মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতিতে প্রতিনিয়ত নতুন মেরুকরণ ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটোভুক্ত শক্তিশালী সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের যৌথ সামরিক জোট গঠনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এই ত্রিদেশীয় অক্ষকে ‘ইসলামি ন্যাটো’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে অভিহিত করছেন। বাহ্যিকভাবে এটিকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কৌশল হিসেবে মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণের আলোকেও প্রশ্ন উঠে আসে—এটি কি সৌদি আরবের নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, নাকি আরেকটি অদূরদর্শী ভূরাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত?
ক). তুরস্ক ও পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ: নিজস্ব স্বার্থের নিখুঁত সমীকরণ
যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক জোটে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব স্বার্থ যুক্ত থাকে। এই নবগঠিত ‘ইসলামি ন্যাটো’তে তুরস্ক ও পাকিস্তানের যোগদান এবং সক্রিয় অবস্থান তাদের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক।
প্রথমত, তুরস্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি ও সামরিক তৎপরতার কারণে আঙ্কারা নিজেকে পরবর্তী সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য বা হুমকির মুখে দেখতে পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক জোটে থাকা তুরস্ককে এক ধরনের বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত নিরাপত্তা প্রদান করে। পাশাপাশি, সৌদি আরবের অঢেল অর্থনৈতিক প্রাচুর্য তুরস্কের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের জন্য এই জোট এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আশীর্বাদ। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। সৌদি আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে যেমন সুরক্ষা দেবে, তেমনি সামরিক খাতের আধুনিকায়নে নতুন অর্থায়নের পথ খুলে দেবে। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক পরাশক্তিগত লড়াইয়ে পাকিস্তানের বহুমুখী সুবিধা অর্জন।
ভারত কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে তার বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলতে চাইবে না। মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের লাখ লাখ প্রবাসী জনশক্তির কর্মসংস্থান রয়েছে, যা থেকে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, শক্তি নিরাপত্তা ও বৃহৎ বিনিয়োগ। ফলে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সমন্বয়ে গঠিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক বা কূটনৈতিক সংঘাতের পথে যাওয়া ভারতের জন্য চরম জটিল হবে। পাকিস্তান ঠিক এই জায়গায় সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে ভারতবিরোধী ঢাল হিসেবে ব্যবহারের বড় সুযোগ পাবে।
খ). সৌদি আরবের প্রাপ্তি ও হিসাবের কষাঙ্ক
প্রশ্ন হলো, এই ত্রিদেশীয় জোটে সৌদি আরবের আসল লাভ কী?
সৌদি আরব সম্ভবত ধারণা করছে যে, ভবিষ্যতে যদি তারা কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তি বা রাষ্ট্রীয় কিংবা অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে এবং রিয়াদকে সুরক্ষা দেবে।
কিন্তু বাস্তব ভূরাজনীতি ও ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ শেষ পর্যন্ত নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। পাকিস্তান বা তুরস্ক নিজেদের কৌশলগত জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ সংকট এড়িয়ে সৌদি আরবের মাটিতে অন্য কোনো শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমনটা ভাবা অনেকটাই অতি-সরলীকরণ।
গ). অতীত ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা: মার্কিন ঘাটির তেতো অভিজ্ঞতা
আজকের সৌদি আরবের সামরিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত নির্ভরতা মূলত অতীতের একই ধরনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফসল।
নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করার আশায় সৌদি আরব তার মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটি স্থাপনের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক স্বার্থে এবং আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়নে এই ঘাটিগুলো ব্যবহার করেছে। পরবর্তীতে যখন ইরানি মূল ভূখণ্ড ও মার্কিন মিত্রদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়, তখন ইরান বাধ্য হয়েই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। কারণ ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাটি থেকেন যখন ইরানেবল হামলা করা হয় তখন ইরান সেসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাটিকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। একই সাথে আরব মিত্র দেশগুলো যেন যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেয় সে আশায় অন্যান্য অবকাঠামোও টার্গেটে পরিণত হয়। তখন এর খেসারত দিতে হয় রিয়াদকে—সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্ষেত্র ও অবকাঠামো হামলার মুখোমুখি হয় এবং বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সৃষ্টি হয়।
আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই মিত্রদের ভূখণ্ড ব্যবহার করলেও সংকটের মুহূর্তে প্রপ্রার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রদান করেনি। বরং সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে ইসরায়েলের সুরক্ষায়। ফলে সৌদি আরবের মতো তথাকথিত ওয়াশিংটন-মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অকারণে ও অহেতুক যুদ্ধের আগুনে পুড়তে থাকে।
ঘ). ‘ইসলামি ন্যাটো’: আত্মনির্ভরতার বিকল্প নাকি নতুন ফাঁদ?
