খুব বেশিদিন আগের কথা না, গত ১৬ জুলাইয়ের কথা। আবু সাঈদ সহ সাতজনকে ওইদিন পুলিশ ও ছাত্রলীগ মেরে ফেলে। তার আগেরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টোকাই এসে ছেলেমেয়েদের মেরে রক্তাক্ত করেছে। আমি এর আগেরদিন গণভবন পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছি,হেঁটে এসেছি,রাতে আবার বের হয়েছি মেয়েদের নিয়ে, তার উপর দুইদিন না খাওয়া। শরীর আর চলল না পরেরদিন। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল, কোনোরকমে হাতমুখ ধুয়ে টিভিরুমে এসে বসলাম। খানিকক্ষণ পর দেখি মেয়েগুলো কাঁদতে কাঁদতে হলে ঢুকছে। প্রত্যেকটা মেয়ে আহত। একটা মেয়েও সুস্থ অবস্থায় হলে ফেরে নাই। আমার হতবিহ্বল অবস্থা তখন। জুনিয়রগুলো এসে জড়িয়ে ধরে ধরে কাঁদছে, অথচ আমার কিছু করার নাই। কয়েকজন আবার আটকা পড়েছে এদিক-ওদিক। তাদেরকে উদ্ধার করে আনার কথা বলতে গেলাম হাউজ টিউটর ম্যামদের।
এরমধ্যে নুসরাত কল দিলো, ও আসতে পারছে না হেঁটে, জগন্নাথের গেটে গেলাম ওকে আনতে। আমরা যখন পাগলের মতো ছোটাছুটি করছি, সেই মুহূর্তে দেখি ছাত্রলীগের মেয়েরা হাসতে হাসতে হলে ঢুকছে। আমার হলের জান্নাত নামের এক ছাত্রলীগ নেত্রীর হাসি আরো বেড়ে গেল আমাকে হলগেটে বিধ্বস্ত অবস্থায় দাঁড়ায় থাকতে দেখে।
মেয়েদের মধ্যে আশঙ্কা, হলের মধ্যে না টোকাই ঢুকে পড়ে। আমি আর নুসরাত সবাইকে ডেকে এনে লাঠি জোগাড় করে রাখতে বললাম। মেয়েগুলো আতঙ্কে অস্থির হয়ে যেখানে যা পেয়েছে নিয়ে এসেছে। রাতে আবার মশাল মিছিল করার কথা। মেয়েদের নিয়ে বসে বসে মশাল বানাবো। তখনই টিভিরুমে ছাত্রলীগের আরেক নেত্রীর আগমন। মেয়েরা আহাজারি করে কাঁদছে, সে এসে টিভি দেখবে, অথচ জীবনেও টিভিরুমে আসে না। আবার লুকিয়ে আমাদের ভিডিও করছে। ম্যামদের বলার পরে তারা নিয়ে গেলেন সেই মেয়েকে বাবা-সোনা বলে।
এদিকে আমাদের হল ছাত্রলীগের সভাপতি খাদিজা ঊর্মি মেয়েদের লাঠি কুড়িয়ে আনার ভিডিও পোস্ট করে লিখেছে যে আমরা না কি তাদের মারার জন্য লাঠি এনেছি, সেই ভিডিও আবার তিনি পাতি নেতাদের কাছেও সার্কুলেট করেছেন।
১৬ তারিখ, তখন সন্ধ্যা হয় হয়, আমরা কাঁদছি বসে বসে, আতঙ্কে-আশঙ্কায় অসুস্থ সবাই। ছাত্রলীগের মেয়েরা রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়িয়ে ‘মধু হই হই,আরে বিষ হাওয়াইলা’ গান গাচ্ছে, সাথে আরো যত সব থার্ড ক্লাস প্রেমের গান। কারণ কী জানেন? কারণ সেদিন সাতজন মানুষকে গুলি করে মারা হয়েছে। তারা এতে আনন্দিত হয়ে গান গেয়েছে।
আমি সেদিনের কথা ভুলি নাই। মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে তোমাদের উল্লাস করার কথা ভুলি নাই। তোমাদের সেই গান আমার কানে এখনো বাজে আর ঘৃণায় গা কুঁকড়ে আসে। এতদিন শুনেছি মেয়েদের মনে দয়ামায়া বেশি, অথচ এতগুলো মায়ের কোল খালি হওয়ায় তোমরা উল্লাসে গান গেয়েছো। আমি সারাজীবন তোমাদের জন্য দোয়া করবো যেন তোমরাও একদিন মা হতে পারো, মায়ের কোল খালি হওয়ার কষ্ট একদিন তোমাদেরও হোক।








