কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ভূমি কেবল কোনো অর্থনৈতিক উৎপাদন-মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মৌলিক মানবাধিকারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের প্রবৃদ্ধি ও দৃশ্যমান কাঠামোগত উন্নয়নের ডামাডলোর আড়ালে এখনো একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের নূন্যতম মাথা গোঁজার ঠাঁই তথা ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। জলবায়ু পরিবর্তন, ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত নদীভাঙন এবং কাঠামোগত সামাজিক বৈщем্যের কারণে প্রতি বছর দেশে ভূমিহীন মানুষের দীর্ঘ তালিকা তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
জাতীয় পত্রিকার পাতায় কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রায়শই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির সাফল্যের কথা বলা হয়। কিন্তু সেই অর্থনীতির চালিকাশক্তি যে প্রান্তিক মানুষ, তাদের ভূমিহীনতার পরিসংখ্যানগত চিত্রটি চরম উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সরকারের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর মানদণ্ড ও বিভিন্ন স্বাধীন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিজের কোনো জমি নেই এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ। তবে মাঠপর্যায়ের আরও গভীর বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৬৩ শতাংশ খানা বা পরিবার কার্যকরীভাবে ভূমিহীন (Functionally Landless)। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি পরিবারের কোনো আবাদি কৃষিজমি নেই, কিংবা তাদের জমির পরিমাণ মাত্র ০.০৫ একরের চেয়ে কম—যা দিয়ে একটি পরিবারের পক্ষে নূন্যতম মৌলিক জীবিকা নির্বাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে খানা বা পরিবারের এই শতকরা হারটি কয়েক লক্ষ প্রান্তিক মানুষের আজীবনের দীর্ঘশ্বাস ও চরম বঞ্চনাকে ধারণ করে।
বাংলাদেশে ভূমিহীনতা কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপত্তি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রাকৃতিক বাস্তবতার যৌথ ফল। গবেষণায় এই সংকটের প্রধান তিনটি কারণ বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও উদ্বাস্তু সংকট। পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী সংলাপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ১ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে (Climate Migrants) পরিণত হয়েছে, যাদের একটি বিশাল অংশ উপকূলীয় এলাকায় ক্রমাগত নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, খাস জমি বণ্টনে কাঠামোগত অনিয়ম। নীতিগতভাবে সরকারি কৃষি খাস জমি ভূমিহীনদের মাঝে দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করা দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ‘ভূমি গ্রাস’ (Land Grabbing) সংস্কৃতির কারণে প্রকৃত ভূমিহীনদের সিংহভাগই এই অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। তৃতীয়ত, আইনি জটিলতা ও জাবলীয়াতি। ত্রুটিপূর্ণ ভূমি রেকর্ড ও জাল দলিলের শিকার হয়ে দেওয়ানি মামলার বেড়াজালে আটকা পড়ে বহু ক্ষুদ্র চাষী ও প্রান্তিক নৃগোষ্ঠী নিজেদের পৈতৃক জমি হারাচ্ছেন।
ভূমিহীনতার এই দুষ্টচক্র সমাজে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি করছে, যার প্রভাব বহুমুখী। গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও নিজস্ব ভূমির অধিকার না থাকায় বাধ্য হয়ে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোর বস্তি জীবন নিয়ে করা বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের নতুন বস্তিবাসীদের প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের সাবেক ভূমিহীন বা জলবায়ু উদ্বাস্তু। নিজস্ব আবাদি জমি না থাকায় এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাজারের অস্থিরতার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সামান্য মূল্যস্ফীতি ঘটলেও সবার আগে এদের খাদ্য তালিকায় পুষ্টির চরম ঘাটতি দেখা দেয়।
জাতীয় পর্যায়ে এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রথমত, চলমান ডিজিটাল ভূমি জরিপের (স্মার্ট ভূমিসেবা) আওতায় দেশের প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার এবং উদ্ধারযোগ্য খাস জমির একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে উদ্ধারকৃত খাস জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে দ্রুত বণ্টন করতে হবে এবং তাদের নামে দলিলের আইনি মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি লড়াইয়ে অক্ষম দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে ‘লিগ্যাল এইড’ বা আইনি সহায়তা সেবা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যেন জালিয়াতির মাধ্যমে কেউ তাদের জমি কেড়ে নিতে না পারে। চতুর্থত, উপকূলীয় ও চরাঞ্চলে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য টেকসই গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল কোনো সরকারের দাতব্য বা পুনর্বাসন প্রকল্পের অনুদান নয়, এটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-1: সর্বাত্মক দারিদ্র্য নির্মূল) পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রেখে তা সম্ভব নয়। সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমি প্রশাসন এবং ভূমি সংস্কার আন্দোলনগুলোর যৌথ সমন্বয়েই কেবল একটি বৈষম্যহীন, সাম্য ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব।
ছামিউল আলম রাসু
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন
তথ্যসূত্র ও সহায়িকা:
১. কৃষি শুমারি ও জাতীয় ভলিউম রিপোর্ট, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)
২. ভূমিহীনতা, খাস জমি অধিকার ও গ্রামীণ অর্থনীতি সমীক্ষা প্রতিবেদন
৩. জলবায়ু অভিঘাত, উদ্বাস্তু ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বিষয়ক বিশেষ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংকলন






