শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু একটি সাধারণ সমস্যা নয়, এটি আজ আমাদের নাগরিক জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো দ্রুত নগরায়িত শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা একদিকে যেমন পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে নাগরিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে (ঢাকা পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্র, ২০২১)। এটি এমন একটি সমস্যা, যা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং এর প্রভাব সবার জীবনেই পড়ছে। আমরা যতই এই সংকটের দিকে দৃষ্টি না দিই, ততই এটি আমাদের চারপাশে বিস্তার লাভ করছে। ঢাকার রাস্তা, পাড়া-মহল্লা, বাজারÑ প্রতিটি স্থান প্লাস্টিক বর্জ্য ও আবর্জনায় ভরা এবং এটি শুধু শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করছে, যা প্রত্যক্ষভাবে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলছে (বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর, ২০২০)।
প্রথমত, ঢাকার বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। শহরের নানা এলাকার সড়কে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পলিথিনের স্তূপ নানা সমস্যার সূত্রপাত করছে (ঢাকা পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্র, ২০২১)।
দ্বিতীয়ত, শহরে ডাস্টবিনের অভাব একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি করছে। যেখানে জনসাধারণ বর্জ্য ফেলতে সক্ষম হবে, সেখানে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকার কারণে অনেকেই তাদের আবর্জনা রাস্তায়, গলিতে বা খোলা মাঠে ফেলে দিচ্ছে (ঢাকা সিটি করপোরেশন, ২০২১)।
তৃতীয়ত, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং কম্পোস্টিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা উচিত। অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্টিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২১)। বর্তমানে ঢাকার মতো শহরগুলোতে এসব ব্যবস্থার অপ্রতুলতা খুব স্পষ্ট। কম্পোস্টিং মাধ্যমে জৈব বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন করা যেতে পারে, যা কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২১)। আর পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের মাধ্যমে গৃহস্থালির বর্জ্য থেকে নতুন উপকরণ তৈরি করা সম্ভব।
এ ছাড়া সবুজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং পিআরআইএস (চঁনষরপ জবপুপষরহম ওহরঃরধঃরাবং) প্রচলন করা অত্যন্ত জরুরি (বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর, ২০২০)। গ্রাম থেকে শহরে, প্রত্যেকটি মানুষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজসেবা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
১. মিরপুরে চালু ‘স্মার্ট বিন’ পাইলট প্রকল্পে রুট অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের সময় ১৮% কমাতে সমর্থ হয়েছে, তবে একই সার্ভিস দক্ষিণ মিরপুরে প্রায় অপ্রতুল, যা সেবাবৈষম্য ফুটিয়ে তোলে।
২. উত্তর সিটির ‘ডস্ট ট্র্যাক’ মোবাইল অ্যাপে প্রতিদিন ২,০০০-এরও বেশি ট্র্যাশ পয়েন্ট রিপোর্টিং স্বয়ংক্রিয়করণ আনলেও গ্রামীণ প্রান্তিক এলাকায় টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ট্রেনিংয়ের অভাবে ব্যবহার এখনও মার্জিত হয়নি।
৩. গুলশানের বেসরকারি-সরকারি অংশীদারত্বে চালু কমিউনিটি কম্পোস্টিং সেন্টারে প্রথম বছরে ১৫০ টন জৈব বর্জ্য সারে রূপান্তর হয়েছে, কিন্তু উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও বাজার সংযুক্তির অভাব টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
৪. ধানমণ্ডিতে পরীক্ষামূলক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ইউনিট বিনিয়োগ পাওয়ার পরও প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রকল্পকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হতে বাধা দিচ্ছে।
৫. রাজধানীর নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য তোলা শুরু হলেও সড়ক পার্শ্বে অনিয়ম, জরিমানার অনুপস্থিতি এবং মনিটরিংয়ের অভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়নি।
৬. বিভিন্ন স্কুল-কলেজে প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পেইন জনপ্রিয়তা পেলেও সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও স্থানীয় এনজিও-সমন্বয়ের অভাবে সচেতনতা দ্রুত ছড়ায়নি।
৭. জাতীয় স্তরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি খসড়ায় আধুনিক স্ট্র্যাটেজি অন্তর্ভুক্ত হলেও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কো-অর্ডিনেশন না থাকায় বাস্তবায়ন স্তরে বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
৮. সরকারি ভর্তুকি ও করছাড়ের মানে অনেক প্রকল্পে অনিয়ম, আর্থিক হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতার অভাবে উন্নয়ন উদ্যোগ আংশিক ও অসম্পূর্ণ নিয়েই থেমে যায়।
৯. সার্বিকভাবে ড. ইউনূস সরকারের উদ্ভাবনী নীতিগুলো প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি ও স্থানীয় অংশীদারত্বের ধারাবাহিক সমর্থন না থাকায় কাক্সিক্ষত ফলাফলের অখণ্ডতা এখনও বাকি।
উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সামাজিক অংশীদারত্ব ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রীয়করণ করি, তাহলে পুরো নগরীকে প্লাস্টিকমুক্ত ও পরিপূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য শহরে রূপান্তর করা সম্ভব।
‘পরিকল্পনা যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে মেলে- তখনই ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি মোড় হয়ে ওঠে পরিচ্ছন্নতার উজ্জ্বল আহ্বান!’
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব : সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান : মার্কেটিং বিভাগের সদস্য, আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি






