মোহাম্মদ সোহেল (টাঙ্গাইল) আজ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থেকে উড়ছে এক নতুন পতাকা “যার নাম তানিশা ” আর এই পতাকা শুধু একটি স্কুল বা একটি জেলার নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের। কারণ, স্বপ্ন যখন বাস্তব হয়, তখন তা সবারই হয়। সবুজে ঘেরা আর
লাল মাটির এই পাহাড়ি বনভূমি
অঞ্চল, যেখানে প্রকৃতি মানুষের স্বপ্নকে ডানা বাঁধতে উৎসাহ জোগায়। আর এই ঘাটাইলের সালেহা ইউসুফজাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী তানিশা। শুনতে পায় না, কথা বলতেও পারে না, কিন্তু তার অর্জন আজ গর্জে বলছে, অসম্ভব বলে কিছু নেই! তানিশার এই সাফল্য শুধু একটি ফলাফল নয়, এটি একটি বিপ্লব। সমাজের সেই গভীর প্রান্ত থেকে আসা এক জয়গান, যেখানে প্রতিবন্ধকতাকে অনেকেই ভাগ্যের অভিশাপ ভেবে নেয়। কিন্তু তানিশা প্রমাণ করল, প্রতিবন্ধকতা শুধু একটি চ্যালেঞ্জ, পরাজয় নয়। তার এই অর্জন সমস্ত তরুণ-তরুণীদের জন্য এক জীবন্ত প্রেরণা তাদের জন্য, যারা নিজেদের প্রতিকূলতায় দমে যায়, হাল ছেড়ে দেয়। তানিশার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার আলো সব বাধা ভেদ করে। সে হয়তো শব্দ শুনতে পায়নি, কিন্তু তার মনের ভেতর জ্বলেছে জ্ঞানের দীপশিখা। সে হয়তো কথা বলতে পারেনি, কিন্তু তার সাফল্য আজ হাজারো তরুণ তরুণীদের কণ্ঠস্বর হয়ে ধ্বনিত হচ্ছে। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, সঠিক সহায়তা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সমর্থন পেলে প্রতিটি মানুষই নিজের স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারে। তানিশার সাফল্য শুধু তার একার নয়, এটি তার পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজেরও সাফল্য। যেখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও সমান তালে এগিয়ে যেতে পারে। আমাদের উচিত তানিশাদের মতো মেধাবীদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। কারণ, একটি সভ্য সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত, যখন তা সবাইকে নিয়ে এগোয়।
তরুণ-তরুণী আজ নিজেদের সংগ্রামে লড়াই করছে। কেউ অর্থাভাবে, কেউ শারীরিক সীমাবদ্ধতায়, কেউবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতায়। কিন্তু তানিশা দেখাল, সংগ্রামই জীবনকে মহিমান্বিত করে। তার এই জিপিএ-৫ শুধু নম্বরের ফলের চেয়ে অনেক বড় এটি একটি দৃষ্টান্ত, একটি প্রেরণা। যেখানে অনেকেই সামান্য প্রতিকূলতায় ভেঙে পড়ে, সেখানে টাঙ্গাইলের তানিশা প্রমাণ করল অক্ষমতা শব্দটির সংজ্ঞা আসলে অক্ষম মানুষের মানসিকতায়। মুখে ভাষা ফুটে না উঠলেও তার মনের ভাষা বিশ্বকে জয় করেছে; শ্রবণশক্তি না থাকলেও তার অধ্যবসায়ের ধ্বনি সমাজের মৌনতা ভেঙেছে। তার এই অসামান্য বিজয় তরুণ প্রজন্মের জন্য এক গভীর দর্শনের আকর, যেখানে প্রতিবন্ধকতাই শুধু নয়, জীবনদর্শনের মূলমন্ত্রও নিহিত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাধা বাইরে নয়, মনের ভিতরে। যে তরুণ আজ হতাশায় ডুবে আছে, সে যেন তানিশার দিকে তাকায়
একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী কন্যা কীভাবে কারিগরি শিক্ষার জটিলতাকে জয় করে জিপিএ-৫-এর মালা পরল! ঝরে পড়া নয়! লড়াই করা জীবনের প্রথম শর্ত। তানিশার গল্পে শিক্ষা হলো প্রতিকূলতা আসলে সাফল্যের অদৃশ্য সোপান। যে তরুণ আজ ব্যর্থতার গ্লানিতে আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে, সে যেন বুঝতে শেখে পাথরই পাথরের মূর্তি গড়ে। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিই মানুষকে শানিত করে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের উচিত ভয়কে জয় করে প্রতিটি বাধাকে সিঁড়ি বানানো। তানিশার সাফল্যের পেছনে তার মা-বাবা ও শিক্ষকদের অক্লিষ্ট সমর্থন ছিল। এতে এটাই প্রমাণ করে একা লড়াই জয়ী হওয়ার নয়। সহযাত্রীরা জয়কে সম্ভব করে। আজকের তরুণদের উচিত নিজেদের আশেপাশের মানুষগুলোর কাছ থেকে শক্তি নেওয়া। অন্ধকারে যখন আলো নিভে আসে, তখন পরিবার ও গুরুজনরাই হয়ে ওঠেন পথের দিশা। তানিশা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে। তার এই স্বপ্নই তাকে এতদূর টেনে এনেছে। স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার শর্ত।এ কথা যেন প্রতিটি তরুণ হৃদয়ে ধারণ করে। স্বপ্নহীন মানুষ যেন নৌকাহীন নাবিক। আজকের যারা হাল ছেড়ে দিতে চায়, তারা যেন জানে যে স্বপ্ন দেখে, পৃথিবী তাকে পথ দেয়। তানিশার গল্প আমাদের সমাজকেও প্রশ্ন করে; আমরা কি প্রতিবন্ধী বা পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করছি? তরুণ প্রজন্মের উচিত এমন সমাজ গড়া, যেখানে অন্যরকম হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, বরং স্বাভাবিক। বৈচিত্র্যেই সভ্যতার সৌন্দর্য।
তানিশা শুধু একটি মেয়ের নাম নয়, এটি একটি দর্শন, এক অমোঘ প্রেরণা। তার জীবন থেকে তরুণরা শিখুক জীবনে হার তখনই, যখন লড়াই থামিয়ে দাও। পৃথিবী কখনো পরাজয় মেনে নেয় না, মেনে নেয় শুধু অধ্যবসায়ের জয়গান।
যে পথে আলো নেই, সে পথেই তুমি আলো হও, তানিশা তা-ই করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম যদি তানিশার মতো অদম্য মানসিকতা ধারণ করে, তবে তাদের পথে কোনো অন্ধকারই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একটাই মন্ত্র; কখনো থামো না।
Post Views: 219
Related