আমার স্ত্রী আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট—এখন ৩২। সে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করেছে। আমার সঙ্গে তার বিয়ে ২০১৭ সালে। মানুষ হিসেবে সে ভীষণ ভালো—ভদ্র, মিষ্টি একটি মানুষ। তবে তার বিয়ের আগে একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সেও তার সঙ্গে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ত, দুই বছরের বড় ছিল। তারা দু’জন দু’জনকে তখন খুব ভালোবাসত।
(এই কথাটা শুধু ভাবলেই আমার বুক কাঁপে—তবে সত্য যত কঠিনই হোক, সত্য তো সত্যই!)
সেই সময়ের দুই বছরের সম্পর্কের পর এক ভুল–বোঝাবুঝির মধ্যে দিয়ে তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। তখন সে খুব ভেঙে পড়েছিল, ছেলেটিও নাকি পাগলের মতো কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু ইগোর জায়গা থেকে কেউ আর ফিরে যায়নি। তারপর সব শেষ…
এরপর আমার সঙ্গে তার পরিচয় হয় পারিবারিকভাবে। আমি সব কিছুই জানতাম। ছ’মাসের পরিচয়ে তার সুন্দর ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে আমরা বিয়ে করি। আমাদের ৯ বছরের সংসার। সে ভীষণ ভালো মানুষ, কিন্তু খুবই নীরব প্রকৃতির। আগের নাকি অনেক চঞ্চল ছিল, কিন্তু সেই ধাক্কার পর থেকে নীরব ও শান্ত হয়ে যায়।
এই ৯ বছরের সংসারে সে কোনোদিন তার প্রাক্তন সম্পর্কে কোনো কথা তোলে নাই, কোনো স্মৃতিও ধরে রাখে নাই, কখনো কোনো যোগাযোগ—এমন কিছু তো দেখি নাই, এবং তার প্রাক্তনও কোনোদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমার স্ত্রী আমার প্রতি, আমার পরিবার ও আপনজনদের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল। আমার প্রতি তার সব দায়িত্ব, যত্ন—সবই সে করে। সে আমার কাছে খুব প্রিয়। আমিও জানতাম, সে আমাকে খুব ভালোবাসে।
তার প্রাক্তনও ৩ বছর আগে বিয়ে করেছে। সে BCS-এ হয়েছে, এক জুনিয়র তার সেই পোস্ট শেয়ার দেওয়ায় , যে আবার তারই ফ্রেন্ড, তাকে আমি পরবর্তী তে মেসেজ দিলে জানায় যে সেই ছেলে টা বিয়ে করেছে। যদিও আমার স্ত্রীর প্রাক্তন, তবু বলতেই হয়—ছেলেটা ভীষণ মেধাবী ও ভালো ছেলে।
সবই ঠিক ছিল—কিন্তু গতকালের একটা ঘটনা আমার অস্তিত্বটা কাঁপিয়ে দিয়েছে।
আমি, আমার স্ত্রী, আর আমাদের একমাত্র ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম এক মামার বাড়িতে। এটিই ছিল বিয়ের পর আমাদের প্রথম চট্টগ্রাম যাওয়া ,তো তিন দিনের মাথায়, মানে গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করে ওখানকার এক নামকরা হোটেলে বাফে খেতে গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই দেখি—তার সেই প্রাক্তন ছেলেটা তার স্ত্রীকে নিয়ে বসে আছে।
আর তার প্রাক্তন—এই দিয়েই এসেছিল!
তখন আমার আর আমার স্ত্রীর মুখোমুখি হলো। পুরো ৯ বছর পর তাদের দেখা। আমার স্ত্রী পুরো চুপ করে প্রায় ১০ সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, আর ছেলেটাও।
পুরো দৃশ্যটা মনে হলো—আমার চোখের সামনে এমন এক বাস্তবতা চলছে, যা আমাকে অসাড় করে দিল , মুহূর্ত টা এমন ছিলো যেন আমার চোখের সামনে এক নীরব সত্য দাড়িয়ে আছে , শব্দহীন চিৎকারের মতো…
অবশেষে ছেলেটা মলিন হাসি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন?”
কিন্তু তার দৃষ্টি যেন সংযত হতে চাইলেও কোথায় যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল…
আমার স্ত্রী অস্ফুট স্বরে জানাল, ভালো ,তুমি?
সেও বলল, “হ্যাঁ, ভালো আছি।”
একটা চাপা অনুভূতি ভর করল আমার ভিতরে।
তারপর স্ত্রী হেঁটে চলে যেতে চাইলো। আমি আর তাকে থাকতে জোর করিনি।
গতকাল রাত—ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ জানালার পাশে স্তব্ধ হয়ে দূরে চেয়ে থাকা সেই মানুষটা—আমার এত কাছের মানুষ হয়েও সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমাদের মাঝে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল। যেটাকে আমি ভাবতাম নেই, অথচ সত্যিকারের সেই দেয়াল যেন কোথাও অবশিষ্ট ছিল—অদৃশ্য, কিন্তু পুরনো, প্রাচীন।
সারা রাত সে প্রায় চুপচাপ দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দিল। বিছানায় আসতে বললে বলল, “শরীর খারাপ লাগছে।”
কিন্তু এই ‘খারাপ লাগা’—
এ কি শরীরের?
নাকি মনের গভীরে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো কোনো ক্ষত আবারও জেগে ওঠার ব্যথা?
মানুষটা আজ আরও বেশি চুপচাপ।
আমি যেন সব বুঝে ফেলেও—মেনে নিতে পারছি না।
অদৃশ্য সবকিছু… অতীত… ফেলে আসা দিনগুলো…
ভাগ্যের খেলায় মানুষ ভালো থেকেও কেমন করে যেন সারাজীবন নিঃশব্দে ভোগে—
তিন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটা মানুষ!
জটিল, মিশ্র, অনাকাঙ্ক্ষিত, সূক্ষ্ম সব অনুভূতির জালে আটকে থাকা—
আমরা তিনজন—
অদৃশ্য ব্যথার ভিতর নিশব্দে বয়ে চলা তিন টি জীবন !
পাঠিয়েছেন







