বায়েজিদ পলাশবাড়ী গাইবান্ধা) :
পলাশবাড়ীতে মুনছুর আলীর বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ না হলেও প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে মুনছুর আলী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত জমির অংশীদাররা।
অভিযোগ রয়েছে, পলাশবাড়ী পৌর শহরের নুনিয়াগাড়ী মৌজার সাবেক ৭৯/৮০ নম্বর দাগ এবং বর্তমান ৮৩১ নম্বর দাগের ০.০৯৪৮ একর জমির বিপরীতে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩২ টাকা অধিগ্রহণের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, ওই পরিমাণ জমি বাস্তবে মহাসড়কের জন্য অধিগ্রহণ বা হস্তান্তর করা হয়নি।
ভুক্তভোগী রেখা বেগমসহ অন্যান্য অংশীদারদের অভিযোগ, সাসেক প্রকল্প-২ সংশ্লিষ্টদের আপত্তি, অন্যান্য অংশীদারদের আপত্তি এবং এলএমসি কেস নং ২৭০/২০২৩-২০২৪ ও এলএ কেস নং ১১/২০১৯-২০২০-এর বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না করেই মুনছুর আলীর নামে অধিগ্রহণের অর্থের চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিষয়টি যথাযথভাবে সরেজমিন যাচাই না করে কাগজপত্রের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। দলিলের হিসাবেও উঠছে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দেওয়া কাগজপত্রের তথ্য অনুযায়ী, নুনিয়াগাড়ী মৌজার এসএ খতিয়ান-১৬, আরএস খতিয়ান-২৫ এবং জেএল নম্বর-৬৯-এর সাবেক ৭৯/৮০ নম্বর দাগে মুনছুর আলীর বাবা মৃত মোফাজ্জল হোসেন ১৯৫৩ সালের ২১ জানুয়ারি ৪২৫ নম্বর দলিলের মাধ্যমে মোট ১২৭ শতাংশ জমির মালিকানা লাভ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর ০১/৬৯ নম্বর কেসের মাধ্যমে সড়ক বিভাগের কাছে ৩২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে এতে মোফাজ্জল হোসেনের নামে অবশিষ্ট থাকার কথা ৯৫ শতাংশ জমি।
এরপর ২০০২ সালে বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ওই জমির একটি অংশ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হস্তান্তর করা হয় ২১৬৯ নম্বর দলিলে ছেলে আল মামুনকে ৩৯ শতাংশ, ২১৭০ নম্বর দলিলে স্ত্রী হালিমা বেগমকে ৩ শতাংশ এবং ২১৯৪ নম্বর দলিলে দুই মেয়ে রোকেয়া বেগম ও শাহিনা পারভীনকে পৃথকভাবে ৫ শতাংশ করে মোট ১০ শতাংশ জমি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের হিসাবে, এসব হস্তান্তরের পর মোফাজ্জল হোসেনের নামে ৪৩ শতাংশ জমি অবশিষ্ট থাকার কথা। কিন্তু ২০০২ সালের ২৪ মার্চ ২১৯৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার দুই ছেলে মোকসেদ আলী ও মুনছুর আলীর নামে ৭০ শতাংশ জমি দলিল করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
নিজের অংশের জমি বিক্রির পরও অধিগ্রহণের টাকা?
অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মুনছুর আলীর প্রাপ্য অংশ ছিল প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তীতে তিনি ২০১২ সালের ২০ মার্চ ১৬১৯ নম্বর দলিলে ৪ শতাংশ, ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ৬৮১ নম্বর দলিলে আরও ৪ শতাংশ এবং একই বছরের ১৬ এপ্রিল ২৪৫৩ নম্বর দলিলে আরও ৮ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন।
এ হিসাবে তার নামে অবশিষ্ট জমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ থাকার কথা বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। অথচ তাদের অভিযোগ, এর পরও তিনি মহাসড়কের প্রায় ৯ শতাংশ জমির অধিগ্রহণ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, জমির প্রকৃত মালিকানা, পূর্বের হস্তান্তর এবং সরেজমিনে জমির অবস্থান যাচাই করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার কথা। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—বাস্তবে অধিগ্রহণের জন্য জমি না দিয়েই কীভাবে ওই জমির বিপরীতে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছাড় হলো?
‘ম্যানেজ’ করে অর্থ ছাড়ের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে সরেজমিনে জমির বাস্তব অবস্থা যাচাই না করেই অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আপত্তি ও অন্যান্য অংশীদারদের দাবিও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
তাদের আরও অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মনগড়া তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশেরও অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
তবে সংবাদ প্রকাশে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য এ প্রতিবেদকের কাছে পাওয়া যায়নি। অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অধিগ্রহণের নথি, দলিলপত্র, নামজারি, খতিয়ান, দখল এবং প্রকল্পের বাস্তব অধিগ্রহণের সীমানা সরেজমিনে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে অনিয়ম প্রমাণিত হলে অর্থ উত্তোলনকারী ব্যক্তি এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, অধিগ্রহণের নথি, আদালতের নির্দেশনা এবং সরেজমিনে জমির অবস্থান যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের বিষয়ে মুনছুর আলীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
Post Views: 30
Related