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্ধ নির্ভরতা যেমন সৌদি আরবকে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা দিতে পারেনি, তেমনি নতুন ‘ইসলামি ন্যাটো’ গঠনেও সৌদি নিরাপত্তার গ্যারান্টি কতটুকু মিলবে, তা নিয়ে জোরালো সন্দেহ থেকে যায়।
তুরস্ক কিংবা পাকিস্তান—উভয় রাষ্ট্রেরই নিজস্ব বৈশ্বিক অগ্রাধিকার, পররাষ্ট্রনীতির বাধ্যবাধকতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তির কাগজে ভরসা করে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বাস্তবমুখী ও টেকসই সিদ্ধান্ত হতো—অন্য কোনো দেশের ওপর প্রতিরক্ষা নির্ভরতা না বাড়িয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া।
ঙ). জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে সৌদি আরব
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরান বা ইসরায়েল থেকে পিছিয়ে রয়েছে সৌদি আরব। এটা সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাধা হতে পারে।
চ). ইসরায়েলের সাথে মিত্রতার ভুল সমীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সৌদি আরব ইসরায়েলের সাথে বহুমাত্রিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। এ সম্পর্কের পিছনে কলকাঠি নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, তাতে সন্দেহ নেই। তবে ইসরায়েলের সাথে সৌদি আরবের এ সম্পর্ক সব সময় জটিল একটি ঝুকিপূর্ণ ফাঁদ হিসেবেই দেখা হবে। কারণ ইসরায়েলের লক্ষ ও উদ্দেশ্যের সাথে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মিত্রতা বাস্তবসম্মত নয়। এ সম্পর্ক ইসরায়েলের জন্য শত্রু দিয়ে শত্রু দমনের মতো। ইসরায়েলের লক্ষ হলো অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করতে পারলে সৌদি আরবকেও নির্মূল করবে। ইসরায়েল শুধু সময়ের অপেক্ষায়, সুযোগ পেলে কাল বিলম্ব করবে না লক্ষ পূরণের জন্য।
পরিশেষে বলা যায় যে, সৌদি আরবের অসীম অর্থনৈতিক সম্পদ ও অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে। বিদেশি সামরিক চুক্তির পেছনে বিপুল অর্থ ঢালার চেয়ে যদি তারা একটি সুসংগঠিত, আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক দেশীয় সামরিক শিল্প রূপায়ণে মনোযোগ দিত, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটিকে সত্যিকার অর্থে সুরক্ষিত করত। অস্ত্র আমদানিকারক থেকে নিজ মাটিতে প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন ও প্রযুক্তির হস্তান্তর সুনিশ্চিত করাই হতো যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ।
ভূরাজনীতি অত্যন্ত নির্মম এবং বাস্তবভিত্তিক। আস্থার ওপর ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনা বা সামরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। তুরস্ক ও পাকিস্তান এই জোটের মাধ্যমে তাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ শতভাগ কাজে লাগাবে। অন্যদিকে সৌদি আরব যদি কেবল অন্যদের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করে নিজের নিরাপত্তা কেনার স্বপ্ন দেখে, তবে ইতিহাস আবারও রিয়াদকে মার্কিন ঘাটি ট্র্যাজেডির মতো নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক ভুলের সম্মুখীন করতে পারে। ‘ইসলামি ন্যাটো’র মাধ্যমে নিরাপত্তা খোঁজার চেয়ে নিজের সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করাই সৌদি আরবের জন্য একমাত্র টেকসই ও বুদ্ধিদীপ্ত পথ।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।








