কলামে, মোহাম্মদ সোহেল

একটি জাতির জীবনস্রোতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আবির্ভূত হন, যাঁরা ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে রূপান্তরিত হন এক একটি প্রতিষ্ঠানে, এক একটি অধ্যায়ে। তাঁদের বিদায় কেবল একজন মানুষের প্রস্থান নয়; তা ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠার সমাপ্তি, এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাসে ঠিক এমনই এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের শোকবার্তায় ফুটে উঠেছে এই শূন্যতার গাম্ভীর্য। তিনি যথার্থই নির্দেশ করেছেন, এটি একজন নেত্রীর চলে যাওয়া মাত্র নয়; এটি জাতির এক ‘মহান অভিভাবককে হারানোর’ সমতুল্য। গৃহবধূর নিরাপদ আঙ্গিনা থেকে বিস্ফোরক রাজনীতির রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়া, এরপর স্বৈরশাসনের নয় বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী শক্তিকে সংঘবদ্ধ করে ঐতিহাসিক পতন ঘটানো—এই যাত্রাপথ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখা হয়নি। এটি রচিত হয়েছে অদম্য স্পৃহা, দৃঢ় মনোবল এবং জনগণের প্রতি এক গভীর মমত্ববোধের মধ্য দিয়ে। তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান বিস্ময় জাগায়। কখনো নির্বাচনী পরাজয়ের মুখ দেখেননি এই নেত্রী।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে লিখে গেছেন নিরবিচ্ছিন্ন জয়ের ইতিবৃত্ত। কিন্তু সংখ্যাগত এই সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর সিদ্ধান্ত ও কর্মের সমাজ-রূপান্তরকারী প্রভাব। মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি প্রবর্তন বাংলাদেশের নারী জাগরণের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অর্থনৈতিক উদারীকরণের সূচনা করে তিনি দেশের অর্থনীতিকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার এক মজবুত ভিত্তি প্রদান করেন। প্রফেসর ইউনূসের ভাষ্যেই ফিরে দেখা যায়, তিনি ছিলেন ‘সংগ্রাম ও প্রতিরোধের এক অনন্য প্রতীক’।
ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ের মতোই বিরোধী দলে থাকাকালীন তাঁর আপোষহীন, দৃপ্ত অবস্থান গণতন্ত্রের চর্চাকে সক্রিয় রাখতে, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে ঠেকাতে এক অনিবার্য প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অঙ্গ। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার উর্ধ্বে উঠে একজন রাজনীতিকের দেশ ও জনগণের জন্য নিরলস সংগ্রামকে স্বীকার করে নেওয়াই হলো একটি পরিণত রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির পরিচয়।
প্রধান উপদেষ্টার শোকবার্তায় সেই পরিণতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকথা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অকালপ্রয়াণের পর তিনি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তা ছিল এক কল্পনাতীত চ্যালেঞ্জ। তিনি শুধু সেই চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করেননি, একের পর এক নির্বাচনী বিজয় ও রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক ক্যারিশ্যাটিক ও সিদ্ধিহীন নেত্রী হিসেবে।
তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্ব মর্মান্তিক বেদনায় ঢাকা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নির্মম শিকার হয়ে তিনি মিথ্যা মামলার বেড়াজালে বন্দি জীবনযাপন করেছেন, যা রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমাদের সকলের জন্যই একটি অন্ধকার অধ্যায়। আজ তাঁর মহাপ্রয়াণে সেই সমস্ত বিতর্ক ও যন্ত্রণার ইতি টেনে, জাতির একজন সেবক, এক বলিষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের অবদানকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর সময়। জাতি আজ শোকস্তব্ধ। এই শোকের মাঝেই আমরা খুঁজে পাই আমাদের অগ্রযাত্রার দিশা।
কারণ, ইতিহাস নির্মাতাদের বিদায় নিলেও তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শ, সংগ্রামের দৃপ্ত চেতনা এবং দেশগড়ার অঙ্গীকার জাতির মানসপটে চিরভাস্বর হয়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় আপোষহীন সাহসিকতা, দূরদর্শী সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং গণমানুষের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতার মহৎ পাঠ। তাঁর প্রতি আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধা। বিদায়, মহান অভিভাবক। আপনার সংগ্রামী জীবনাবাক জাতিকে পথ দেখাবে যুগ যুগ ধরে।
Views: 223
Related