দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের ‘চ্যাম্পিয়ন হতে চাই’ ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ সে রকম কিছু ঘটিয়ে ফেললে তো অবশ্যই একটা ইতিহাস হতো। তবে এই টুর্নামেন্ট অন্যভাবেও হতে পারত বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কিছু।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের বছরখানেক আগের অবস্থাটা একবার ভাবুন। তখন কি মনে হয়নি, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি দিয়েই একসঙ্গে শেষ হতে পারে বাংলাদেশ দলের চার অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ আর মুশফিকুর রহিমের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার!
২০২৩ বিশ্বকাপের আগে সাকিব নিজেই সে রকম আভাস দিয়েছিলেন। তামিমের কথাবার্তায়ও একসময় মনে হয়েছিল, এই টুর্নামেন্টই হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার শেষ টুর্নামেন্ট। একই রকম ধারণা ছিল মাহমুদউল্লাহ আর মুশফিককে নিয়েও।
মাহমুদউল্লাহ তো নাকি তিন-চার মাস আগেও বিসিবিকে জানিয়েছিলেন, এই টুর্নামেন্ট দিয়েই শেষ টানতে চান আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। এই চারজনের একসঙ্গে অবসর বাংলাদেশের ক্রিকেটে বেদনার বিউগল নিশ্চয়ই বাজাত। তবে কখনো না কখনো বিদায় যেহেতু নিতে আর দিতেই হবে, তাঁদের মতো ক্রিকেটারদের বেলায় সে ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো বড় আসরই হতে পারত সেরা উপলক্ষ।
কিন্তু বছরখানেক আগের সেই অবস্থা বদলে গেছে গত আট-নয় মাসের মধ্যে। রাজনৈতিক কারণ আর মামলা–মোকদ্দমায় পড়ে এখন দেশেই ব্রাত্য সাকিব। ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেও আর কখনো খেলা হবে কি না, অনিশ্চিত। সাকিবের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার অসমাপ্ত এক গল্পের মতোই হয়ে আছে এখন। টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটকে আগেই বিদায় বলা তামিম শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস ট্রফির অপেক্ষা করেননি। গত বিপিএলের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন।
বাকি রইলেন মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিক। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তারা আছেন। তবে এই টুর্নামেন্টের পরও ৩৯ আর ৩৭ বছর বয়সী বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ এ দুই ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন কি না, সেটা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সে আলোচনায় এমনকি যোগ দিয়েছেন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার দীনেশ কার্তিকও। আরেক সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার ওয়াসিম জাফর এবং সাবেক কিউই ফাস্ট বোলার শেন বন্ডও সমালোচনা করেছেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশের এই দুই ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সের।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে কে কখন বিদায় নেবেন, সেটা একদমই একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত বিষয়। এমনও হতে পারে যে একজন ক্রিকেটার আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দিলেনই না। আনুষ্ঠানিকভাবে বলতেই হবে ‘আমি কাল থেকে আর খেলব না’, বিষয়টা সে রকম নয়। তবে বড় ক্রিকেটাররা সাধারণত চান, তাদের বিদায়টা আড়ম্বরপূর্ণ হোক। মাঠ থেকে বিদায় নিয়ে ক্যারিয়ারটাকে পূর্ণতা দেওয়ার আকাঙক্ষা তাদের থাকে।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ কাল নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলবে পাকিস্তানের বিপক্ষে। তবে মুশফিক–মাহমুদউল্লাহর মনোভাবে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না, এটাই তাদের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সে রকম হলে নিশ্চয়ই তারা বিসিবিকে তা আগাম জানাতেন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত বিসিবি বা পাকিস্তানে বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের কাছেও দুজনের দিক থেকে সে রকম কোনো বার্তা যায়নি বলে জানা গেছে।
তাহলে কি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পরও মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যেতে চান? চাইতেই পারেন। নিজেদের ক্যারিয়ারের ইতি কোথায় টানবেন, সেটা তো তাদেরই সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, তখন কি একই সঙ্গে বিসিবিও চাইবে ভবিষ্যতে তাদের রেখে দল গড়ার কথা ভাবতে?
টেস্ট ক্রিকেটকে ২০২১ সালে বিদায় বলা মাহমুদউল্লাহ যদিও গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের ওয়ানডে সিরিজটা দারুণ খেলেছেন, তবু নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার আলোচনায় তার অবসর ভাবনার প্রসঙ্গটাও আসে। মুশফিকের ফর্ম তো পড়তির দিকেই। এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দুজনের কেউই নিজেদের নাম ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সুবিচার করতে পারেননি।
একটা ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট দিয়ে অবশ্য তাদের মতো ক্রিকেটারদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত নয়। কথাটা বিসিবিও মানে, সঙ্গে এটাও উপলব্ধি করে যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের বিদায় হওয়া উচিত সসম্মানে।
বাংলাদেশ দলে তাদের অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কাল বিসিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাদের অনেক অবদান। আমি তো বরং বলব, উল্টো তাদের সঙ্গেই অনেক সময় অন্যায় করা হয়েছে।’ তাই বলে অবশ্য তিনি এটাও মনে করেন না যে দুজনেরই আরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া উচিত, ‘একটা টুর্নামেন্টের মধ্যে কোনো ক্রিকেটারের সঙ্গে এসব নিয়ে আলাপ করাটা ঠিক নয়। তবে সব ক্রিকেটারকেই একসময় বিদায় বলতে হয়। সেটা কখন, তা ওই ক্রিকেটারেরই ঠিক করা উচিত।’
সূত্র জানিয়েছে, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ নিজ থেকে কিছু না বললেও চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর দেশে ফিরলে বিসিবিই তাদের কাছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইবে। তাদেরও জানানো হবে তাদের ব্যাপারে বোর্ডের ভাবনা।
আর সেই ভাবনাটা নতুনদের উঠে আসার পথটাকে আরও উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা মাথায় রেখেই ভাবছে বোর্ড। হ্যাঁ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর মুশফিক-মাহমুদউল্লাহকে সসম্মানে বিদায় বলার কথাই ভাবছে বিসিবি।