রংপুর ব্যুরো: বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্কে দিন কাটছে গাইবান্ধার মানুষের। চলতি বছর বিচ্ছিন্ন ঘটনার পাশাপাশি অন্তত ৪ দফায় বড় ধরনের তাÐব চালিয়েছে কুকুর ও শিয়াল। বিশেষ করে পথকুকুর বা বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণের আতঙ্কে রয়েছে শিশু, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে কুকুর ও শিয়ালের কামড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৫৫ জন আক্রান্ত
হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুসহ ৬ জনের। সচেতন মহলের অভিযোগ, গাইবান্ধায় একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলেও টনক নড়ছে না প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্টদের। ঘটনার পর সাময়িক তৎপরতা দেখা গেলেও পরিকল্পিত কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে কুকুর বা এ ধরনের প্রাণির আক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর পরিসংখ্যান।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের ভ্যাকসিন কেন্দ্রের রেজিস্টার বলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ছয় মাসে কুকুর ও অন্যান্য প্রাণির আক্রমণের শিকার হয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৬ হাজার ৯৮০ জন। এর মধ্যে শুধু কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েছে নারী ও শিশুসহ ২ হাজার ২৫৬ জন। তবে এ হিসাব শুধু গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের। এর বাইরে জেলার আরও ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার বেসরকারিভাবেও চিকিৎসা নিয়েছেন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়।
হাইকোর্টে বেওয়ারিশ কুকুর নিধনে নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই সারা দেশের গ্রাম ও শহরে ব্যাপক হারে বেড়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা, এমন দাবি স্থানীয়দের। সোমবার গাইবান্ধা পৌরসভা ও কয়েকটি গ্রামে বেওয়ারিশ কুকুরের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লয় দলবেঁধে ঘুরতে দেখা গেছে কুকুর। বিশেষ করে ময়লার ভাগাড় ও খাবারের দোকানের আশপাশে একসঙ্গে ১০-১২টি পর্যন্ত কুকুর দেখা গেছে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামে দলবেঁধে চলাফেরা করা কুকুরের সংখ্যা কিছুটা কম। শহরের কলেজ রোডের এতিমখানা, হাসপাতাল মোড়, সদর থানা-সংলগ্ন ময়লার ভাগাড়, ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, পার্কের মোড়, ফকিরপাড়া মসজিদের সামনে এবং পলাশপাড়া মোড়ের ময়লার ভাগাড়ের কাছে দলবেঁধে থাকা কুকুর দেখা যায়।
এসব এলাকার পাশ দিয়ে চলাচলকারী শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের আতঙ্ক নিয়ে চলতে দেখা যায়। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও রয়েছে চরম উদ্বেগ। কুকুরের দল সামনে পড়লে অনেককে উৎকণ্ঠা ও ভয়ের সঙ্গে বারবার কুকুরগুলোর দিকে তাকাতেও দেখা যায়। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামির খাতুন বলেন প্রচÐ ভয় পাই কুকুরকে। ওরা সবগুলো একসঙ্গে যদি ধরতে আসে! ফেসবুকে দেখেছি স্টুডেন্টকে কীভাবে ১০-১২টি কুকুর কামড় দিয়েছে। জান্নাতুল ফেরদৌসী নামে অভিভাবক বলেন, শহরে প্রচুর কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। দলে দলে সবখানে ঘুরে বেড়ায়। পথ চলতে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন আক্রমণের শিকার হই। কুকুর নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। গাইবান্ধার ভিএইচ রোডের সরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল আলম বলেন, রাত ১০টার পর এবং ভোরবেলা নামাজে যাওয়ার সময় কুকুরের আক্রমণের ভয়ে থাকি। কুকুরগুলো একা পেলে দলবেঁধে আক্রমণ করতে আসে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ বা এদের দমনে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিস¤পদ বিভাগ ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের ৪, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকটি গ্রামে তাÐব চালায় একটি পাগলা কুকুর। সেইদিন একই কুকুরের কামড়ে ২৬ জন আহত হন। আহতরা গাইবান্ধা ও রংপুরে চিকিৎসা নেন। তবে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও ঘটনার ১৪ দিন পর ৬ মে প্রথমে নন্দ রানী (৫৫) ও ফুল মিয়া (৫২) মারা যান। পরে ৮ মে রতনেশ্বর বর্মণ, ১২ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফরুজা বেগম (৪০) এবং সর্বশেষ ১৩ মে সুলতানা বেগমের মৃত্যু হয়। চরম উদ্বেগজনক ওই ঘটনার ৪ মাস পর গত ২০ সেপ্টেম্বর একই উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের জিগাবাড়ী ও তালুক বেলকা গ্রামে পথচারী ও বাড়ির আশপাশে থাকা চার শিশু ও নারীসহ ৯ জনকে কামড় দেয় একটি শিয়াল। পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর বিকালে সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের হাটবামুনী গ্রামের সিনথিয়া (১২) নামে এক শিশুকে একটি কুকুর ধাওয়া করে। একপর্যায়ে কুকুরটি তার গলায় কামড় দিলে শ্বাসনালিতে গভীর ক্ষত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাকিব নামে এক যুবকের হাতেও কামড় দেয় কুকুরটি। এর ৪ দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর একটি কুকুর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩টি গ্রামের নারী ও শিশুসহ ৮ জনকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড়ে আহত করে। মানুষের ওপর হামলার পাশাপাশি কুকুরটি ২টি গরু ও ২টি ছাগলকেও কামড়ায়।
