‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’ বার্তা নিয়ে কৈখালী থেকে শাহপরীরদ্বীপ
কক্সবাজার থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি
জলবায়ু ন্যায়বিচার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ পানি ও টেকসই ভবিষ্যতের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে ২২ দিনে ৭৮৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ হয়েছে ব্যতিক্রমী ও দুঃসাহসিক বাংলাদেশ কোস্টাল ট্রাভার্স অভিযান।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালী পাঁচ নদীর মুখ থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান শেষ হয়েছে ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টায় কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপের ঘোলারচরে। ২২ দিনের এই অভিযানে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি উপকূলীয় জেলা অতিক্রম করা হয়েছে।
‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’ শীর্ষক মাসব্যাপী ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এ অভিযানের যৌথ আয়োজক ছিল ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশন। সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্ত ছিল আরও ৩৫টি সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন।
অভিযানে নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এবং বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাসফিকুল হাসান টনি। দীর্ঘ এই পদযাত্রার মাধ্যমে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশগত সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
১৬৫ কিলোমিটার সুন্দরবন, উত্তাল নদী ও দুর্গম পথ
আয়োজকদের মতে, এ অভিযানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম দুঃসাহসিক ও বৈচিত্র্যময় একটি উপকূলীয় রুট তৈরি হয়েছে। পুরো অভিযানে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
অভিযানের সময় উপকূলে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত থাকাকালে অতিক্রম করতে হয়েছে উত্তাল তেঁতুলিয়া ও মেঘনা নদী। পাশাপাশি শিবসা, বলেশ্বর, বিষখালী, আন্দারমানিক, রামনাবাদ ও মহেশখালী চ্যানেলসহ বিভিন্ন নদী-নালা পাড়ি দিতে হয়েছে।
কখনো হাঁটতে হয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে, কখনো মহেশখালীর পাহাড়ি পথে। আবার মীরসরাই-সীতাকুণ্ড উপজেলার বেড়িবাঁধসংলগ্ন জঙ্গলপথও অতিক্রম করতে হয়েছে। কোথাও ছিল পাথুরে ও কাদামাটির পথ, কোথাও ঘন জঙ্গল, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ চর ও সমুদ্রতীর।
অভিযানের পথে সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল ও উপকূলীয় জনপদের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সুন্দরবনের গভীর সবুজ থেকে উত্তাল নদী, পাহাড় ও সমুদ্র—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের উপকূলের বহুমাত্রিক রূপ উঠে এসেছে এই অভিযানে।
পথজুড়ে নাগরিক সংহতি
অভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ও পরিবেশবাদী কর্মীরা সংহতি জানিয়েছেন। মোংলা, তালতলী, কলাপাড়া, বাঁশখালী, পেকুয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, হিমছড়ি ও টেকনাফে নাগরিক সংগঠন এবং আয়োজক ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর আঞ্চলিক প্রতিনিধি ও সদস্যরা নানা আয়োজনের মাধ্যমে অভিযানের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
এসব কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে উপকূল রক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, নিরাপদ পানি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা ও জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়। ফলে পদযাত্রাটি কেবল একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিযান না হয়ে বিভিন্ন এলাকার নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি বৃহত্তর পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রচারণায় রূপ নেয়।
‘Renewables Now’—নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই
অভিযানের অন্যতম প্রধান বার্তা ছিল ‘Renewables Now’—নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই। আয়োজকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানি নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য সমাধান এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিও এ ক্যাম্পেইনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
একটি পথ, অনেক বার্তা
২২ দিনের এই অভিযানে ৭৮৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম শুধু একটি দূরত্বের হিসাব নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের উপকূলের প্রকৃতি, মানুষ, নদী, বন, পাহাড় ও সমুদ্রের বাস্তব চিত্র।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, উত্তাল নদী, দুর্গম জঙ্গল, পাহাড়ি পথ, দীর্ঘ মহাসড়ক এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও অবিচল থেকে অভিযানটি সম্পন্ন করা হয়েছে। টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে শেষ হলেও এর মূল বার্তা—জলবায়ু ন্যায়বিচার, নিরাপদ পানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার—এখনও চলমান।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই অভিযান উপকূলীয় পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ভূমিকা রাখবে।
কৈখালী থেকে শাহপরীরদ্বীপ—২২ দিনে ৭৮৩ কিলোমিটারের এই পথচলা তাই কেবল একটি অভিযান নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূল, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই পৃথিবীর আহ্বান।









