এর বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ বেরিয়ে এসেছে:
শিক্ষকদের দূরবর্তী বসবাস ও অনিয়মিত উপস্থিতি: এই বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই মূল শহরে বসবাস করেন। শহর থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছানো এবং নিয়মিত উপস্থিত থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শ্রেণিকক্ষে পঠন-পাঠনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
সক্ষম ও সচেতন পরিবারের বিমুখতা: এলাকার যেসকল পরিবার আর্থসামান্য সচেতন বা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী, তারা সন্তানদের গ্রামের এই সরকারি স্কুলে না পাঠিয়ে শহরের নামি-দামি বা প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। ফলে এখানে সুবিধা বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানদের উপস্থিতিই বেশি।
অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব: পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোর পিতামাতার মধ্যে সন্তানের শিক্ষার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা বা বাসায় পড়তে বসানোর সচেতনতা অত্যন্ত কম।
মিড ডে মিলের অনুপস্থিতি: বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবারের (মিড ডে মিল) কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসতে উৎসাহিত হয় না। ফলে উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম এবং ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি।
খ). চর ঝাওগড়া ক্লাস্টারে চর সিরতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (চর অঞ্চলের বিদ্যালয়): বৈরী পরিবেশেও ইতিবাচক আলোর ঝিলিক
দ্বিতীয় ধাপে আমাদের পরিদর্শন ছিল ময়মনসিংহ সদরের চরাঞ্চলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির নাম- চর সিরতা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভৌগোলিক দুস্ততা সত্ত্বেও শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিদ্যালয়ের তুলনায় এখানকার সামগ্রিক শিখন পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা তুলনামূলক ভালো পাওয়া গেছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও এই অপেক্ষাকৃত ভালো ফলের পেছনে প্রধানত কয়েকটি কারণ কাজ করেছে:
শিক্ষকদের স্থানীয়ভাবে বসবাস: চরাঞ্চলের শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করেন। ফলে বিদ্যালয়ে সময়মতো তাদের আগমন ও উপস্থিতি নিশ্চিত হয় এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের একটি আত্মিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীর প্রাচুর্য: চরাঞ্চলে আশেপাশের এলাকায় বিকল্প বা কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় কম থাকায় স্থানীয় সব শিশু এই একটি বিদ্যালয় কেন্দ্রিক হতে বাধ্য হয়, যার ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা : চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরর শিক্ষাদানে কিছুটা হলেও আন্তরিক মনে হয়েছে।
তবে চরাঞ্চলে শিক্ষার মানকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষ করে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা যদি দূর করা যেত, তবে চরাঞ্চলের এই বিদ্যালয়টি আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত। তাছাড়া মিড ডে মিল চালু করা জরুরি এসব বিদ্যালয়গুলোতে।
গ).নওমহল ক্লাস্টারে খাগডাহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (শহরের বিদ্যালয়): প্রত্যাশিত মান ও সহায়ক পরিবেশ
পরিদর্শনের শেষ ধাপে আমরা ময়মনসিংহ শহরের অভ্যন্তরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যবেক্ষণ করি। বিদ্যালয়টির নাম খাগডাহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে শিক্ষার গুণগত মান ছিল যথেষ্ট সন্তোষজনক ও প্রশংসনীয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নির্দিষ্ট শ্রেণিমূল্য অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে বল মনে হয়েছে । শহরের বিদ্যালয়টির এই অগ্রগতির মূল নেপথ্য কারণগুলো হলো:
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকবৃন্দ: শহরের বিদ্যালয়টিতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা মানসম্মত শিক্ষাদানে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
নিবিড় সরকারি নজরদারি: প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরিদর্শন দলের নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহিতা থাকার কারণে শিক্ষকগণ সর্বদাই দায়িত্বশীল থাকেন।
অভিভাবকদের উচ্চ সচেতনতা: এখানকার শিক্ষার্থীরা সচেতন পরিবারের সন্তান। পিতামাতারা নিয়মিত সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখেন এবং বিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা: বাসায় শিশুদের জন্য আলাদা পড়াশোনার পরিবেশ, গৃহশিক্ষক বা সহায়ক উপাদানের সুব্যবস্থা থাকায় শ্রেণিকক্ষের শিখন ঘাটতি তারা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারছে।
ঘ). শিখন ঘাটতি দূরীকরণে সুপারিশমালা
ময়মনসিংহ জেলা সদরের তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের বিদ্যালয় অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে এটি স্পষ্ট যে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। প্রাথমিক স্তরের শিখন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে নিম্নে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ ও সুপারিশ প্রস্তাব করা হলো:
১. শিক্ষকদের স্থানীয়ভাবে অবস্থান নিশ্চিতকরণ বা যাতায়াত সুবিধা: শহর থেকে দূরের বা গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তাদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে হবে অথবা কঠোর ডিজিটাল বায়োমেট্রিক উপস্থিতির পাশাপাশি তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে।
২. সর্বজনীন মিড ডে মিল চালু করা: যেসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেমন: শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও দুর্গম অঞ্চল, সেখানে অতি দ্রুত মানসম্মত ও পুষ্টিকর ‘মিড ডে মিল’ চালু করতে হবে। এটি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষ শিক্ষক বণ্টন: কেবল শহরের স্কুলেই নয়, বরং চরাঞ্চল ও দুর্গম গ্রামীণ স্কুলেও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও আনন্দদায়ক পাঠদানের ওপর দক্ষ শিক্ষক পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৪. অভিভাবক সমাবেশ ও সচেতনতা বৃদ্ধি: বিশেষ করে গ্রাম ও চর অঞ্চলে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ‘অভিভাবক সমাবেশ’ আয়োজন করে পিতা-মাতাদের সন্তানের শিক্ষার গুরুত্ব, বাসায় পড়ার পরিবেশ তৈরি এবং নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
৫. প্রশাসনিক নজরদারি ও পরিদর্শন জোরদারকরণ: শহরের মতো গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতেও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে হঠাৎ পরিদর্শন ও নিয়মিত নিবিড় নজরদারি জোরদার করতে হবে।
৬. পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রেমেডিয়াল ক্লাস: শ্রেণিকক্ষে পরিদর্শনের ভিত্তিতে যেসকল শিশুর চরম শিখন ঘাটতি চিহ্নিত হবে, তাদের জন্য নিয়মিত পাঠদানের বাইরে অতিরিক্ত ‘রেমেডিয়াল’ বা নিরাময়মূলক বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করতে হবে।
ময়মনসিংহের তিন অঞ্চলের চিত্র আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেয় যে, শিক্ষার সুযোগ ও মানবসম্পদ বণ্টনে সামান্য মনোযোগ দিলেই প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের শিখন ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব। চরাঞ্চলের ইতিবাচকতা যেমন আমাদের আশাবাদী করে, তেমনি শহরের পাশের স্কুলের সীমাবদ্ধতা আমাদের নীতি-নির্ধারণী দুর্বলতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। গুণগত ও ইক্যুইটি-ভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রীয় নজরদারি, দক্ষ শিক্ষকের বণ্টন এবং স্থানীয় চাহিদার আলোকে কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তবেই প্রতিটি শিশু তার ভৌগোলিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান ও মানসম্মত শিক্ষায় আলোকিত হতে পারবে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
গবেষণা কর্মকর্তা,
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।






