অর্থের জোর, চটকদার প্রতিশ্রুতি আর চতুর প্রচারণার ভিড়ে আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে বারবার মার খাচ্ছেন নীতি ও আদর্শের প্রতীক প্রকৃত রাজনীতিবিদরা। আর এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণকে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান—ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলে এ দেশের সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে অধিকার আদায় করেছে। কিন্তু প্রতিবারই বিজয়ের পর রাষ্ট্রক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাত থেকে ফস্কে গিয়ে পুরনো রাজনৈতিক এলিট, সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এবং স্বার্থান্বেষী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে, ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও কাঠামোগত শোষণের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এই অসম রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, ঐতিহাসিকভাবে সাধারণ মানুষের হেরে যাওয়া এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান করণীয়গুলোর একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দুই ধারার রাজনীতি: প্রকৃত বনাম মৌসুমি
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ জনসেবার চেয়ে একটি “ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও লাভ-ক্ষতির খেলায়” রূপ নিয়েছে। এই বৈরি পরিবেশে প্রকৃত ও আদর্শবাদী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মৌসুমি রাজনীতিবিদদের জয়লাভের মূল কারণগুলো নিম্নরূপ:
বিষয়ের ক্ষেত্র প্রকৃত রাজনীতিবিদ মৌসুমি রাজনীতিবিদ
আদর্শ ও অর্থশক্তি সততা ও আদর্শকে পুঁজি করায় আর্থিক সংস্থান সীমিত। কালো টাকা ও অনৈতিক ডোনেশন বর্ষণ এড়িয়ে চলেন। ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী হওয়ায় বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। টাকা দিয়ে সহজেই ভোট ও প্রচারণা কেনেন।
কৌশল ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পলিসি দেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে ভোটারদের আকর্ষণ করে না। অসম্ভব কিন্তু চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মাঝে সাময়িক উন্মাদনা বা আবেগ তৈরি করেন।
জনসংযোগের ধরণ সারা বছর জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন, ফলে মানুষের কাছে নতুন কোনো “চমক” থাকে না। নির্বাচনের ঠিক আগে এসে বড় অনুদান, উৎসব আয়োজন বা ত্রাণ বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের মনে দাগ কাটেন।
ইতিহাস কেন হাতছাড়া হলো? ৫২, ৭১ ও ২৪-এর নির্মম সত্য
সাধারণ মানুষ প্রতিবারই রাজপথের লড়াইয়ে জিতেছে, কিন্তু টেবিলের রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণে হেরে গেছে। এর ঐতিহাসিক রূপরেখাটি বুঝতে হবে:
* ১৯৫২ (ভাষা আন্দোলন): ছাত্র-জনতার রক্তে রাষ্ট্রভাষার অধিকার অর্জিত হলেও, তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক এলিটরা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে আমজনতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দাবিকে স্তব্ধ করে দেয়।
* ১৯৭১ (মহান মুক্তিযুদ্ধ): ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই লুণ্ঠনকারী অর্থনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার শুরু হয়।
* ২০২৪ (ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান): ফ্যাসিবাদের পতনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার ও বৈষম্যহীন এক ‘নতুন বাংলাদেশ’। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের চেনা খেলায় ও প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার তীব্র তাড়নায় সাধারণ মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষাটি আবার আড়ালে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
চলমান সংস্কারের চিত্র ও অগ্রগতি
গণ-অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে:
* সংবিধান ও নির্বাচন ব্যবস্থা: স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাসসহ সংবিধান সংশোধন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বিশেষ করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার বা বাতিলের জোর দাবি উঠেছে, যা সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেয় এবং সংসদকে দলীয় প্রধানের আজ্ঞাবহ করে তোলে।
* শাসনতন্ত্র ও বিচার বিভাগ: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং police ও জনপ্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে আলাদা কমিশন কাজ করছে।
* অর্থনৈতিক খাত: দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে ব্যাপক সংস্কার চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের একটি বিশাল অংশ। এই তারল্য সংকট দূরীকরণ, ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িতদের বিচার এবং বিগত বছরগুলোতে পাচার হওয়া প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও মার্কিন টাস্কফোর্সের সহায়তায় বিশেষ অডিট ও তদন্ত চলমান রয়েছে।
অর্থ পাচার উদ্ধার: আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনি জটিলতা
