রিপোর্টার: কে.এম. তোফাজ্জেল হোসেন জুয়েল:-
একদিকে কেউ হচ্ছে আকাশছোঁয়া টাকার মালিক, অন্যদিকে বাংলার মধ্যবিত্ত ও ছোটখাটো ব্যবসায়ীরা হারাচ্ছে তাদের শেষ সম্বল। এই বৈষম্য শুধু আয়-বিত্তে নয়, সুযোগ-সুবিধা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যাংকিং সিস্টেম এমনকি সামাজিক সম্মানেও চরমভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা যখন ন্যূনতম পুঁজি আর পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠছেন—প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যবস্থায় সত্যিই কি ন্যায়বিচার আছে?
হঠাৎ ধনী, হঠাৎ নিঃস্ব: বৈষম্যের পেছনের চিত্র
গত এক দশকে দেশের অর্থনীতি অভূতপূর্ব হারে প্রবৃদ্ধি দেখালেও এই প্রবৃদ্ধির ফল উপভোগ করছে এক ক্ষুদ্র অংশের অভিজাত শ্রেণি। ঢাকার গুলশান, বনানী, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ, সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবা খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় গজিয়ে উঠেছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, শপিং মল, পাঁচতারা হোটেল। অন্যদিকে,ঢাকা সাভার সহ, রাজশাহীর বাঘা, কুষ্টিয়ার খোকসা, যশোরের মনিরামপুর কিংবা নেত্রকোনার বারহাট্টায় ছোট ছোট ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন হাজারো মানুষ।
তাদের অভিযোগ, ক্রমাগত বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, ভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, অথচ বাড়ছে না বিক্রি বা আয়। এরই মধ্যে ব্যাংক ঋণ পেতে হয় দালালের মাধ্যমে, যেখানে জামানত ও ঘুষ ছাড়া এগোনো অসম্ভব। ফলে তারা নিরুপায় হয়ে পড়ছেন তথাকথিত এনজিওদের চমকপ্রদ অফারের দিকে।
ঋণের ফাঁদ: এনজিওর লোভনীয় বিজ্ঞাপন আর কঠিন বাস্তবতা
“দ্রুত ঋণ, সহজ কিস্তি, জামানত ছাড়া পুঁজি”—এই লোভনীয় বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে হাজারো ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়ছেন ক্ষুদ্রঋণদানকারী এনজিওগুলোর জালে। প্রথমে ১০ হাজার, পরে ৫০ হাজার, তারপর এক লাখ—এইভাবে বাড়তে থাকে ঋণের পরিমাণ, এবং একই সঙ্গে বাড়ে কিস্তির চাপ। অনেকক্ষেত্রে সুদের হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা কার্যত একটি বৈধ মহাজনী প্রথারই রূপ।
সাভার উপজেলার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন,
“একটা ছোট ব্যবসা চালাই।তিন লাখ টাকা এনজিও থেকে নিয়েছিলাম ফ্যাক্টরিতে কেমিক্যাল সাপ্লাই দেওয়ার জন্য কিন্তু ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ জন্য গার্মেন্টস এর মেশিন ওয়েলে ব্যবসা একেবারে গুছিয়ে তোলার মতন অবস্থা দাম বেশি হয় লাভ হচ্ছে না কি নিয়ে পড়তে হচ্ছে লোকসানে । বাকি করে দিন চলছে ওনাহারে আমাদের মত ছোট ব্যবসায়ীর দিকে সরকার একটু মানবতার দৃষ্টি দিলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব বলে আমি মনে করি। কিন্তু মাসে মাসে সুদসহ কিস্তি দিতে দিতে এখন ঘরে চিনি নেই, চাল নেই। আবার বলছে রিনিউ না করলে কোর্টে দেবে।”
এই চিত্র গ্রামবাংলার প্রতিটি প্রান্তে আজ সাধারণ।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব: কারা পাচ্ছে সুযোগ?
যেখানে সরকারের পক্ষে ঘোষিত রয়েছে “উদ্যোক্তা উন্নয়ন”, “ব্যবসা সহজীকরণ”, “ডিজিটাল SME সহায়তা” প্রভৃতি প্রকল্প—সেখানে দেখা যায় এইসব প্রকল্পের সুবিধা কেবল নগরকেন্দ্রিক প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ীর হাতে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা জানেনই না কিভাবে এই সুবিধা পেতে হয়।
চট্টগ্রামের পটিয়ার কাঁচামালের ব্যবসায়ী রওশন আলী বলেন,
“আমি অনেকবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা অফিসে গেছি। বলছে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। কিন্তু আমি তো ঠিকমতো মোবাইল চালাতেই পারি না। সেখানেই শেষ।”
বেকারত্ব, হতাশা ও আত্মহত্যার মিছিল
এই সংকট শুধু আর্থিক নয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকও বটে। ব্যবসা হারানোর পর অনেকেই পড়ছেন চরম হতাশায়। বিশেষত যেসব পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ব্যবসা চালাতেন, তাদের মধ্যে অনেকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুযায়ী, গত তিন বছরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমাধান কোথায়?
1. সরকারি তদারকি বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
এনজিও ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং, সুদের হার বেঁধে দেওয়া এবং যথাযথ লাইসেন্স ছাড়া ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি।
2. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য সহজশর্তে জামানতবিহীন সরকারি ঋণ চালু করা
যেসব ব্যবসায়ীরা এনজিও ঋণে জর্জরিত, তাদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ ও আর্থিক সহায়তা জরুরি।
3. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে SME হেল্প ডেস্ক চালু করা
যেখান থেকে গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সরাসরি সহযোগিতা পাবেন এবং ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া শিখতে পারবেন।
4. ঋণগ্রস্তদের জন্য কাউন্সেলিং ও প্রশিন Service:-র্যক্রম
হতাশাগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্তদের মানসিক পুনর্বাসনের জন্য সামাজিক সংগঠন ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলার ব্যবসা মানেই এখন অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি, ও কিস্তির বোঝা। অথচ একই সময়ে একদল মানুষ রাতারাতি ধনকুবের হয়ে উঠছে নানা লুটপাট, কমিশন ব্যবসা, অথবা অপ্রকাশ্য সূত্রে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ও প্রশাসনিক এক রূপান্তরের দরকার। মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে—বাংলাদেশ হারাবে তার উৎপাদনশীল ও পরিশ্রমী এক বড় জনগোষ্ঠীকে।