হাকিকুল ইসলাম খোকন,এমডি নাসির,হেলাল মাহমুদ,
আজ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের একটি বক্তব্য গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বলেছেন জেএসএফ-বাংলাদেশ এর সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন ।তিনি বলেছেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে।
প্রশ্ন হলো, একটি স্বাধীন দেশের পুলিশপ্রধান কীভাবে এমন বক্তব্য দেওয়ার দুঃসাহস দেখান? সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমতি দিতে পারে? আর সরকার অনুমতি দিলেই কি পুলিশ একজন নাগরিককে হত্যা করার অধিকার পেয়ে যায়? খবর বাপসনিউজ ও আইবিএননিউজ ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনি সুরক্ষা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কোনো সরকারের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নির্দেশ এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
পুলিশের দায়িত্ব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা, হত্যা করা নয়। আত্মরক্ষায় একান্ত প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত বলপ্রয়োগ এবং ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সরকারও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো বেআইনি নির্দেশ পালন করা যেমন পুলিশের দায়িত্ব নয়, তেমনি সেই নির্দেশ বেআইনি কাজকে বৈধতাও দেয় না।
পুলিশপ্রধান কি এসব মৌলিক সাংবিধানিক বিধান জানেন না? তিনি কীভাবে মনে করেন, সরকারের অনুমতি পেলেই ক্রসফায়ার করা যায়? তাঁর এই দুঃসাহসের উৎস কোথায়? সমালোচনার মুখে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝাননি; আইন প্রয়োগে কঠোরতার কথা বলেছেন। কিন্তু যে দেশে ‘ক্রসফায়ার’ দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্যকে নিছক শব্দচয়নের ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? বিশেষত যখন তিনি বিষয়টিকে সরকারের অনুমতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন?
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, এমন বক্তব্য এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশে। যে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। মানুষ কেবল একটি সরকারের পতন চায়নি; চেয়েছিল রাষ্ট্রের দমনমূলক চরিত্রের পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা।
অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আবার সেই ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা উত্থাপিত হচ্ছে! তাও দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তার মুখে!
দায়িত্ব শুধু পুলিশপ্রধানের নয়, সরকারেরও। কোন বিবেচনায় সরকার এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুলিশ পদে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি ক্রসফায়ারের সম্ভাবনাকে সরকারের অনুমতির সঙ্গে যুক্ত করেন? তাঁর সাংবিধানিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার সম্পর্কে অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রতি অঙ্গীকার কি নিয়োগের সময় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল?
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ, সরকারের সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি উদ্বেগজনক প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতার প্রশ্ন সামনে আসে।
স্বাধীন ও কার্যকর পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠার সংস্কার-উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সুরক্ষাসংবলিত আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা সংকুচিত করা—এসব সিদ্ধান্ত কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি দুর্বল করার একই প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ? এর সঙ্গে এখন যুক্ত হলো সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার বিষয়ে পুলিশপ্রধানের প্রকাশ্য বক্তব্য।
প্রশ্ন উঠছে, সরকার কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করতে চায়, নাকি পুরোনো কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামোকে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে বহাল রাখতে চায়? স্বৈরতন্ত্র কেবল নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে জন্ম নেয় না। নির্বাচিত সরকারের হাতেও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠে, যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণ যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করেছিল, আমরা কি আবার সেই একই ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি? সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, পুলিশপ্রধানের বক্তব্য কি সরকারের নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন? যদি না হয়, তাহলে এমন বক্তব্যের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? একই সঙ্গে পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন এবং মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা সংকুচিত করার বিষয়ে সরকারের অবস্থানের ব্যাখ্যাও জনগণকে দিতে হবে।
এই বক্তব্যের পর সরকারের নীরব থাকার সুযোগ নেই। একজন পুলিশপ্রধান যখন প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা উত্থাপন করেন, তখন তা তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং সর্বোচ্চ পুলিশ পদে থাকার উপযুক্ততা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে।
আমরা তাঁর অবিলম্বে অপসারণ এবং বক্তব্যটির জন্য আইনানুগ জবাবদিহি ও বিচারের দাবি জানাই। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে উৎসাহিত করা হয়েছে কি না, নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কোনো বেআইনি হুমকি সৃষ্টি হয়েছে কি না এবং কোনো আইনের লঙ্ঘন ঘটেছে কি না, তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে। আইন লঙ্ঘনের উপাদান পাওয়া গেলে তাঁকে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
কেবল বক্তব্য প্রত্যাহার বা পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে না। সর্বোচ্চ পুলিশ পদে থাকার জন্য জনগণের আস্থা অপরিহার্য। এমন বক্তব্য সেই আস্থার ভিত্তিকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রশাসনিক অপসারণও সম্ভাব্য আইনগত দায় থেকে অব্যাহতির পথ হতে পারে না।
তবে সমস্যাটি কেবল একজন ব্যক্তির অপসারণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধে স্বাধীন পুলিশ কমিশন, কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বেআইনি নির্দেশ পালন নয়, বরং তা প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ করাই প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে হত্যা করা নয়, নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণে প্রতিফলিত না হলে কেবল সরকার পরিবর্তনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। যে দমনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই ব্যবস্থাই যদি নতুন সরকারের অধীনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা হবে জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীর বিশ্বাসঘাতকতা।
ক্রসফায়ারের সংস্কৃতির অবসান চাই—কেবল ঘোষণায় নয়, আইন, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আচরণে।
নাগরিকের জীবনের অধিকার কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়; এটি তার সাংবিধানিক অধিকার।








