ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীতে যত বড় বড় পরিবর্তন বা বিপ্লব এসেছে, তার পেছনে কোনো না কোনো মহান লেখকের কলম অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবখানেই অবিনাশী শব্দের শক্তি তরবারির চেয়েও ধারালো প্রমাণিত হয়েছে। তাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়, লেখক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ কলমই হচ্ছে সমাজ ও সংসারকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে বড় শক্তি।
একজন লেখক কেবল চারপাশের ঘটনার বিবরণ দেন না, বরং তিনি সমাজের নীরব দর্শকও নন। তিনি সমাজের ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকারকে নিজের অন্তরে ধারণ করেন। সমাজ যখন কোনো অন্যায়, কুসংস্কার বা নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়, তখন লেখকের কলমই প্রথম গর্জে ওঠে। শব্দের বুননে তিনি সমাজের ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করেন এবং তা নিরাময়ের পথ দেখান। সাহিত্য বা লেখার শক্তি মানুষের অবচেতন মনকে স্পর্শ করে, যা রাতারাতি না হলেও ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতায় এক বিশাল ইতিবাচক রূপান্তর এনে দেয়।
বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির জোয়ারে আমাদের সমাজ ও সংসারে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব এবং অস্থিরতা গ্রাস করছে তরুণ প্রজন্মকে। এই ক্রান্তিকালে লেখকদের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন দায়িত্বশীল লেখক তার রচনার মাধ্যমে সমাজকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান। তিনি যেমন একদিকে শোষিতের পক্ষে কথা বলেন, ঠিক অন্যদিকে সংসারের ভাঙন রোধে মানবিক ও পারিবারিক সুসম্পর্কের জয়গান গান।
যে কলম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে, সেই কলমকে কোনো অন্যায্য শক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। লোভ-লালসা বা ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে একটি সুন্দর ও সুস্থ পথ দেখানোই লেখকের মূল ধর্ম। প্রতিটি কালির আঁচড়ে যখন একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন বোনা হয়, তখনই কলমের প্রকৃত সার্থকতা প্রকাশ পায়। কলম সচল থাকুক প্রগতির পক্ষে, শুভ বোধের পক্ষে—তবেই আমাদের সমাজ ও সংসার সুন্দর হয়ে উঠবে।
ছামিউল আলম রাসু
সাংবাদিক, লেখক









