ভিয়েতনামের গেরিলা যোদ্ধারা ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে মার্কিন সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাত,মার্কিন সেনারা এদের সাথে কোনভাবেই সুবিধা করে উঠতে পারছিলনা।
তাই মার্কিন নীতি নির্ধারকরা ভাবল জঙ্গলটাই যদি না থাকে তবে গেরিলারা লুকাবে কোথায়?আর দ্বিতীয়ত,তারা ভিয়েতনামের সাধারণ কৃষকদের ভাতে মারতে চেয়েছিল।
তাদের পরিকল্পনা ছিল,মাঠের ফসল ধ্বংস হয়ে গেলে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে গ্রামীণ মানুষগুলো সব মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে আশ্রয় নেবে এবং এতে গেরিলাদের রসদ ও জনসমর্থন দুটোই বন্ধ হয়ে যাবে।
ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন র্যাঞ্চ হ্যান্ড’ নামে একটি গোপন ও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা হাতে নেয়।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনামের ওই সবুজ জঙ্গল আর ফসলের মাঠগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া।এই জন্য তারা প্রায় দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আকাশ থেকে ভিয়েতনামের বুকে প্রায় ৮০ কোটি লিটার বিষাক্ত রাসায়নিক তরল ছিটায়,যার নাম ছিল ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’।
এই রাসায়নিকের মধ্যে মেশানো ছিল ডাইঅক্সিন নামের এক মরণঘাতী বিষ, যার সামান্য এক ফোঁটা যেকোনো প্রাণকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আমেরিকার এই আত্মঘাতী হামলায় ভিয়েতনামের প্রায় ২০ শতাংশ ঘন বনাঞ্চল চোখের পলকে মরুভূমি হয়ে যায় এবং এক কোটি হেক্টর কৃষিজমি চিরতরে বিষাক্ত হয়ে পড়ে।
এই নিষ্ঠুর পরিকল্পনাটি কাজও করেছিল।কয়েক বছরের মধ্যে শহরের জনসংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে যায় এবং প্রায় পনের লাখ মানুষ সাইগনের নোংরা বস্তিগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়, ওদিকে মার্কিন সেনারা সেখানে রাজকীয় বিলাসবহুল জীবন পার করছিল।
কিন্তু এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুরু হয় মানুষের শরীর নিয়ে,যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে প্রায় ৪৮ লাখ ভিয়েতনামী মারাত্মকভাবে বিষাক্রান্ত হয়,যার মধ্যে চার লাখ মানুষ সাথে সাথেই মারা যায় বা পঙ্গু হয়ে যায়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ব্যাপার হলো, এই বিষ মানুষের ডিএনএ বা জিনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫ লাখ শিশু মারাত্মক জন্মগত বিকৃতি নিয়ে পৃথিবীতে আসে।
কারও হাত-পায়ে অতিরিক্ত আঙুল, কারও কাটা ঠোঁট-তালু,আবার কেউ জন্মায় চরম মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। ক্যান্সার আর স্নায়ুরোগের মতো প্রায় বিশটিরও বেশি প্রাণঘাতী অসুখ ভিয়েতনামের ঘরে ঘরে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার আজ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে,অথচ ভিয়েতনামের মাটি ও পানি আজও সেই বিষের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।
এখনও বহু এলাকায় মাটির নিচে মারাত্মক মাত্রায় ডাইঅক্সিন পাওয়া যায়,সেখানকার নদী বা পুকুরের মাছ খাওয়া আজও মানুষের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুর সমান।
আর এখানেই প্রকাশ পায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরম দ্বিমুখী চরিত্র।
যে মোড়লরা একটা আস্ত দেশের মাটিকে বিষ খাইয়ে উজাড় করে দিল, কয়েক লাখ নিষ্পাপ শিশুকে পঙ্গু বানিয়ে দিল, তারা আজও সাদা চামড়ার স্যুট-কোট পরে গ্লোবাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাকি দুনিয়াকে ‘মানবাধিকার’ আর ‘মানবতার’ সবক দেয়!
আমেরিকা আজ অব্দি ভিয়েতনামের ওই বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মানো লাখ লাখ বাচ্চার জন্য একটা কানা কড়িও দেয়নি। জাতিসংঘের মতো বড় বড় ঠুঁটো জগন্নাথ আর আন্তর্জাতিক আদালতের মাতব্বররাও এই ব্যাপারে কোন মায়া দেখায়নি।
এটাই হলো পশ্চিমাদের তথাকথিত ‘সভ্য দুনিয়া’ আর ‘আইনের শাসনের’ আসল নগ্ন রূপ ।
সংগৃহীত









