কাজী নজরুল ইসলামের “ক্ষুধা খোদাকে ভোলায় কিন্তু খোদা ক্ষুধাকে না” (পূর্ণ রূপ: “ক্ষুধাকে দেখেছি বহুবার কিন্তু খোদাকে একবারও নয়। ক্ষুধা খোদাকে ভোলায় কিন্তু খোদা ক্ষুধাকে নয়।”) এটি তাঁর ১৯৩০ সালে প্রকাশিত মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের একটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ গদ্য সংলাপ।
নিচে এই উক্তিটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার স্বরূপ:
কাজী নজরুল ইসলামের লেখা মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসে কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়কের নিম্নবর্গের মানুষের অবর্ণনীয় দারিদ্র্য, অনাহার এবং বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রামের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কবি নিজে চরম দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। তাই মানুষের পেটের ভেতরের ক্ষুধা যে কতটা নির্মম ও বাস্তব, তা তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন।
২. লাইনভিত্তিক বিশ্লেষণ:
“ক্ষুধাকে দেখেছি বহুবার কিন্তু খোদাকে একবারও নয়।”এখানে লেখক মানুষের টিকে থাকার বস্তুগত ও শারীরিক সত্যটিকে তুলে ধরেছেন। মানুষের জীবনে খাদ্যাভাব ও ক্ষুধার রূপটি এতই প্রত্যক্ষ ও যন্ত্রণাদায়ক যে তা খালি চোখে প্রতিদিন দেখা যায়। পক্ষান্তরে, চর্মচক্ষুতে সৃষ্টিকর্তাকে সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—মানুষের কাছে ক্ষুধার্ত পেটের হাহাকারই সবচেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা।
“ক্ষুধা খোদাকে ভোলায়…”
তীব্র ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মানুষের নৈতিকতা, চেতনা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে ওলটপালট করে দেয়। একটানা অনাহারে থাকা মানুষ পেটের জ্বালায় এতটাই দিশেহারা হয়ে পড়ে যে তখন তার কাছে ধর্ম বা খোদার উপাসনার চেয়ে একমুঠো অন্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। বেঁচে থাকার আদিম তাড়না মানুষকে সাময়িকভাবে খোদার স্মরণ থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে বাধ্য করে। কিন্তু খোদা ক্ষুধাকে নয়।”মানুষ অভাবের তাড়নায় স্রষ্টাকে ভুলে গেলেও স্রষ্টা বা খোদা কিন্তু মানুষের সেই ক্ষুধার কষ্টকে উপেক্ষা করেন না। এখানে নজরুলের মানবতাবাদী সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, মানুষের প্রকৃত স্রষ্টা বা পরম করুণাময় সর্বদা নিপীড়িত ও ক্ষুধার্ত মানুষের ব্যথায় সমব্যথী। কিন্তু সমাজের তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ী ও ভণ্ডরা গরিবের ক্ষুধার খবর রাখে না, তারা কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকে।
৩. মূল সুর:
মানবতাবাদ ও প্রতিবাদ:
এই কালজয়ী সংলাপটির মূল বার্তা হলো—ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের অন্ন ও জীবনের অধিকার অনেক বড়। নজরুল ধর্মকে মানুষের মুক্তির মাধ্যম হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, শোষণের হাতিয়ার হিসেবে নয়। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং তাদের কষ্ট দূর করাই যে প্রকৃত মনুষ্যত্ব ও ইবাদত, এই উক্তিটিতে সেই সত্যটিই অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে। [
উক্তিটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
‘ক্ষুধাকে দেখেছি বহুবার কিন্তু খোদাকে একবারও নয়’: নজরুল তার জীবন এবং সাহিত্যকর্মে মানুষের চরম কষ্ট, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার দৃশ্য বারবার দেখেছেন। তিনি দেখেছেন ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, খোদা বা সৃষ্টিকর্তাকে তিনি চর্মচক্ষুতে দেখেননি। এর মানে হলো, মানুষ ক্ষুধার সময় খোদার চেয়ে খাদ্যকেই বেশি সত্য বলে মনে করে।
‘ক্ষুধা খোদাকে ভোলায়’:
যখন কোনো মানুষ দীর্ঘ সাত দিন ক্ষুধার্ত থাকে (যেমন তার ‘মানুষ’ কবিতায়-“খাইনিকো সাত দিন”), তখন তার অস্তিত্বের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় খাদ্য। তখন ইবাদত বা ধর্মীয় চেতনা ক্ষুধার তীব্রতায় ম্লান হয়ে যায়। অর্থাৎ, ক্ষুধা মানুষকে খোদার কথা ভোলাতে পারে, কারণ অস্তিত্ব রক্ষা করাই তখন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
‘কিন্তু খোদা ক্ষুধাকে নয়’:
মানুষ ক্ষুধার সময় খোদাকে ভুলে গেলেও, খোদা (সৃষ্টিকর্তা) ক্ষুধার্ত মানুষকে বা ক্ষুধার কষ্টকে ভোলে না। এখানে নজরুল বোঝাতে চেয়েছেন, স্রষ্টা মানুষের অসহায়ত্বের প্রতি সমব্যথী। কিন্তু মানুষের তৈরি সমাজ বা ধর্মের নামে ভণ্ডরা ক্ষুধার্তের খোঁজ রাখে না, তারা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত থাকে।
নজরুল কেন এমনটি বলেছিলেন?
১. ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ:
তিনি ধর্ম নিয়ে ভণ্ডামি ও মানুষের দুঃখকে উপেক্ষা করার তীব্র সমালোচনা করতেন।
২. মানবতাবাদ:
নজরুলের কাছে ক্ষুধার্ত মানুষের পেটের ক্ষুধা মেটানোই ছিল বড় ইবাদত। তিনি ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”।
৩. দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা:
নজরুল নিজেও চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন (বাঁধন ভাঙার কবি), তাই ক্ষুধার প্রকৃত রূপ তিনি জানতেন।
সংক্ষেপে:
এই উক্তিটি ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ এবং মানবতার প্রতি নজরুলের গভীর দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ, যা ধর্মীয় কুসংস্কারের চেয়ে মানুষকে (মানবতাকে) প্রাধান্য দেয়। 😭
তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী








