রংপুর ব্যুরো: তামাক চাষের উর্বর ভ‚মি নামে পরিচিত রংপুর অঞ্চলের জেলা সমুহ কালের বিবর্তনে আলু চাষের অঞ্চল নামে পরিচিত লাভ করলেও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ হচ্ছে। যাদের জমি নেই তারা অন্যের জমি চুক্তিভিত্তিক চাষ করছে। এমন একজন কৃষক আনোয়ার হোসেন। একসময় অন্যের জমিতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে আয় রোজগার করলেও এখন কলার বাগান করে ভাগ্য বদলে গেছে তার। তার মতো অনেক কৃষক এখন কলা চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে কলা চাষে ভাগ্য বদলানোর সুযোগ থাকলেও সংরক্ষণে বিশেষায়িত হিমাগার না থাকা ও ফড়িয়া সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কাঙ্খিত দাম পাচ্ছে না কৃষকেরা। তারপরও মাটি ও আবহাওয়ার অনুক‚লের কারণে রংপুর অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের তকেয়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, কলা চাষ করে আমাদের ভাগ্য বদলানোর সুযোগ আছে। আবার কিছু কারণে সমস্যাও রয়েছে। যখন একসাথে অনেক কলা কাটি, তখন কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। একটু দেরি হলেই কলা নষ্ট হতে শুরু করে। এতে আশানুরূপ লাভ হয় না। তবে কলা চাষে অল্প খরচে ভালো আয় করা সম্ভব।
রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলার কৃষি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে কিংবা বাড়ির পাশে খালি জায়গাতেও এখন দেখা মেলে কলাগাছ। কোথাও আবার কলাগাছের বড় বড় বাগান। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকদের মাঝে কলা চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ছে। কলা চাষিদের মতে, এ অঞ্চল কলা চাষের উপযোগী। এখানকার কলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। তবে সঠিক সংরক্ষণাগার ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে, যা সম্ভাবনাময় খাতের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে এই অঞ্চলের কলা।
রংপুর ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলায় কমবেশি কলা চাষ হচ্ছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় সাগর, মালভোগ, চিনি চ¤পা ও মেহের সাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলা চাষ হচ্ছে।
চাষিরা বলেন, একবার কলাগাছ রোপণ করলে সেখান থেকে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। অল্প পুঁজিতে ও কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও এখন কলা চাষে ঝুঁকছে। তবে বিপত্তি ঘটছে ফসল কাটার পর। কলা একটি দ্রæত পচনশীল ফল হওয়ায় ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করার পর দ্রæত বাজারে বিক্রি করতে না পারলে তা পচে যায়।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ৪ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে কলা চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল ১ লক্ষ ১২ হাজার ৩৫৭ মেট্রিকটন। ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল উৎপাদন হয় আম। যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৮৫ হেক্টর জমির বিপরীতে ৭০ হাজার ৭০ টন। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রংপুর জেলায় ২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ৮৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন, গাইবান্ধা জেলায় ১ হাজার ১৮৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৮৭০ টন, কুড়িগ্রাম জেলায় ৪০৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৮৬০ টন,
লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৭ হাজার ২০০ টন এবং নীলফামারী জেলায়
৩২৩ হেক্টর জমিতে কলা উৎপাদন হয় ১২ হজার ১৫৭ টন। ওই পাঁচ জেলায় মোট ৪ হাজার ৩৫৬ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ২২৭ মেট্রিক টন। ওই বছরে ৫ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির বিপরীতে আম উৎপাদন হয়েছিল ৬৯ হাজার ৭৭৪ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই পাঁচ জেলায় ৪ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন। এরমধ্যে রংপুর জেলায় ২ হাজার ২৬০ হেক্টর জমির বিপরীতে উৎপাদন হয় ৮৮ হাজার ১৪০ টন, গাইবান্ধায় ৭৪৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১১ হাজার ৯৩ টন, কুড়িগ্রামে ৪৯৬ হেক্টর জমির বিপরীতে ১৭ হাজার ৮৭০ টন, লালমনিরহাট জেলায় ১৮০ হেক্টর
জমির বিপরীতে ৭ হাজার ৪৭৭ টন এবং নীলফামারী জেলায় ৩৯৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৩৩৬ টন। ওই বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফল আম ৫ হাজার ৮০৮ হেক্টর জমিতে চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ৫৬৪ টন।
এদিকে, দিনাজপুরের, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলাতেও প্রতিবছর তিন হাজার থেকে সাড়ে হাজার হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। এসব কলা দিনাজপুরের দশমাইল, রংপুর- ঢাকা মহাসড়কের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জের ফাঁসিতলা হাটে প্রতিদিনই কয়েক কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।
রংপুর অঞ্চলে কলার বা¤পার ফলন হলেও এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কলার প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে কলা থেকে চিপস, জুস বা গুঁড়ো তৈরির মতো কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও প্যাকেজিংয়ের অভাবের কারণে ক্ষেত থেকে কলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বাজারে পাঠানোর সময় একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে চাষিদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে কলা ক্রয় করে নেয়। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনি করেও কৃষকরা তাদের কাঙ্খিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার পাইকানটারী গ্রামের কলা চাষি সাজু মিয়া বলেন, এক বিঘা (২৭ শতাংশ) জমিতে উৎপাদন খরচ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ওই পরিমাণ জমিতে ৩০০টি চারা লাগানো যায়। কলা ভালো হলে এক গাদি কলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে এক বিঘা জমিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। রোজার সময় হলে দাম আরও বেশি হয়। সাজু বলেন, তবে কলা একটি দ্রæত পচনশীল পণ্য। গাছ থেকে পাড়ার পর বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। যদি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা লাভ করা সম্ভব হতো। একই গ্রামের কৃষক মোজা মিয়া জানান, বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষ লাভজনকভাবে ধরে রাখার জন্য একটি চারা রোপণ করে তা থেকে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ বার (একবার মূল গাছ থেকে এবং পরে ১-২ বার মুড়ি ফসল থেকে) ফল নেওয়া হয়। এরপর পুরো বাগান উপড়ে ফেলে নতুন করে আবার চারা লাগাতে হয়। কারণ ৩ বারের পর কলার আকার ছোট হয়ে যায় এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ অনেক বেড়ে যায়।
কলা চাষিদের মতে, উন্নতমানের বিশেষায়িত প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং সংরক্ষণের টেকসই ব্যবস্থা থাকলে এই অঞ্চলের কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো। কিন্তু এসব না থাকায় হাট বাজার শুরু করে সবখানে ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট চক্রের কাছে অসহায় চাষিরা। তাদের দাবি, হাট কিংবা বাজারের কাছাকাছি বিশেষায়িত কালেকশন সেন্টার গড়ে উঠলে কিছুটা হলেও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমবে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কলাচাষি আনিছুর রহমান বলেন, সাধারণত এই অঞ্চলে গাছ থেকে কলা পাড়ার পর তা পাকলে আমরা খাই। অথবা কাঁচাকলা তরকারি হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু এর বাইরে কলার যে বহুমুখী ব্যবহার সেটা করতে পারি না। এর অন্যতম কারণ হলো, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা না থাকা। ফলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলাচাষিরা আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভবান হতে পারছি না। আনিছুর রহমান বলেন, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের দিক বিবেচনা করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি প্রতিটি বড় কলার হাটের কাছাকাছি হিমাগার বা বিশেষায়িত কালেকশন সেন্টার গড়ে তোলা যায়, তবে কলা চাষে বিপ্লব ঘটে যাবে। এতে শুধু যে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন তা নয়, ভোক্তারাও সারা বছর জুড়ে রাসায়নিকমুক্ত, ফ্রেশ কলা পাবেন ন্যায্য মূল্যে।
ব্যবসায়ী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুর অঞ্চলে কলার আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারে।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট এমদাদুল হোসেন বলেন, শুধু কলা নয়, এই অঞ্চলের আম, লিচু, কাঁঠালসহ অন্য যেকোনো ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। টেকসই উন্নয়নে এই অঞ্চলে আলাদা শিল্প নীতি গ্রহণ করতে হবে। কলা চাষিদের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, কলা সংরক্ষণের জন্য উপযোগী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হিমাগার তৈরি করা, কলা থেকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তৈরির প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন, সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে বড় বড় চেইন শপের সংযোগ তৈরি করে দেওয়া, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়ানো যায়, আধুনিক উপায়ে কলা কাটা, প্যাকেজিং এবং প্রাকৃতিক উপায়ে কলা পাকানোর বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে এই কলা জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, কলা এমন একটি চমৎকার ফল যা কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই নানা পদের সুস্বাদু খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। কাঁচা কলা যেমন পুষ্টিকর সবজি, তেমনি পাকা কলা দিয়ে তৈরি করা যায় চমৎকার সব ডেজার্ট ও ¯œ্যাক্স। তিনি আরও বলেন, কলার মোচা পরিষ্কার করে কেটে আলু ও মশলা দিয়ে নিরামিষ তরকারি বা মাছ দিয়ে ঘণ্ট রান্না করা যায়, যা আয়রনের দারুণ একটি উৎস। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি উদ্যোগের সঠিক সমন্বয় ঘটলে রংপুর অঞ্চলের কলা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।







