শিক্ষা একটি জাতির মূল ভিত্তি, আর সেই ভিত্তির প্রথম সোপান হলো কোমলমতি শিশুদের হাতে বছরের প্রথম দিন নতুন বই তুলে দেওয়া। নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মুখরিত হবে সারাদেশের আঙিনা, মেধা ও মননে জেগে উঠবে লাখো আলোর স্বপ্ন—এই মহৎ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এখন নিঃশব্দ অথচ অভূতপূর্ব এক বিপ্লব চলছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি)। ‘বিশ্রামহীন দিন, নির্ঘুম রাত’ শব্দগুচ্ছ কেবল কোনো অলংকার নয়, বরং এনসিটিবির প্রতিটি সদস্যের বর্তমান কর্মযজ্ঞের প্রাত্যহিক প্রতিচ্ছবি। সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়ন এবং বছরের শুরুর দিনেই শিশুদের হাসি উপহার দিতে নিজেদের বিলীন করে দেওয়ার যে নজির তারা স্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে অনন্য ও প্রশংসনীয়।
এনসিটিবির দাপ্তরিক আঙিনায় এখন আর নিয়মের চেনা ঘড়ির কাঁটা মানা হচ্ছে না। প্রশাসনিক কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে সাধারণ কর্মঘণ্টাকে বদলে ফেলা হয়েছে। এনসিটিবি চেয়ারম্যান মহোদয়ের দূরদর্শী ও সময়োপযোগী নির্দেশনায় প্রতিদিন সকাল ৯:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত একটানা চলছে সব প্রশাসনিক ও তদারকি কার্যক্রম। দিন-রাতের পার্থক্য ভুলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই একনিষ্ঠ কর্মপ্রয়াস স্পষ্ট করে তোলে, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার যাত্রায় তারা কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে কেবল কক্ষের চার দেয়ালের ভেতরেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নেই। চেয়ারম্যা সহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনিক সব কাজ গুটিয়ে নিয়ে সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে বিকেল ৬:০০ টা পর্যন্ত সরাসরি ছুটছেন বিভিন্ন মুদ্রণ শিল্প বা ছাপাখানায়। ছাপাখানার ধুলাবালি আর যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে তারা প্রত্যক্ষভাবে তদারকি করছেন বই ছাপানোর কাজের গুণগত মান। কাগজ, কালি, বাঁধাই কিংবা অক্ষরের স্পষ্টতা—প্রতিটি উপাদান পরীক্ষা করা হচ্ছে পরম যত্নে ও অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে।
মানের প্রশ্নে এনসিটিবির এই আপসহীন অবস্থান আধুনিক প্রশাসনিক দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চেয়ারম্যান মহোদয়ের কড়া বার্তা—গুণগত মানে সামান্যতম ত্রুটি বা বিচ্যুতিও সহ্য করা হবে না। পরীক্ষার পর যদি কোথাও কোনো ছাপানো ফর্মা বা বইয়ে মানের ঘাটতি পাওয়া যাচ্ছে, কালবিলম্ব না করে তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে ধ্বংস করা হচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চেয়ারম্যানের এই কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতি ছাপাখানা মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক বার্তা দিয়েছে এবং কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। কোনো ধরনের অসাধু উপায় বা গাফিলতির সুযোগ এখানে একদম রুদ্ধ।
একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হলো তার শিশু শিক্ষা। সেই শিক্ষাকে সঠিক রূপ দিতে এবং সময়মতো শিক্ষার্থীদের কাছে নির্ভুল ও উন্নতমানের বই পৌঁছে দিতে এনসিটিবির কর্মীরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছেন। এই নিরলস প্রচেষ্টা কেবল কোনো চাকরির দায়িত্ব পালন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গভীর দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
এনসিটিবি যেভাবে নিজেদের বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে নির্ঘুম রাত ও ক্লান্তিহীন দিন পার করছে, তার সুফল পাবে কোটি কোটি শিশু। বছরের প্রথম দিনে রঙিন সব পাতায় চোখ বুলিয়ে যখন শিশুরা হাসবে, তখন তাদের সেই প্রাপ্তির আনন্দের পেছনে লুকিয়ে থাকবে এনসিটিবির এই অনন্য ত্যাগ ও অদম্য সংগ্রাম। পরিশেষে বলা যায়, এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই নিষ্ঠা, কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্ববোধের চর্চা যেন শুধু একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; গুণগত মান নিশ্চিতের এই ধারা দেশের শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়নে চিরকাল এক বাতিঘর হয়ে জ্বলুক।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
গবেষণা কর্মকর্তা (এনসিটিবি),
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।








