মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
২৬ বছর ধরে হাতে ছিল চক, সামনে ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী। শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও নিরলস চেষ্টা করেছেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে সেই প্রিয় শিক্ষক সজল কান্তি নাথ যখন বিদায় নিলেন, তখন আবেগে ভারী হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী জোরারগঞ্জ জে.বি. উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিবেশ। বিদায়ের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক শিক্ষার্থী। শেষ পর্যন্ত প্রিয় শিক্ষককে বহনকারী গাড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেন শিক্ষার্থীরা।
২০০০ সালে জোরারগঞ্জ জে.বি. উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন সজল কান্তি নাথ। দীর্ঘ ২৬ বছর নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরজনিত বিদায় নেন তিনি। বিদায়ের দিন সকালে শেষবারের মতো বিদ্যালয়ে হাজিরা দেন তিনি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেষ পাঠদানও করেন। এরপর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বিদায়ী সংবর্ধনার। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু তুষার কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক সুভাষ সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন সহকারী শিক্ষক সুব্রত বড়ুয়া, হেড মাওলানা আনোয়ার হোসেন, টুংকেল বড়ুয়াসহ শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
অনুষ্ঠানে সজল কান্তি নাথের হাতে উপহার তুলে দেওয়া হয়। পরে কেক কেটে তাঁকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।বিদায়ের শেষ মুহূর্তে ফুলেল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন প্রিয় শিক্ষক। স্কাউট সদস্য ও শিক্ষার্থীরা ফুল ছিটিয়ে তাঁকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বিদায় জানান। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীকে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। কেউ কেউ প্রিয় শিক্ষকের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য তৈরি হয় বিদ্যালয় ছাড়ার পর। সজল কান্তি নাথকে বহনকারী গাড়ি বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল শিক্ষার্থী পেছনে ছুটতে শুরু করে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ গাড়ির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। এভাবে বিদ্যালয় থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত ছুটে যায় শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের এমন ভালোবাসার দৃশ্য আবেগাপ্লুত করে তোলে উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক ও আশপাশের মানুষকেও। ২৬ বছরের শিক্ষকতা শেষে অবসর নিলেন সজল কান্তি নাথ, কিন্তু তাঁর শিক্ষার্থীদের চোখের জল যেন বলে গেল—শিক্ষকের অবসর হয়, কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের কখনো অবসর হয় না।
বিদায়ী শিক্ষক সজল কান্তি নাথ বলেন, “এই বিদ্যালয় আমার জীবনের ২৬টি বছরকে স্মৃতিতে ভরিয়ে দিয়েছে। কত শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছি, তাদের সঙ্গে কত স্মৃতি—সবকিছু আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো কোনো ভুল হয়ে থাকলে সবাই ক্ষমা করবেন। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সহকর্মীদের আন্তরিকতা আমি সারাজীবন মনে রাখব। আজ বিদায় নিলেও এই বিদ্যালয় ও আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কখনো মন থেকে দূরে যেতে পারব না।”
সহকারী প্রধান শিক্ষক সুভাষ সরকার বলেন, “সজল কান্তি নাথ স্যারের সঙ্গে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তিনি দায়িত্বের প্রতি সবসময় আন্তরিক ছিলেন। একজন সহকর্মী হিসেবে যেমন ছিলেন নির্ভরতার জায়গা, তেমনি শিক্ষার্থীদের কাছেও ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর অবসর আমাদের জন্য আনন্দের চেয়ে বেশি বেদনার। কর্মজীবন শেষ হলেও তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি ও অবদান আমাদের বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন থাকবে।”
প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, “একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন তাঁর ছাত্রদের ভালোবাসা। সজল কান্তি নাথ স্যার আজ যে ভালোবাসা নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন, সেটিই তাঁর ২৬ বছরের শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মতো একজন নিবেদিত শিক্ষককে বিদায় দিতে গিয়ে আমরা আবেগাপ্লুত। তাঁর অবসরজীবন সুন্দর ও শান্তিময় হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”