গাইবান্ধার প্রাণিস¤পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুরে মানুষ ও গবাদি প্রাণিকে আক্রান্তকারী কুকুর ও শিয়ালের নমুনা পরীক্ষায় র্যাবিস ভাইরাসের উপস্থিতি পেয়েছে প্রাণিস¤পদ অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি (সিডিআইএল)।
অন্যদিকে, গাইবান্ধায় এসব ঘটনার প্রাদুর্ভাবের উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে গত ২২ সেপ্টেম্বর আক্রান্ত এলাকায় আসে প্রাণিস¤পদ অধিদপ্তরের রোগতত্ত¡ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের চার সদস্যের একটি পর্যবেক্ষণ দল। এছাড়া ২৫ সেপ্টেম্বর শিয়ালের কামড়ে নারী-শিশুসহ নয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় অধিকতর অনুসন্ধানে মাঠে নামে স্বাস্থ্য ও প্রাণিস¤পদ বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও
গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ছয় সদস্যের আরেকটি আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন টিম।
এর আগে সুন্দরগঞ্জে কুকুরের কামড়ে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ও চিকিৎসার বিষয়াদি খতিয়ে দেখতে গত ১৯ মে ওই এলাকায় এসেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল (আইইডিসিআর)। যদিও ওই তদন্তের প্রতিবেদন এবং পরবর্তী কোনো আপডেট এখনও সামনে আসেনি।
চিকিৎসকরা জানান, র্যাবিস বা জলাতঙ্ক এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা একবার শরীরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে ¯œায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর প্রায় সব ক্ষেত্রেই মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসা নিলে এই রোগ স¤পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভির রহমান কল্লোল (জুনিয়র কনসালটেন্ট, কার্ডিয়াক) বলেন, র্যাবিস একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, বানর বা অন্যান্য সংক্রমিত প্রাণির কামড়, আঁচড় বা লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই ভাইরাস ¯œায়ুতন্ত্র হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটায়। ডা. কল্লোল বলেন, যেহেতু এটি ¯œায়ুতন্ত্র হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটায়, সেহেতু মাথার যত কাছাকাছি কামড়ের ক্ষতস্থান হবে, তত দ্রæত এটি মস্তিষ্কে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাবে। সেক্ষেত্রে খুব অল্প সময়ের মধ্যেও আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণি মারা যেতে পারে।
প্রশাসন, পৌরসভা ও প্রাণিস¤পদ-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সুন্দরগঞ্জে ২২ এপ্রিলের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুর পর তৎপরতা শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। সে সময় সুন্দরগঞ্জে ১ হাজার ১৭৫টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এরপর আর করা হয়নি। এছাড়া সদর পৌরসভায় সিরাজগঞ্জ থেকে আসা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ৮৩০টি এবং স¤প্রতি সাদুল্লাপুরে ২০০টি কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। গাইবান্ধা পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু হানিফ বলেন, আমাদের তো এক্সপার্ট নেই, প্রশিক্ষিত জনবল নেই এবং এসবের পরিকল্পনাও নেই। মূলত এসবের দায়িত্ব কোন দপ্তরের, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের আইনে (পৌরসভা) বলা আছে বিপজ্জনক প্রাণি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু ২০১৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে কুকুর নিধন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ৭-৮ বছর আগে প্রাণিস¤পদের কুকুর বন্ধ্যাকরণ একটি কার্যক্রম ছিল, সেটিও বন্ধ রয়েছে। মূলত সরকার যখন যাকে এটির দায়িত্ব দেবে, দায়িত্ব তারই।
সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তানভীক জাহান বলেন, আমরা প্রত্যেকেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ এবং সহজ প্রতিকার মানুষকে ম্যাস ভ্যাকসিনেশন করা। তবেই সুরক্ষা নিশ্চিত সম্ভব।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. জোবাইদুল কবীর বলেন, পর্যবেক্ষক টিম আমাদের কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের পরামর্শের সঙ্গে আমাদের কার্যক্রমের মিল রয়েছে, যা আমরা আগেই বাস্তবায়ন করেছি। এ সময় তিনি শিশুদের একা না ছাড়ার এবং কুকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে পথ না চলার পরামর্শ দেন।
গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান বলেন, আমাদের ভ্যাকসিনের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। কুকুরের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের সুরক্ষায় প্রয়োজন অবশ্যই ডগ ম্যাস ভ্যাকসিনেশন। তবেই সবার সুরক্ষা সম্ভব, অন্যথায় সবারই ঝুঁকি থেকে যাবে।
দিনাজপুরে গাওসুল আযম বিএনএসবি আই হসপিটালের আয়োজনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করলেন এডিসি জেনারেল
মোঃ ইউসুফ আলী, দিনাজপুর প্রতিনিধি।। গাওসুল আযম বিএনএসবি আই হসপিটাল দিনাজপুর এর আয়োজনে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ বান্ধব হাসপাতাল- চোখের সেবায়...









