।।এক।।
নারীকে হেয় করে যারা মজা পায়, তাদের আগমনও মায়ের জঠর থেকেই। আগলে রেখেছে বোন, প্রেম ও আদর দিয়েছে বউ, সবচেয়ে বেশি যত্ন করেছে ও ভালোবেসেছে কন্যা। অথচ কথায় কথায় নারীকে তুচ্ছ করা, সুযোগে অপদস্থ করা এবং ছলনাময়ী বলে খোঁচা দেওয়া পুরুষ শেষমেশ আশ্রয়ের আশায় ঘরে ফেরে—সেখানে কোনো এক নারীই তাকে আগলে রাখে। জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়—জীবনের কোন অংশে নারীর অবদান অস্বীকার করা যায়? জীবনটাকেগুছিয়ে দিতে নারী আত্মসুখ বিসর্জন দেয়। সাফল্যকে স্পর্শ করতে নারীই তো প্রেরণা হয়। সফল পুরুষের প্রেরণায় নারীকে পাবেন না—ধরাধামে এমন দৃষ্টান্ত নেই।
অথচ কত বিশ্রীভাবে নারীকে সম্বোধন করা কারো কারো স্বভাবে পরিণত হয়েছে! নারী সহকর্মীকে যথাযথ সম্মান না দেওয়া, সুযোগ পেলেই নারীকে হেনস্তা করা—এসব নোংরা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। পুরুষ মানুষ হলে নারীর অবদান অস্বীকার করতে পারে না। কখনো কখনো হয়তো কোনো নারী নির্দিষ্ট কারো ধ্বংসের কারণ হয়, কিন্তু পুরুষ কি সব সাধু? দুর্বলকেপিষে দেওয়া, অবলাকে খোঁচা দেওয়া—এই স্বভাব থেকে ফিরতে হবে। যারা বাইরের নারীদের সম্মান দিতে জানে না, তাদের দ্বারা ঘরের নারীর মর্যাদা রক্ষা পায়—এটা বিশ্বাসযোগ্য সত্য নয়। নারীকে পণ্য ভাবা পুরুষ ভুলে যায় তার মূলটাও নারীর সম্পর্কে গাঁথা।
।।দুই।।
কোনো কোনো নারী পুরুষের সামর্থ্য নিয়ে খোঁচা দেয়। অপরিমেয় স্বচ্ছলতাকে ইঙ্গিত করে ক্রূর হাসি হাসে। সব পুরুষকে সন্দেহের চোখে দেখে। কারো কারো আচরণ দেখে ও কথা শুনে মনে হয়—পুরুষের জাত বেজাত এবং বেজায় খারাপ! তারা ভুলে যায়- বাবা ছাড়া কোনো নারীর আবির্ভাব হয়েছে? কত ভাই বোনের মর্যাদা রক্ষায় জীবন দিয়েছে। স্বামীর আমৃত্যু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ব-কর্তব্য পালনেই কেটে যায়। ছেলে যদি পৃথিবীতে কাউকে সর্বোচ্চ ভালোবাসে তবে সে কপাল মায়ের। তবুও পুরুষকে আক্রমণ করে কেউ কেউভীষণরকম তৃপ্তি পায়।
পুরুষকে দাসের মতো ব্যবহার করতে পারলে অনেক নারীই খুশি হয়। সংসারের পুরুষটি কেবল ব্যয়ের বাহক। তাদেরও যে মন আছে তা কোনো কোন বোন মনেই করে না। কোনো কোনো নারী স্বামীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না করা পর্যন্ত স্বস্তি পান না। “এটা দিলে না কেন, ওটা করলে না কেন, কিংবা সব কথা শুনলে না কেন”—বলে বলে ঘরকে জাহান্নামে পরিণত করে রাখে। যত দোষ নন্দ ঘোষ! খেয়াল করলে দেখবেন—প্রত্যেক নন্দই পুরুষ। স্বামী যেন আসামি হয়েই জন্মেছে! সংসারের ভার বইতে বইতে সেই মানুষটিরও যে কিছু শখ-আহ্লাদ আছে তা অনেকেই ভুলে যায়। মনে হয়, পুরুষ এই দুনিয়ার ভুল ঠিকানায় আশ্রয় খুঁজছে। এখানে কেউ তার নয়, কিন্তু সে সবার।
।।তিন।।
নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযোগী-সহযাত্রী। সম্পর্ক যদি বিশ্বাসে না গড়ে, সুখের সন্ধান যদি যৌথভাবে না চলে এবং দায়িত্ব যদি ভাগাভাগি না হয় তবে এই দুনিয়ায় কেউ কারো নয়! নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের চাদর। আদর-ভালোবাসা শক্ত সম্পর্কের ভিত্তি। কেউ কাউকে আক্রমণ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। এখানে সবাই সবার হলে শান্তি অবিরত ও অবারিত হয়। কাউকে তুচ্ছ করে, কাউকে খোঁচা দিয়ে কিংবা অকৃতজ্ঞ হয়ে ভালো থাকার প্রশ্ন অবান্তর। ভালো রাখার জন্য ভালো পক্ষে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হয়। ভুল করলে সেটা স্বীকার করার, দুঃখিত হওয়ার মানসিকতা লালন করতেই হবে। এসব শান্তির শর্ত।
কে কতক্ষণ একলা চলতে পারে? দিনশেষে একটা মানুষ ও ভালো মনের কাছে ফিরতে হয়। তবেই মন প্রশান্ত হয়। কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, লিঙ্গ বৈষম্য করে নয়—সহমর্মী ও সহধর্মী হতে হবে পরস্পরের পরিপূরকতারমানসিকতা নিয়ে। পূর্ণতা কখনোই অপূর্ণতা থেকে আসে না। সন্দেহের চোখে দেখে, সামর্থ্যকে সন্দেহ করে এবং কেউ কারো থেকে শ্রেয়—এমন মনোভাব নিয়ে সুস্থ ও শুদ্ধ মানুষের সমাজ-সংসার গড়া সম্ভব নয়। হাতে হাত রেখে, মনের গহীনে পৌঁছে তবে উন্মুক্ত পৃথিবীর বাসিন্দা হতে হবে। শীতের কম্বলের মত সম্বল করতে হবে ভালোবাসাকে। এখানে কেউ নহেআশরাফ, নহেআতরাফ। নারী-পুরুষের চেয়েও মানুষ পরিচয় বড় হয়ে উঠুক।
শেষ কথা, নারী কিংবা পুরুষ নয়—এই পৃথিবীটা গড়ে উঠেছে ‘মানুষে’। একে অন্যের অবলম্বন না হলে কারো অস্তিত্ব পূর্ণতা পায় না। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা—এই তিন স্তম্ভেই সম্পর্কের প্রাসাদ টিকে থাকে। সেই প্রাসাদের নাম—মানবতা।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