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রক্রিয়ার আইনি ও আন্তর্জাতিক রূপরেখা নিম্নরূপ:
খাতের বিবরণ আইনি জটিলতা ও বাধা আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনি ভিত্তি
প্রমাণের দায়ভার ও গোপনীয়তা আন্তর্জাতিক আদালতে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে হয় যে অর্থটি অবৈধ উপায়ে পাচার করা। সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেন দেশের কঠোর ব্যাংকিং সিক্রেসি আইনের কারণে প্রকৃত মালিকের তথ্য পাওয়া কঠিন। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন (UNCAC): এর অনুচ্ছেদ-৫১ ও ৫৪ অনুযায়ী, যেকোনো সদস্য রাষ্ট্র অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ ও তা ফেরত দিতে আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্য থাকে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও কৌশল অভিযুক্তরা বিদেশি আদালতে নামী আইনজীবীদের মাধ্যমে আইনি লড়াই চালায়, যা সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত করে। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে “নো রিকভারি, নো ফি” মডেলে আন্তর্জাতিক এজেন্সির সাহায্য নিচ্ছে। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি (MLAT): পারস্পরিক আইনি সহায়তার এই চুক্তির মাধ্যমে এক দেশের আদালত অন্য দেশের কাছে অপরাধী বা পাচার করা অর্থের সরাসরি তথ্য ও প্রমাণ চাইতে পারে।
উৎস অনুসন্ধান হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরিত হওয়ায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গতিপথ ও প্রকৃত অবস্থান ট্র্যাক করা অত্যন্ত দুরূহ। এগমন্ট গ্রুপ ও বিএফআইইউ: বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) বৈশ্বিক ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ‘এগমন্ট গ্রুপ’-এর সহায়তায় পাচারকৃত অর্থের উৎস খুঁজছে।
দিনশেষে কার পরাজয়: বাংলাদেশ নাকি সাধারণ মানুষ?
রাজনীতি যখন মৌসুমি চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং সংস্কারের উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক দরকষাকষির বেড়াজালে আটকে পড়ে, তখন দেশ ও দেশের মানুষ যৌথভাবে পরাজিত হয়।
* সাধারণ মানুষের পরাজয়: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাজার তদারকির অভাবে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে। দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০% থেকে ১২%-এর ঘরে ওঠানামা করার কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। সেই সাথে নাগরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং তাদের ত্যাগের অর্জিত सपनोंর অপমৃত্যু ঘটে।
* বাংলাদেশের পরাজয়: আর্থিক খাতে বছরের পর বছর চলা লুটপাটের কারণে বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অতিরিক্ত মেগা প্রজেক্টের নামে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের বোঝা এখন মাথাপিছু প্রায় ৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের মানুষের মোট মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ১,০৮০ ডলার (প্রতি ডলার প্রায় ১২০ টাকা হিসেবে)। এর মধ্যে শুধুমাত্র মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ রয়েছে প্রায় ৬৩৮ থেকে ৬৫৪ ডলার (বা প্রায় ৭৮,০০০ থেকে ৭৯,৮৯৮ টাকা)। টেকসই জাতীয় নীতি না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ঘটে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়।
বর্তমান করণীয়: সাধারণ মানুষের অর্জন টিকিয়ে রাখার রোডম্যাপ
ইতিহাসের এই নির্মম পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবং ২০২৪ সালের অর্জনকে পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে এখনই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করা: নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে যেন টাকার জোরে কোনো মৌসুমি রাজনীতিবিদ ভোট কিনতে না পারেন। বিচার বিভাগ ও পুলিশকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো দিতে হবে, যেন তারা কোনো নির্দিষ্ট দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
দলীয় রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা: রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক একক শাসন বন্ধ করতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং ত্যাগী ও প্রকৃত রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি: আন্দোলন শেষ হলেই ঘরে ফিরে যাওয়া যাবে না। সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে কি না, তা সাধারণ মানুষকে সিভিক সোসাইটি ও সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিনিয়ত তদারকি করতে হবে। ভোটারদের সাময়িক উপহার বা টাকার মোহে না পড়ে প্রার্থীর সততা ও ট্র্যাক রেকর্ড দেখে ভোট দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
মৌসুমি রাজনীতির জয় আর সংস্কারের ব্যর্থতা মানেই হলো কেবল ক্ষমতার হাতবদল, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন নয়। বাংলাদেশ ও সাধারণ মানুষকে জেতাতে হলে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোতে দাঁড়ানোই এই মুহূর্তে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ছামিউল আলম রাসু








