আমার স্ত্রী কক্সবাজার থেকে একা ঢাকা ফিরে গেছে। ভোর ছয়টার বাসে। টিকিটটা কেটেছিল আগের রাতেই, মোবাইলে, আমাকে না জানিয়ে।
আমি টের পেয়েছি সকাল আটটায়। ঘুম থেকে উঠে দেখি রুমে ও নেই, ওর ব্যাগটাও নেই। ফোন বন্ধ। হোটেলের রিসেপশনে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ভোরে একটা মেয়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেছে। দুপুরে ফোন অন হলো। একটা মেসেজ: “আমি বাবার বাসায় পৌঁছেছি। আনতে এসো না। আমার সময় লাগবে।”
বিয়ে হয়েছে দুই মাস। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম তিন রাতের জন্য — আমি, আমার স্ত্রী, আর আমার মা।
মাকে নেওয়ার কথাটা স্ত্রীই বলেছিল। মা সারাজীবনে সমুদ্র দেখেননি। বাবা মা’ রা গেছেন ছয় বছর হলো। মা আমার সঙ্গেই থাকেন — মানে আমরা থাকি মায়ের ফ্ল্যাটে, বিয়ের পর স্ত্রী এসে উঠেছে ওই ফ্ল্যাটেই। স্ত্রী বলেছিল, “মাকেও নিয়ে চলুন। উনি খুশি হবেন।” মা সত্যিই খুশি হয়েছিলেন। বাসে ওঠার পর থেকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন বাচ্চাদের মতো।
দোষটা মায়ের না। দোষটা আমার তিনটা ছোট ছোট সিদ্ধান্তের।
এত ছোট যে তখন চোখেই পড়েনি।
প্রথম সিদ্ধান্তটা রুম নিয়ে। দুইটা রুম নিলে তিন রাতে বাড়তি প্রায় আট হাজার টাকা যেত। আমি ঢাকায় প্রাইভেট চাকরি করি, বেতন আটচল্লিশ হাজার। হিসাব করে আমিই বললাম, “একটা বড় রুম নিই, চলবে।” স্ত্রী তখন কিছু বলেনি। পরে বলেছে, “তখন বললেও লাভ হতো না। তুমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে।” কথাটা মিথ্যা না।
দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটা শোয়া নিয়ে। রুমের খাটটা ছোট। মায়ের কোমরে ব্যথা আছে, তিনি ফ্লোরে শুতে পারেন না — এটা সত্যি, নাটক না। প্রথম রাতে স্ত্রী নিজেই বলল, “আমি নিচে শুচ্ছি, মা খাটে থাকুন।” দ্বিতীয় রাতে আমি বলেছিলাম, আজ আমি নিচে নামি। মা বললেন, তার গায়ে জ্বর জ্বর লাগছে, ছেলে পাশে থাকলে ভালো লাগবে। স্ত্রী বলল, “থাক, আর একটা রাতই তো।” আমি মেনে নিলাম। খুব সহজে মেনে নিলাম। এই সহজে মেনে নেওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল। তিন রাতের তিন রাতই আমার স্ত্রী ফ্লোরে ঘুমিয়েছে, আমাদের বিয়ের প্রথম বেড়ানোটায়।
তৃতীয় সিদ্ধান্তটা কেনাকাটা নিয়ে। মা বেশি হাঁটতে পারেন না। বিচে গেলে তিনি ছাতার নিচে বসে থাকেন। স্ত্রী পানির ধারে যেতে চাইত, আমি বলতাম, “মা একা বসে থাকবেন?” শেষে ও নিজে থেকেই আর বলত না। শপিংয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনা হলো। স্ত্রী একটা দোকানে একটা ব্যাগ পছন্দ করেছিল। আমি বললাম, “তোমারটা কাল কিনব, আজ মায়ের পায়ে ব্যথা।” কাল আর আসেনি। শেষ দিন সারাদিন বৃষ্টি ছিল।
ও চলে যাওয়ার পর আমি প্রথমে রাগ করেছিলাম। কাউকে না বলে চলে যাওয়া — এটা কেমন কথা। ঢাকায় ফিরে ওর বাবার বাসায় গেলাম ওকে আনতে। শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। তিনি আমাকে চা খাওয়ালেন।
চিৎকার করলেন না, দরজাও বন্ধ করলেন না। শুধু বললেন, “মেয়েটা রাগ করে আসেনি বাবা। ও এসেছে কারণ ও বুঝে গেছে, তোমাদের বাড়িতে ওর নিজের জায়গা নেই। কক্সবাজারে গিয়েও নেই। দেড়-দুই মাসেই একটা মানুষ এটা বুঝে যায়।”
স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। সে ডিভোর্সের কথা বলেনি। চিৎকারও করেনি। শুধু একটা শর্ত দিয়েছে। বলল, “আমি তোমার মায়ের বিরুদ্ধে না। মা ভালো মানুষ, আমি জানি। কিন্তু ওই বাড়িতে আমার নিজের বলতে এমন একটা দরজা নেই, যেটা আমি ভেতর থেকে বন্ধ করতে পারি। আমি তোমাদের মা-ছেলের মাঝখানে তৃতীয় মানুষ হয়ে থাকতে চাই না। আলাদা একটা ছোট বাসা নাও, মায়ের কাছাকাছিই। তাহলে ফিরব। না হলে ফিরব না।”
আলাদা বাসার হিসাব আমি করেছি। মায়ের এলাকায় দুই রুমের বাসা তেরো-চৌদ্দ হাজার। মায়ের ওষুধ আর সংসারের খরচও আমার। হিসাব মিলবে, কিন্তু টান টান করে। মাকে কথাটা বলার পর মা চুপ করে ছিলেন অনেকক্ষণ। তারপর শুধু বললেন, “আমি কি তাহলে এখন পর হয়ে গেলাম?” আমি জবাব দিতে পারিনি। এখনো পারিনি।
শুক্রবার দুই পরিবার বসবে। ওই বসায় আমি কী বলব, এখনো ঠিক করিনি।
— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক








