জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার মান উন্নয়নে আরও দায়িত্ব নিতে হবে
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রায় ৬০২টি সরকারি ও ১৬৯২টি বেসরকারি কলেজসহ মোট প্রায় ২২৯৪ টি কলেজকে এক ছাতার নিচে এনে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। সংখ্যাগত বিচারে এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল সাফল্য—বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭০ শতাংশই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অধ্যয়ন করছে। অধিকন্তু দেশের গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বড়ো একটি অংশের উচ্চ শিক্ষার জন্য অন্যতম আশ্রয়স্থল হলো এ প্রতিষ্ঠানটি। এখানে খরচ যেমন কম, তেমনি দেশের যেকোনো প্রান্তে প্রতিষ্ঠানটির অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে। ফলে সহজেই নিজ এলাকায় থেকে পড়াশোনার জন্য এ প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের বিনিময়ে আমরা কী পাচ্ছি? পরিমাণের এই বিপুল উল্লম্ফনে মানের স্থান কোথায়? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবলই নামমাত্র সনদ বিতরণের এক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে? এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। অথচ অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক বেশি অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে একটি সরল পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।
ক). শিক্ষার মান ও অবকাঠামোগত সংকট
কোর্স চালু করা এবং নতুন নতুন কলেজকে অধিভুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আগ্রহ ও তৎপরতা দেখা যায়, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন অনেকে । একটি কলেজ উচ্চশিক্ষার উপযোগী কি না, সেখানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ বা সেশনজটমুক্ত পরিবেশ আছে কি না, তা যাচাই না করেই অধিভুক্তি সচল রাখা হচ্ছে হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নও রয়েছে ।
সবচেয়ে করুণ অবস্থা বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষার। একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে দাঁড়িয়ে যেখানে শিক্ষার্থীদের আধুনিক ল্যাবনির্ভর শিক্ষা দেওয়া জরুরি, সেখানে অধিকাংশ অধিভুক্ত কলেজে কোনো কার্যকর ল্যাবরেটরি নেই। অনেক ক্ষেত্রে কাগজ-কলমে ল্যাব দেখানো হলেও বাস্তবে তা তালাবদ্ধ বা সচল নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনো নিয়মিত পরিদর্শন করে এসব তথ্য যাচাই করার নজির নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মৌলিক ব্যবহারিক জ্ঞান ছাড়াই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করছে।
খ). কারিকুলাম সংস্কার ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব
বর্তমান বৈশ্বিক কাজের বাজারের সাথে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের দূরত্ব যোজন যোজন। যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন ও তা নিয়মিত পরিমার্জনে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয় বলে অভিযোগ করছেন অংশীজনের অনেকেই । ফলে বাজারমুখী দক্ষতাহীন লাখ লাখ বেকার গ্র্যাজুয়েট প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে বের হচ্ছে, যারা রূপক অর্থে ‘উচ্চশিক্ষিত বেকার’ ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে শ্রম বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আরও অগ্রসর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ছিল। কিন্তু তাদের কি সে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়? উত্তরে হয়তো অধিকাংশই বিশ্লেষকই না ভোট প্রদান করবেন।
তদুপরি, শিক্ষার মান সরাসরি নির্ভর করে শিক্ষকের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষকদের মানোন্নয়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদী বা কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, গবেষণা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ না দিলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনা অসম্ভব। কিন্তু এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্ময়করভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায় ।
গ). আর্থিক বৈষম্য ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় আয়ের উৎস হলো শিক্ষার্থীদের থেকে গৃহীত পরীক্ষা ফি, কেন্দ্র ফি, ভর্তি ফি ও ব্যবহারিক ফি। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে গিয়ে জমা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা রয়েছে। অংশীজজনের অনেকের মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিৎ শিক্ষার উন্নয়ন এবং কলেজ পর্যায়ে মান উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া এবং বন্টন ব্যবস্থায় কলেজের আর্থিক অংশ বৃদ্ধি করা।
০১. শিক্ষার্থী ও কলেজের উন্নয়ন: সংগৃহীত অর্থের কত শতাংশ কলেজের ভৌত অবকাঠামো, ল্যাব সচল করা বা লাইব্রেরির বই কেনার জন্য ফেরত দেওয়া হয়? উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
০২. গবেষণা ও উদ্ভাবন: মানসম্মত উচ্চশিক্ষার মূল প্রাণ হলো গবেষণা। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ একেবারেই নগণ্য।
০৩. শিক্ষক উন্নয়ন: শিক্ষকদের স্কলারশিপ প্রদান বা উচ্চতর প্রশিক্ষণের পেছনে এই তহবিলের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
একটি পাবলিক প্রতিষ্ঠান যখন শিক্ষার মৌলিক শর্ত পূরণ না করে কেবল ফি আদায় এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন তার বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা যেন কেবল অর্থ পরিশোধ করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর কাগজ বা সনদ কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘ). দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। শুধু একটি নিয়ন্ত্রণকারী বা সনদ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে টিকে থাকলে এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা চিরতরে হারিয়ে যাবে। এই স্থবির ও নামসর্বস্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনই সুনির্দিষ্ট কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
০১. নিয়মিত মনিটরিং ও ল্যাব তদারকি: কলেজগুলোতে বাস্তবে ক্লাস হচ্ছে কি না এবং বিজ্ঞান ও আইসিটি ল্যাবগুলো সচল কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে আধুনিক ডিজিটাল পরিদর্শক দল গঠন করতে হবে। ভুয়া বা অপর্যাপ্ত কাঠামোর কলেজের অধিভুক্তি বাতিল করতে হবে।
০২. বাজারমুখী ও আধুনিক কারিকুলাম: সময়োপযোগী, প্রযুক্তিভিত্তিক এবং কর্মসংস্থানমুখী সিলেবাস প্রণয়ন করা জরুরি।
০৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট: প্রতি বিভাগীয় শহরে শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
০৪. আর্থিক স্বচ্ছতা ও পুনঃবিনিয়োগ: শিক্ষার্থীদের থেকে সংগৃহীত ফি-এর একটি বড় অংশ সরাসরি কলেজের ল্যাব উন্নয়ন, লাইব্রেরি সমৃদ্ধকরণ এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তিতে পুনঃবিনিয়োগ করতে হবে।
শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান যদি কেবল ডিগ্রি প্রদানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তবে তা জাতির মেরুদণ্ডকে আরও ভঙ্গুর করে তুলবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধুই সনদ বিতরণের বাণিজ্যিক কাজে নামবে, নাকি শিক্ষার আসল মান ফিরিয়ে এনে দেশের কোটি শিক্ষার্থীর জীবনের আলো জ্বালবে—এখনই সেই আত্মপর্যালোচনা ও কঠোর সিদ্ধান্তের উপযুক্ত সময়।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।








