একটি দেশের শক্তির ভিত্তি আসলে তার মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতর লুকিয়ে থাকে। আপনি যে নিয়মকানুন মেনে চলা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতার কথা বলবেন বা ভাববেন—এগুলো সত্যিই যেকোনো সমাজকে টিকিয়ে রাখার মূল জ্বালানি। এই মাপকাঠিতে যখন আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবি, তখন একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে।
আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হওয়ার কথা ছিল এর তরুণ জনশক্তি এবং মানুষের যেকোনো সংকটে ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই শক্তির জায়গাটাই আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি, যার কারণে মনে হয় যে শক্তির মূল ভিত্তিটাই যেন নিখোঁজ। এর কারণ হলো, আমাদের সমাজে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিকে আমরা প্রায় মেরুদণ্ডহীন করে ফেলেছি। ছোটবেলা থেকে পরিবার, বিদ্যালয় কিংবা সমাজ—কোথাও উগ্র বাধ্যতার বাইরে গিয়ে ‘কেন’ বা ‘কীভাবে’ জিজ্ঞেস করার অধিকারকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয় না। যখন একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রশ্ন তুলতে ভয় পায় বা উত্তরের দাবি জানাতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়, তখন প্রগতিশীল চিন্তা কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতা স্রেফ বইয়ের পাতায় আটকে থাকে। ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে এতটাই দুর্বল যে, আলাদা চিন্তা মানেই সেখানে এক ধরনের শত্রুতা তৈরি হয়। নিয়মকানুন ভাঙাটাই যেখানে এক ধরনের বীরত্ব হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আইনের শাসন বা নিয়মানুবর্তিতা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
এই সব সীমাবদ্ধতার দিকে তাকালে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কখনোই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারবে না। এই আশঙ্কার পেছনে খুব জোরালো কিছু যুক্তিও আছে। প্রথমত, মেধার অবমূল্যায়ন এবং তীব্র ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচার। দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং বিজ্ঞানমনস্ক তরুণরা যখন দেখে এখানে ভিন্নমতের জায়গা নেই, মেধার চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব বেশি, তখন তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একটি দেশ তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান মস্তিষ্কগুলোকে ধরে রাখতে না পারলে কোনোদিনই শক্তিশালী হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এটি এখনো মুখস্থনির্ভর এবং অনুগত নাগরিক তৈরির কারখানা হিসেবে কাজ করছে, যা মুক্তচিন্তা বা গবেষণাকে উৎসাহিত করে না। এর ওপর যোগ হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকড়, যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগুলোকে ভেতর থেকে ফাপা করে দিচ্ছে। যেখানে মৌলিক অধিকার বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াগুলোই ভাঙা, সেখানে একটি রাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে কীভাবে?






