অন্যের দোষ দেখলেই বিচারকের ভূমিকায় যাওয়া আর নিজের বেলায় উকিল হয়ে ওঠা মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা দুঃসাধ্য। সম্মান দেওয়া না গেলেও কাউকে অসম্মান করা উচিত নয়। যারা জীবন সহজ করে দেয়, তাদের দুর্বল ভেবে খারাপ আচরণ করা আসলে নিজের খারাপ চরিত্রের পরিচয়। মানুষের আত্মমর্যাদা সবার আছে—সে ভৃত্য হোক কিংবা মালিক। মনিব হয়ত দাসের সঙ্গে কেবল চুক্তিভিত্তিক স্বার্থ আদায় করতে পারে, কিন্তু তার সম্মানহানির অধিকার রাখে না। যারা অহংকারে ভোগে, ঔদ্ধত্যের বশে অন্যকে অপ্রস্তুত করে এবং লাগামহীন কথাবার্তা বলে, তাদের শিক্ষার ভীতিই প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষকে চিনতে হলে তার কথাবার্তা, কাজের ধরন আর চিন্তাধারাই যথেষ্ট। বড় ডিগ্রি, পদ-পদবি বা বিত্তশালী হলেই মানুষ বড় হয় না—মানুষ বড় হয় আচরণে। সমাজে উচ্চশিক্ষিত অথচ অমানুষ মানুষের অভাব নেই। দশ টাকার ভাড়ায় রিকশায় যাত্রা করেও অনেকে নিজেকে চেনায়—মানুষ না অমানুষ।
যারা নিজে ষোল আনা দাবি করে কিন্তু অন্যের স্বার্থে উদাসীন, তাদের সঙ্গে হয়ত এক কাপ চা খাওয়া যায়, কিন্তু জীবন কাটানো যায় না। যাদের আত্মসমালোচনার বোধ নেই, নিজের ভুল স্বীকারে অক্ষম, কিংবা স্বার্থ বিসর্জনের ক্ষমতা নেই—তাদের সঙ্গ কষ্টকর হয়েই দাঁড়ায়। এমন অনেকে আছেন, যাঁরা অন্যের সন্তানদের সামান্য ভুলেও তীব্র সমালোচনায় মুখর, অথচ নিজের সন্তান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুললেই হন বিচলিত। নিজের অপরাধ যাদের কাছে স্বাভাবিক, অন্যের ভুল যাদের কাছে রসদ—তারা নীতিহীনদ্বিচারিতাররুগ্ণ শিকার। নিজের বেলায় বলেন, “এসব বাদ দাও”, আর পরের বেলায় বলেন, “চেপে ধরো!”- এই মনোভাবেরাই সম্পর্কের ভাঙনে প্রধান ভূমিকা রাখে।
মানুষ, সে যে-ই হোক না কেন, তার অবস্থান অনুযায়ী সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। রিকশাওয়ালার সন্তানদের কাছে তাঁর বাবা-ই হয়ত জীবনের শ্রেষ্ঠ বীর। কাউকে তুচ্ছ মনে করে, খারাপ ব্যবহার করে যদি কেউ নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়, তবে সে নৈতিক দিক থেকে অমানুষ। মানুষের গৌরব আসে তার ব্যবহার, সৌজন্য ও মানবিক আচরণ থেকে—not from profession, position, or possession. যে নেতা বা বস নিজেকে না ছোট করে অন্যকে সম্মান দিতে জানেন, তিনিই সত্যিকারের নেতা। সৌহার্দ্য, সহানুভূতি, এবং সম্মানের ভারসাম্য সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতাবাড়িয়ে তোলে। রূঢ়তা, গোঁয়ার্তুমি, এবং অশ্লীলতা মানুষকে ছোট করে দেয়। পক্ষান্তরে, নরম স্বর, মার্জিত ব্যবহার ও সম্পর্কের উষ্ণতায় মানুষ চিরস্থায়ী সম্মান অর্জন করে।
যে বিনয়ী, সে সম্মানের দাবিদার হয়। কারো উপকার করলে তা কখনোই বৃথা যায় না—সেটা হয়ত ফিরে আসে পরোক্ষভাবে, হয়ত পরে, হয়ত অন্যভাবে। জীবন মানেই প্রতিদান নয়, কিন্তু ভালো কাজের পুরস্কার অনিবার্যভাবেই আসে। সম্পদে সমৃদ্ধি কেউ, সংসারে সুখী কেউ, নীরবে বহু মানুষের জন্যই আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। যারা ভাবে উপকারে লাভ নেই, তারাও ভুল করে। জীবনের এক ধাপ শেষে আরেক ধাপে কর্মফল অপেক্ষায় থাকে। কেননা মানুষ নয়, তার স্রষ্টাই চূড়ান্ত বিচারক, ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই জীবনেই কিংবা পরজীবনে ভালো কর্মের প্রতিদান আসে।
আমরা যদি নিজের দোষের বেলায় বিচারক হই আর অন্যের বেলায় উকিল না হয়ে একটু মানবিক হই, তবে সমাজের অর্ধেক সমস্যার অবসান হতো। “আমি ভুল করতে পারি”, এই বোধ অনুশোচনার বীজ। অহংকার করে, যুক্তি দিয়ে, এবং স্বার্থে অন্ধ হয়ে ভুলকে ঢেকে রাখা আত্মঘাতী। “দুঃখিত” বলতে না পারার জেদের কারণে অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। একটুখানি ছাড়, একটুখানিআত্মত্যাগ, একটুখানিসহনশীলতা জীবনকে সৌন্দর্যময় করে তোলে। অথচ মানুষ ছুটে বেড়ায় ছদ্ম সুখের পেছনে। কেউ ভুল ধরলে শত্রু ভেবে বসে। অথচ সেই ভুলকেই সংশোধনের সুযোগ করে নিতে পারলে জীবনটা আরও সুবাসিত হয়ে ওঠে।
মানুষ বড় হয় না কেবল অর্জনে—বড় হয় বিনয়, সহানুভূতি এবং সম্মানে। নিজে সৎ থাকলে, অন্যের প্রতি সদয় হলে, আর ভুল স্বীকারে সাহসী হলে জীবন যেমন সহজ হয়, তেমনি সমাজও হয় মানবিক। ভুল না মানার গোঁয়ার্তুমি, অসহনশীলতা এবং অন্যকে ছোট করে রাখার প্রবণতা থেকে মুক্ত হলেই মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষের সম্মান পেশায় নয়, আচরণে—এই সত্য হৃদয়ে ধারণ করলে সম্পর্ক যেমন টেকে, জীবনও তেমনি সুন্দর হয়ে ওঠে।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com







